বিনিয়োগ শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিদ্যমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশব্যাপী প্রশিক্ষণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটা ইতিবাচক বলতে হবে। এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বাজারটিতে বিনিয়োগ ও এ-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে জ্ঞান বাড়বে বলে আশা। পুঁজিবাজারের প্রসার ও একে স্থিতিশীল রাখার জন্য এ বিষয়ে জ্ঞানসম্পন্ন একটি শ্রেণি যে দরকার, সেটা এ কলামে আগেও উল্লেখ করেছি। আমরা এ উদ্যোগের সফলতা কামনা করি। প্রত্যাশা থাকবে, যাদের টার্গেট করে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে, তারাও এর প্রতি যথাযথভাবে সাড়া দেবেন। তাহলেই কেবল দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএসইসির আয়োজন সফল হবে। এ আয়োজন পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগকারী সৃষ্টিতেও রাখবে ভূমিকা।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ একটি জটিল হিসাব-নিকাশের বিষয়। পুঁজিকে নিরাপদ রেখে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনে তাত্ত্বিক কিছু জ্ঞান থাকতে হয় বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু আমাদের বাজারে এমন মানুষ কম। অনেককে বরং উৎসাহী দেখা যায় অনুমান ও গুজবনির্ভর বিনিয়োগে। তাতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে অনেকে যে ক্ষতিগ্রস্ত হন, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এ কারণে বাজারও মাঝেমধ্যে হয় অস্থিতিশীল। কখনও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাজারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন অন্যরা। এতে টার্নওভার ও সূচক কমে যায়। বাস্তব কারণেই বাজার প্রত্যাশা অনুরূপ আচরণ করতে পারে না। বাজারের প্রসার ও একে স্থিতিশীল রাখার জন্য এমন প্রবণতা কাম্য নয়। বিনিয়োগকারীরা প্রশিক্ষিত হলে এসবের অনেকটাই সমাধান সম্ভব।

যে কোনো খাতে বিনিয়োগ একটি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ প্রবণতা কম। তাদের বরং দেখা যায় ডে ট্রেডিংয়ে উৎসাহী হতে। শেয়ার হাতবদল করে দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতাই তাদের মধ্যে বেশি। এ কারণে প্রত্যাশার চেয়ে কম মুনাফাও পান অনেকে। তাতে সূচকের হঠাৎ পতন ও উল্লম্ফন দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সংশ্লিষ্টদের মধ্যে পুঁজিবাজারবিষয়ক জ্ঞানের প্রসার ছাড়া এ কাজে তাদের নিরুৎসাহিত করা কঠিন। বাজারের স্বাস্থ্যের জন্যও এমন প্রবণতা মঙ্গলজনক নয়। এটি কমাতেও পুঁজিবাজারবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রমের সফলতা দেখতে চাইব আমরা।

এটা ঠিক, মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি দেখে পোর্টফোলিও গঠন করে বিনিয়োগ করলে তাতে ক্ষতির শঙ্কা অনেকটা কমে যায়। সংশ্লিষ্টদের অনুমান ও গুজবনির্ভর বিনিয়োগের কারণে এটা সম্ভব হয় না অনেক ক্ষেত্রে। এজন্য একখাতনির্ভর বিনিয়োগ বা বিশেষ কোনো খাতের দাপট দীর্ঘ সময় দেখে থাকি আমরা। বস্তুত মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি বাছাইয়ের জন্যও প্রয়োজন এ-বিষয়ক জ্ঞান। বিভিন্ন খাত সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকলে ‘ভালো’ পোর্টফোলিও গঠনও হয়ে পড়ে কঠিন। দেশে বিভিন্ন সময় বিনিয়োগকারীদের পুুঁজি হারিয়ে যে পথে বসতে দেখা যায়, সেক্ষেত্রে বাজার-সংক্রান্ত জ্ঞানের অভাবটি তার অন্যতম প্রধান কারণ। এটাও সঙ্গত প্রশ্ন যে, যথাযথ জ্ঞান না থাকলে একজন বিনিয়োগকারী এসব ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন কীভাবে? এ ধরনের জ্ঞান প্রদানের জন্য দেশে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিভিন্ন স্থানে বিএসইসির বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্যোগ সে শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করবে। এ লক্ষ্যে স্টেকহোল্ডারদের অনুদানকে সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয় হিসেবে বিবেচনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটাও ইতিবাচক। আমরা চাইব, এটি গুরুত্বসহ নিয়ে এ খাতে ব্যয়ে উৎসাহী হবেন সংশ্লিষ্টরা। তাতে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম প্রসারে যে তহবিল দরকার, সেটি গঠনও সহজ হবে। মনে রাখা চাই, বাজার সংশ্লিষ্টরা যদি এ তহবিল গঠনে এগিয়ে না আসেন, তাহলে অন্য কেউ কাজটি করে দেবে না।