বিলিয়ন ডলার কোম্পানির দখলে বাজার মূলধনের ২৯%

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ ও নিয়াজ মাহমুদ: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে বিভিন্ন খাতের ২৯৬টি কোম্পানি। ভালো রিটার্ন দেওয়ার কারণে এর মধ্যে কিছু কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা রয়েছে। তবে সব কোম্পানিকে ছাপিয়ে আস্থার শীর্ষে উঠে এসেছে বিলিয়ন ডলারের চারটি প্রতিষ্ঠান। ভালো লভ্যাংশ, সেই সঙ্গে বাজার মূলধন বেশি হওয়ায় এসব কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি।

ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের ২৯ দশমিক ১০ শতাংশ রয়েছে এসব কোম্পানির দখলে। কোম্পানি চারটি হলো গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেড (বিএটিবিসি) ও লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেড।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা বাড়লে পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী হবে। তবে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে তাদের জন্য শতাংশ হারে শেয়ার সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন লিমিটেড। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রথম মোবাইল ফোন কোম্পানি এটি। ২০০৯ সালে তালিকাভুক্তির পর থেকেই কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কাক্সিক্ষত লভ্যাংশও দিয়ে আসছে। কোম্পানিটির মার্কেট মূলধন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গ্রামীণফোনের বাজার মূলধন প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকারও বেশি, যা মোট বাজার মূলধনের ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ২০১৫ হিসাববছরে গ্রামীণফোন শেয়ারহোল্ডারদের ১৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ অন্তর্বর্তী লভ্যাংশ। বাকি ৬০ শতাংশ ছিল চূড়ান্ত লভ্যাংশ। আলোচিত বছরে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১৪ টাকা ৫৯ পয়সা, যা গত পাঁচ বছর আগে ছিল ৭ টাকা ৯০ পয়সা। গত বছর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ২২ টাকা ৬৮ পয়সা।

২০১৬ হিসাববছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি দুই হাজার ৯৪০ কোটি টাকা আয় করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। নতুন গ্রাহক ও সেবা থেকে আয় করা রাজস্ব (ইন্টারকানেকশন বাদে) আগের বছরের চেয়ে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ডেটা থেকে আয় করা রাজস্ব আগের বছরের চেয়ে ৭২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। ভয়েস থেকে রাজস্ব বেড়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। গ্রামীণফোনের গ্রাহক সংখ্যা পাঁচ কোটি ৫০ লাখ। এ অপারেটরের ডেটা গ্রাহকের সংখ্যা দুই কোটি ২৯ লাখ জন। সর্বশেষ তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) কোম্পানির ইপিএস হয়েছে চার টাকা ৭৮ পয়সা। আগের বছর একই সময়ে যা তিন টাকা ৭ পয়সা ছিল।

গ্রামীণফোনের মোট শেয়ারের ৯০ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যথাক্রমে ৫ দশমিক ৪২ ও ২ দশমিক ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছে। বাকি ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। কোম্পানির ব্যবসা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির সচিব হোসেন শাহাদাত শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের কোম্পানির সর্বশেষ কোয়ার্টার রিপোর্ট ভালো এসেছে। প্রচেষ্টা থাকবে ভবিষ্যতে যেন এ ধারা অব্যাহত থাকে।

ঢাকার পুঁজিবাজারে বাজার মূলধনের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। কোম্পানিটির বাজার মূলধন দুই বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ১৬ হাজার ছয় কোটি টাকারও বেশি, যা ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ কোম্পানিটিও শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশের পাশাপাশি প্রতিবছরই বোনাস শেয়ার দিয়ে আসছে।

১৯৯৫ সালে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৫০ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস। এ সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১৪ টাকা ৮০ পয়সা। আর এনএভি হয়েছে ৫৭ টাকা ৮ পয়সা। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ১৬) কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে তিন টাকা ৮৯ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল তিন টাকা ১৮ পয়সা। এ সময়ে কোম্পানির এনএভি হয়েছে ৬৯ টাকা ১৭ পয়সা। গত বছর ছিল ৬৫ টাকা ৪ পয়সা।

স্কয়ার ফার্মার মোট শেয়ারের মধ্যে পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যথাক্রমে ১১ দশমিক ৯৪ ও ১৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছে। বাকি ৩৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

‘এ’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন এক হাজার কোটি টাকা। আর পরিশোধিত মূলধন ৬২৩ কোটি টাকা।

এদিকে তালিকাভুক্তির পর থেকেই আস্থার জায়গায় ধরে রেখেছে বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেড (বিএটিবিসি)। বিক্রয়, মুনাফা, রাজস্ব প্রদান ও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদানে সব সময় এগিয়ে থাকে কোম্পানিটি। ২০১০ সালে বাজার মূলধন ছিল চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা। তিন গুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি, যা ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

কোম্পানিটি ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ হিসাববছরে বিনিয়োগকারীদের ৫৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। চলতি ২০১৬ হিসাববছরের তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) বিএটিবিসি শেয়ারপ্রতি আয় করেছে ৯০ টাকা ৫৩ পয়সা, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। গত বছর একই সময়ে কোম্পানিটির ইপিএস ছিল ৭২ টাকা ৯৮ পয়সা। প্রতিবছরই শেয়ারহোল্ডারদের ৪০০ থেকে ৬০০ শতাংশ লভ্যাংশ দিচ্ছে ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানিটি। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বহুজাতিক এ কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা নগণ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি থাকলে তারা লাভবান হয়। সেই সঙ্গে এসব কোম্পানির প্রতি তাদের আস্থা বাড়ে। এ কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশ রয়েছে পরিচালকদের হাতে। সরকার ধারণ করছে দশমিক ৬৪ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যথাক্রমে ১১ দশমিক ১৩ ও ১৪ দশমিক ৫২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে দশমিক ৮০ শতাংশ শেয়ার।

পুঁজিবাজারে সিমেন্ট খাতে তালিকাভুক্ত লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট লিমিটেড শেয়ারহোল্ডারদের আস্থার প্রতীক। ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে শীর্ষ বাজার মূলধনের চতুর্থ স্থানে রয়েছে কোম্পানিটি। ২০০৩ সালে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানিটির বাজার মূলধন এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত কোম্পানিটির মূলধন ছিল আট হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজার মূলধনের তিন দশমিক ২১ শতাংশ। গত অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। এর আগে কোম্পানিটি অন্তর্বর্তীকালীন ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছিল। সব মিলিয়ে সমাপ্ত হিসাববছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিল কোম্পানিটি। লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের মোট শেয়ারের ৬৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ রয়েছে পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৩৩ ও ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছে। বাকি ১৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। এ প্রসঙ্গে কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মাসুদ খান শেযার বিজকে বলেন, বর্তমানে আমাদের কোম্পানির বিক্রি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কমে গেছে। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মার্জার প্রক্রিয়া চলছে। এটা সম্পন্ন করতে পারলে আমাদের আয় আরও বাড়বে। তখন আমরা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ভালো কিছু করতে পারব।

অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, যে কোনো ধরনের ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারের জন্য ভালো। ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বাজারের প্রতি সাধারণ জনগণের আগ্রহ বাড়ে। এদিকে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রশিদ চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা চাই এ ধরনের কোম্পানি আরও বেশি তালিকাভুক্ত হোক। তবে এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বনি¤œ ১০ শতাংশ শেয়ার রাখতে হবে। বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে এটা দেখা যায় না বললেই চলে। শুধু নিজের সুবিধা আদায় করতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে বিষয়টি যেন এমন না হয়।