বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে ব্যবস্থা নিন

সময়মতো নবায়ন না করায় বাতিল হয়ে গেছে আরও প্রায় এক লাখ বিও অ্যাকাউন্ট। শেয়ার তথ্য সংরক্ষণকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সর্বশেষ হিসাবে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ নিয়ে বছরের ব্যবধানে বন্ধ হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫২ বিও অ্যাকাউন্ট। এটি দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতির জন্য সুখকর নয়।
গতকাল শেয়ার বিজের ‘আরও এক লাখ বিও অ্যাকাউন্ট বাতিল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে পুঁজিবাজারের নাজুক পরিস্থিতিই প্রকাশ পেয়েছে। এ ধরনের খবর দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য হতাশার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বিব্রতকর।
সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রধানত দুই কারণে অসংখ্য বিও বাতিল হয়Ñবাজারের মন্দা পরিস্থিতি ও প্রাইমারি মার্কেট থেকে বিনিয়োগকারী সুবিধা না পাওয়া। তবে এ বছর বিও অ্যাকাউন্ট বাতিল হওয়ার জন্য প্রাইমারি মার্কেটের নাজুক পরিস্থিতিকে দায়ী করেন তারা।
নতুন আইপিও না আসায় অ্যাকাউন্ট নবায়ন করেন না অনেক বিনিয়োগকারী। সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগের সাহস ও সক্ষমতা নেই অনেকের। ২০১০ সালের ধসের পর অনেকেই বাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনেকে মনে করেন, শেয়ারবাজার ধসে অভিযুক্ত কুশীলবরা বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে। অনেকের ধারণা, তাদের মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পাশে পাচ্ছে না। আশাহত হয়ে তাই বিও অ্যাকাউন্ট নবায়ন করছে না। ফলে বাতিল হয়ে যায় অ্যাকাউন্ট।
শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস নেমেছে কয়েকবার। এর মধ্যে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের ধস শেয়ারবাজারকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। এসব ধস থেকে বাজারকে রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীর হতাশা আরও বেড়েছে।
বিও অ্যাকাউন্ট বাতিল হওয়া মানে বাজার থেকে বিনিয়োগকারী সরে যাওয়া। কিন্তু দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ধরে রাখতে হবে তাদের। আর এ জন্য দৃঢ় মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভালো কোম্পিানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে। এর পাশাপাশি বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এর আগে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে দেশের টেলিকম জায়ান্ট গ্রামীণফোনকে। প্রতিষ্ঠানটিতে আগ্রহ আছে বিনিয়োগকারীদের। টেলিকম খাতের অন্য কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করা গেলে বাজার চাঙা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সে ক্ষেত্রে বিও অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে নতুন হিসাব খোলার প্রবণতা বাড়তে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অমনিবাস হিসাবের মাধ্যমেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। সে ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিকল্প কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা ভাবতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে অমনিবাস হিসাব রয়েছে। অমনিবাস রেখেই কীভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা তৈরি করতে হবে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে নিজেদের প্রকাশ করতে হবে, এ আশঙ্কায় দেশীয় বড় পুঁজিপতি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এতে বিনিয়োগ করতে চায় না। এ ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আসতে উৎসাহিত করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্তত ৪০ কোটি টাকার মূলধন আছে, এমন কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত হওয়ার আহ্বান, কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মধ্যে নতুন ব্যাংকগুলোকে তালিকাভুক্ত হতে তাগিদ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে তালিকাভুক্তির বিষয় গুরুত্ব সহকারে বিবেচনয় নিতে হবে।
বাজারে সাপোর্ট দিতে আইসিবিকে শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে। আইসিবিকে দুর্বল করে রাখা হলে, সাপোর্ট লেভেলও দুর্বল হবে।
বন্ডে বিনিয়োগ এক্সপোজারের বাইরে রাখা, হাউসগুলোর নতুন শাখা খোলার অনুমতি, লেনদেন ডেটার গোপনীয়তা রক্ষা করা, কস্ট প্রাইসে এক্সপোজার বিবেচনা, ইনসাইডার ট্রেডিং বন্ধ করলে দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজার ভালো থাকবে।
বিষয়টি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বিএমবিএসহ স্টেকহোল্ডাররা কী ভাবছে, সেগুলো নিয়ে ধারণাপত্র আহ্বান করা যেতে পারে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাজার শক্তিশালী হবেই এবং এর উন্নয়নে কোনো অংশীজন পিছিয়ে থাকবে না, এটিই প্রত্যাশা।