বিবেচনায় নিতে হবে বিদেশে বিনিয়োগের দাবি

রাইসুল ইসলাম : রফতানি খাতের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন একটি সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি জোর দিয়েছেন বিদেশে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের পুঁজি বিনিয়োগ বিষয়ে। তিনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র নতুন সভাপতিও বটে। আমরা জানি, দেশের ব্যবসায়ীদের একটি বড় দাবিতে পরিণত হয়েছে বিদেশে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ। এটি সাধারণভাবে বলতে গেলে দেশে নেই। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু বিদেশে পুঁজি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবেদন করলেই কেবল এ ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়। তা আবার অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হয় না। যারা সে অনুমতি লাভ করেছেন, তারা ইতোমধ্যে এক্ষেত্রে কতটা কাজ এগিয়ে নিতে পেরেছেন জানি না। তবে এ আশা সব সময়ই করব, বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগ করে ব্যবসায় তারা সাফল্য লাভ করবেন। এটা এক ধরনের চ্যালেঞ্জও। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বিদেশে পুঁজি নিয়ে গিয়ে ভালো ব্যবসা করতে পারলে তাতে ওই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে। বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগ করতে চাওয়া ব্যবসায়ীরা ওইসব দেশের আইনকানুন মেনে ব্যবসা করবেন, সেটাও চাইব। আমাদের দেশে বিদেশ থেকে যারা পুঁজি বিনিয়োগ করেন, তাদেরও কিন্তু অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে পথ চলতে হয়। সেসব বিষয়ে তারা মাঝে মাঝে বক্তব্যও দিয়ে থাকেন। বিনিয়োগ ও ব্যবসায় কমবেশি প্রতিকূলতা সব দেশেই রয়েছে। এক অঞ্চলের মানুষ একই দেশের অন্য অঞ্চলে গিয়ে ব্যবসা করার ক্ষেত্রেও সাবধানে পথ চলেন। বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগে স্বভাবতই সেটা আরও বেশি করে প্রয়োজন। ওই সাক্ষাৎকারে এফবিসিসিআইর নতুন সভাপতি বেশ নির্দিষ্ট করেই বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা কোন কোন দেশের কোথায় কোথায় বিনিয়োগ করতে পারেন। আমাদের অর্থনীতি ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে এবং এটা আরও বাড়বে বলেই মনে হয়। এখান থেকে পশ্চাৎপসরণের সুযোগ আছে বলেও মনে হয় না। এ পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যবসায়ীদের বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগের দাবি বিবেচনা করতে হবে।

ব্যবসায়ীরা কেন বিদেশে পুঁজি নিয়ে যেতে চাইছেন এবং এ বিষয়ে তারা কেন একটি সাধারণ নীতিকৌশল প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছেন, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। আমরা এক সময় বলতাম, বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার একটি বড় কারণ হলো এখানে সঞ্চয় ও বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির অভাব। ব্যাংক আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও অত শক্তিশালী নয়। আমাদের পুঁজিবাজারও যাত্রা করেছে বেশিদিন হয়নি। ইতোমধ্যে কি তাহলে পরিস্থিতির এতটাই পরিবর্তন হয়েছে যে, আমরা এখন বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত? দেশে কি বিনিয়োগের প্রয়োজন কমে এসেছে? নাকি এখানে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা বেড়ে উঠেছে? শিল্প-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয় কি বেড়ে উঠেছে দেশে? ব্যবসায়ীরা কি সার্বিক পরিবেশে আস্থা কম পাচ্ছেন এখন? ব্যবসার পরিবেশ বিষয়ে মাঝে মাঝে যেসব বিশ্বজরিপ হয়ে থাকে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন এসেছে বলে তো জানা নেই। তাহলে কি বিদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে মুনাফার হার এখানকার চেয়ে বেশি বলে মনে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের? পুঁজি সম্পর্কে কার্ল মার্কসের একটি মন্তব্য এখনও প্রণিধানযোগ্য বলে অনেকে মনে করেন; তা হলো, মুনাফার সম্ভাবনা যত বাড়বেÑপুঁজি হয়ে উঠবে তত সাহসী। আমাদের পুঁজির মালিকরাও মনে হয় সাহসের পরিচয় দিচ্ছেন বিদেশে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দাবি করে। তাদের এ মনোভাবকে অবশ্য স্বাগত জানাতে হয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশে একটি নতুন প্রজšে§র ব্যবসায়ী গোষ্ঠীরও উত্থান হয়েছে। কয়েক প্রজš§ শিল্প-ব্যবসা করে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন, এমন উদ্যোক্তাও কম নেই এখন। নতুন ধরনের ব্যবসায় যুক্ত হতে চান, এমনকি বিদেশে বিনিয়োগে আগ্রহীÑএ ধরনের উদ্যোক্তা নিয়ে আমরা তো গর্ব করতেই চাইব।

বিদেশে পুঁজি নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে এর পাশাপাশি দেশেও তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে আগের মতো সক্রিয় থাকবেন, এটাই আশা করবে জাতি। বিদেশে ব্যবসা করে দেশে মুনাফা নিয়ে এসে এখানে নতুন করে বিনিয়োগ করবেন, সেটাও দেখতে চাইব। শিল্প-বাণিজ্যে নতুন বিদ্যাবুদ্ধি, প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি যুক্ত করার তাগিদ দিচ্ছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। নতুন ধারার ব্যবসায়ীরাও দেখি এমনটা বলে থাকেন। দেশে-বিদেশে সব ক্ষেত্রেই এটা করা যেতে পারে। এতে করে ব্যবসার বিকাশ যেমন ঘটবে, নতুন ধরনের মানবসম্পদ ব্যবহারের সুযোগও তেমনি বেড়ে উঠবে। নতুন শিল্প-ব্যবসার উপযোগী মানবসম্পদ তৈরিতে আমরা পিছিয়ে রয়েছি, একথাও মাঝে মাঝে বলা হয়। দেশে পরিচালিত ব্যবসার ক্ষেত্রেও কিন্তু আমাদের বাইরে থেকে কিছু কর্মশক্তি গ্রহণ করতে হয়। তাদের মাধ্যমেও অনেক অর্থ চলে যায় বিদেশে। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিনিয়োগের দাবি নিয়ে অর্থপূর্ণ আলোচনা হোক। বিচার-বিশ্লেষণ চলুক। সব দিক বিবেচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিক সরকার।

 

ফ্রিল্যান্স লেখক