বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ ঠেকাতে হবে

বিনা ভাড়ায় রেল ভ্রমণের দায়ে প্রায়ই জরিমানার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এটা করেও থামানো যাচ্ছে না বিনা টিকিটের যাত্রীর দৌরাত্ম্য। গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘ট্রেনে যাত্রী বাড়লেও বন্ধ হচ্ছে না বিনা টিকিটে ভ্রমণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক মাসে জরিমানা আদায় হয়েছে ৪০ লাখ টাকা।
কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদক জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে রেলওয়ের যাত্রী নিয়মিত বাড়ছে। এর মধ্যে গত অর্থবছরেই যাত্রী বেড়েছে এক কোটি ৭৯ লাখ। তবে এদের উল্লেখযোগ্য অংশই বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছে। এতে একদিকে আয়বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে, অন্যদিকে লোকসান কমছে না সংস্থাটির। অবশ্য বেসরকারিভাবে পরিচালিত ট্রেনগুলো নিয়মিত মুনাফা করছে। এ অবস্থায় বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা জোরদার করেছে রেলওয়ে।
সম্প্রতি রেলওয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারিতে রেলের আয় হয়েছে এক কোটি ২৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে টিকিট বিক্রি করে আয় হয় ৮৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। আর বিনা টিকিটে ভ্রমণের কারণে জরিমানা আদায় হয়েছে ৪০ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট আয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ এসেছে জরিমানা থেকে।
যোগাযোগের ক্ষেত্রে ট্রেনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, সন্দেহ নেই। সড়কপথে দুর্ঘটনা, যানজটসহ বিভিন্ন কারণে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ট্রেন ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এদিকে আবার বিনা টিকিটের যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃত যাত্রীরা রেলভ্রমণে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। অনেক সময় বিনা টিকেটের যাত্রীর চাপে আসনে ঠিকমতো বসতে পারেন না টিকিটধারী যাত্রীরা। ভিড়ের কারণে সঙ্গে থাকা ব্যাগও খোয়ান অনেকে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন বিনা টিকিটের যাত্রীর কারণে ভাড়া থেকে প্রত্যাশিত আয় করতে পারছে না। অথচ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনের আয় বেড়ে চলেছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনে কামরাপ্রতি অ্যাটেনডেন্ট থাকে। আছে ট্রেন টিকিট এক্সামিনার-টিটিই। তবে প্রায় সময়ই কামরায় যাত্রীর বিপুল উপস্থিতির কারণে অ্যাটেনডেন্টরা দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। টিকিট চেক করতে গিয়েও হিমশিম খেতে হয় টিটিইকে। অবশ্য নিরাপদ সরকারি চাকরি হওয়ায় রেলের কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে উদাসীনতাও লক্ষ করা যায়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনার ট্রেনে অ্যাটেনডেন্টরা প্রতি কামরায় প্রত্যেক যাত্রীর টিকিট চেক করেন। অথচ রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বেশিরভাগ ট্রেনেই টিটিই থাকেন না। থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে টিকিট চেক করা হয় না। এতে আয়বঞ্চিত হয় রেলওয়ে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, বিনা টিকিটে ভ্রমণ বন্ধে এখন নিয়মিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে আমরা মনে করি, এর প্রতিকারে অভিযান পরিচালনাই যথেষ্ট নয়। গোড়ায় গলদ থাকলে কোনোভাবেই বিনা টিকিটের যাত্রী শূন্যে নামিয়ে আনা যাবে না। ট্রেনের টিকিট যাচাইয়ে নিয়োজিত কর্মচারীর উপস্থিতি এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি কথা, টিকিট ছাড়া কোনো ব্যক্তির ফ্ল্যাটফরমে ঢোকারই কথা নয়। সেজন্য রীতিমতো প্লাটফর্ম টিকিট কাটার ব্যবস্থাও চালু আছে অনেক আগে থেকে। স্টেশনের প্রবেশপথে নিয়োজিত কর্মচারীরাও নিশ্চয়ই অনুপস্থিত থাকেন কিংবা ভুয়া যাত্রীদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে?
ট্রেনে বিনা টিকিটের যাত্রী প্রতিরোধ এবং প্রবেশ ও বহিরাগমন গেটগুলোয় টিকিট চেকিংয়ের জন্য পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে গত বছরের শেষদিকে। এর বাস্তবায়ন হলে নাকি যাত্রীরা পাঞ্চ মেশিনের মাধ্যমে স্টেশনে প্রবেশ ও বের হতে পারবে। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতির খবর আমাদের জানা নেই। বিনা টিকিটে যেতে ইচ্ছুকদের নিরুৎসাহিত করতে জরিমানার পরিমাণও বাড়ানো যেতে পারে আর সেক্ষেত্রে যথাযথভাবে তা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।