‘বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরিতে কোম্পানি সচিবের ভূমিকা রয়েছে’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইওর সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে সম্পন্ন করেছেন চার্টার্ড সেক্রেটারি কোর্স। তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের একজন ফেলো মেম্বার।

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার পেছনের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই।

মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: এক্সিকিউটিভ হিসেবে আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডে ক্যারিয়ার শুরু করি। এরপর বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করি। পরে একটি গ্রুপ অব কোম্পানিজে কোম্পানি সচিব হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছি। সর্বশেষ ২০১২ সালে এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডে কোম্পানি সচিব হিসেবে যোগদান করি।

শেয়ার বিজ: এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড সম্পর্কে বলুন।

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: শতভাগ রফতানিমুখী ডেনিম ফেব্রিকস উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠান এনভয় টেক্সটাইলস। এটি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ২০০৮ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। এ প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৫০ মিলিয়ন গজ, ২০১২ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম উভয় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এনভয় টেক্সটাইলস। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। আমাদের একটি নিজস্ব স্পিনিং ইউনিট রয়েছে। এখানে প্রতিদিন ৫০ মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন হয়। এ সুতার সিংহভাগই আমাদের নিজস্ব ডেনিম ফেব্রিক্স উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়।

শেয়ার বিজ: আপনার কোম্পানির বিশেষত্বের কথা বলবেন কি?

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: বাংলাদেশে প্রথম রোপ ডায়িং প্রযুক্তিতে ফেব্রিকস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এনভয় টেক্সটাইলস। এখন পর্যন্ত ডেনিম উৎপাদনে এটিই বিশ্বে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। আমরাই ডেনিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশ্বে প্রথম গ্রুপ। টেক্সটাইলস শিল্পখাতে বাংলাদেশে প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল কর্তৃক লিড প্লাটিনাম সার্টিফিকেট অর্জন করি। যা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পকে একটি বিশেষ স্থানে পৌঁছে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল মূলত কারখানার কর্মপরিবেশ, কমপ্লায়েন্স ও জ্বালানি সাশ্রয়ের গুণ বিচারে এ ধরনের স্বীকৃতি দিয়ে থাকে।

প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের স্বীকৃতি হিসেবে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) থেকে আমরা পরপর দু’বার করপোরেট গভর্ন্যান্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি।

এছাড়া ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে আমরা প্রতিবছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে রফতানি পদক পেয়ে আসছি।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলুন।

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: বাংলাদেশে প্রায় ৩০টি ডেনিম শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠান মাসে ৭০ মিলিয়ন গজ কাপড় উৎপাদন করে। যা দেশের মোট চাহিদার আনুমানিক ৬০ শতাংশ পূরণ করছে। এ চাহিদা বিবেচনায় অনেকে ইতোমধ্যে উৎপাদনক্ষমতা দ্বিগুণে উন্নীত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য উৎপাদনব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কিছুটা হলেও পিছিয়ে পড়ছে।

শেয়ার বিজ: দেশের টেক্সটাইল খাতকে কিভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যাবে বলে আপনি মনে করেন?

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: দেশের বাইরে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে এ শিল্পের সফলতা আরও বেড়ে যাবে। দেশে দক্ষ জনবল ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার ঘাটতি নেই। এমনকি আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানও বেশ ভালো। সব মিলিয়ে এ খাতের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এজন্য দক্ষ যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা খুবই জরুরি। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা উচিত। তাছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদ গড়পড়তা বার্ষিক ৭ শতাংশের নিচে রাখতে পারলে এদেশ ব্যবসায়ীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে। এভাবে দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে টেক্সটাইল খাত। সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান বাড়ানো উচিত। এ বিষয়ের প্রতি সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে।

শেয়ার বিজ: কোম্পানির সঙ্গে সচিবের সম্পর্ক কেমন?

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কোম্পানি সচিব পরিচালনা পর্ষদ ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। শেয়ারহোল্ডাররা তার মাধ্যমে কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এমনকি প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত একমাত্র কোম্পানি সচিবের মাধ্যমেই শেয়ারহোল্ডাররা পেয়ে থাকেন। প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরি করতে কোম্পানি সচিবের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।

 শেয়ার বিজ: কোম্পানিতে একজন সচিবের গুরুত্ব কেমন?

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। এটির অভাবে কোম্পানির নানা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। আর প্রতিষ্ঠানে সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন কোম্পানি সচিব।

শেয়ার বিজ: যারা পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের উদ্দেশে কিছু বলবেন কি?

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের স্বাগত জানাই।

শেয়ার বিজ: সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে আপনার মূলমন্ত্র কী?

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: সুসম্পর্ক ধরে রাখতে প্রথমত ইতিবাচক ও আন্তরিক হতে হবে। অন্যের সমস্যাকে গুরুত্বসহকারে শুনতে হবে। বুঝতে হবে। এরপর আন্তরিকতার সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। তাকে সময় দিতে হবে। তাহলে কেউ আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট হবে না।

শেয়ার বিজ: সফল কোম্পানি সচিবের কী কী গুণ থাকা জরুরি?

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কোম্পানি সচিবকে কোম্পানি আইনের পাশাপাশি সিকিউরিটিজ আইন ও বিধিবিধান ভালোভাবে জানতে হবে। তার মধ্যে যোগাযোগ দক্ষতা থাকতে হবে। হিসাববিজ্ঞানে সম্যক জ্ঞান থাকা জরুরি। সর্বোপরি তাকে ‘কমনসেন্স’ প্রয়োগ করা জানতে হবে। এছাড়া তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, সে কোম্পানির সব ধরনের ব্যবসায়িক ডেটা হালনাগাদ রাখতে হবে।