দুরে কোথাও

বিশুদ্ধ পানি, সময়সচেতন ও ভিপিএনের দেশে

এককথায় বলে দেওয়া যায়, পর্যটকদের জন্য বেশ নিরাপদ দেশ ইরান। অনেক পশ্চিমা পর্যটকের কাছে দেশটি সবচেয়ে নিরাপদ। অনেকের মতে, ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায়ও নিরুপদ্রব ইরান। বিদেশিদের প্রতি সহিংস হয়ে ওঠা দেশটির ইতিহাসে বিরল বলা যায়। দেশটির রীতিনীতি ও আচার-আচরণ যদি মেনে চলা হয়, তবে যেকোনো পর্যটকই শ্রদ্ধা অর্জন করবেন স্থানীয়দের। আমেরিকান পর্যটকদের বেলায়ও
একই কথা প্রযোজ্য। দেশাচার মেনে চললে নিরাপদে-নির্বিঘ্নে দেশটির মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। অপরিচিত মানুষের বাড়িতে স্বচ্ছন্দে রাতযাপন করতে পারবেন। ভুল করে কোথাও ব্যাগ ফেলে এলেও নিশ্চিত থাকুন, ফিরে পাবেন।
পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জীবনমান রক্ষায় অন্তঃপ্রাণ। ইরানে এসব দেশের অনেক এম্বেসি রয়েছে। তাদের দেশের কোনো নাগরিক ১০ দিনের বেশি ইরানে থাকলে চাইলে সাধারণত এম্বেসির তরফ থেকে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে, কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবেন তার তালিকা। এটুকুই।
কিছু হ্যাপা যে নেই, তা বলা যাবে না। যেমন সন্দেহপ্রবণতা। তবে গুপ্তচরবৃত্তি না করলে গ্রেফতার কিংবা জেরার মুখোমুখি হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। আরও বড় সমস্যা হচ্ছে, ড্রাইভিং কিংবা রাস্তা পার হওয়া। এ দুই বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকা উচিত পর্যটকদের।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড একেবারেই যে নেই, তা নয়। তবে পরিমাণে কম। হামলা কিংবা নিপীড়ন ও চুরির ঘটনা কদাচিৎ শোনা যায়। কথায় বলে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হলে দুষ্কর্ম বাড়ে। ইরানের ক্ষেত্রে এমন সমস্যা নেই। পর্যটক হিসেবে কয়েকটি বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি =
# মূল্যবান জিনিস, যেমন পাসপোর্ট, টাকা, ক্যামেরা সঙ্গে রাখা ভালো
# হোটেলগুলো বেশ নিরাপদ। তবে ব্যাগ তালা মেরে রাখা উচিত, নতুবা হোটেল বয়দের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হতে পারে
# থাম্বস আপ চিহ্ন দেখাবেন না
# পকেটমার থেকে সাবধানে থাকার জন্য ভিড় এড়িয়ে চলা উচিত
অপহরণ ও সন্ত্রাসবাদ নেই বললেই চলে। তবে বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশ ইরানে ভ্রমণের বেলায় কয়েকটি নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ইরান-আফগানিস্তান সীমান্ত। এ সীমান্তের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে গেলে সতর্ক না হওয়ার বিকল্প নেই। ইরাক সীমান্তের বেলায়ও একই সতর্কতা প্রযোজ্য। তবে ইরান-ইরাক সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে গেলে বাড়তি সতর্ক হতে হবে। পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের বেলায়ও সতর্ক থাকতে হবে। বাম, জাস্ক ও জাহেডান নামক স্থানগুলোয়ও ভ্রমণের বেলায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সাদা পোশাকের পুলিশ ও সেনাসদস্য রয়েছে প্রায় সবখানে। তবে তারা বিদেশিদের হয়রানি করে না। ইসফাহান, শিরাজ ও মাসাদ শহরে টুরিস্ট পুলিশ রয়েছে। তারা সাধারণত ইংরেজিতে কথা বলে।
ছবি তোলার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে পর্যটককে। সীমান্ত, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থাপনা, বিশেষ করে মিলিটারি কিংবা পুলিশ ও তাদের ভবনসহ সরকারি ভবনের ছবি তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রশাসনের দায়িত্বে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি ছবি তোলার ব্যাপারে নিষেধ করলে মেনে চলবেন। ছবি তুলে ফেলার পরে যদি তারা ডিলিট করতে বলেন, তাদের কথা মেনে নেবেন।
বিদেশে বেড়াতে গেলে পর্যটকরা সাধারণত পাসপোর্ট তাদের সঙ্গে রাখে। ইরানের বেশিরভাগ হোটেল বিদেশি পর্যটকদের পাসপোর্টের ফটোকপি পুলিশি অনুসন্ধানের জন্য রেখে দেয়। তাই পাসপোর্টের বায়োডেটা ও ইরানিয়ান ভিসা পেজের কয়েকটি ফটোকপি সঙ্গে রাখুন, যেন চাইলে তৎক্ষণাৎ দেখাতে পারেন।
সীমান্তের কাছাকাছি সড়কে চলাচলের সময়ে পুলিশি তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়। পুলিশ মূলত মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য চোরাই পণ্যের জন্য এমন রুটিন ওয়ার্ক করে থাকে।
রাস্তায় চলাচলের ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক থাকতে হবে। এর বিকল্প নেই। রাস্তা ফাঁকা না থাকলে পার হওয়ার চেষ্টা করবেন না। গাড়িতে চড়লে চালকের সঙ্গে চুক্তি করে নেবেন তিনি যেন ধীরে গাড়ি চালান। রাইডশেয়ার সার্ভিস স্ন্যাপ বেশ জনপ্রিয় দেশটিতে। উবারের মতো সেবা দিয়ে থাকে স্ন্যাপ। সবচেয়ে ভালো ট্রেনে যাতায়াত করা। সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলে ইরানে। ২০১৪ সালে সড়কে প্রাণ হারায় ১৭ হাজারের বেশি মানুষ। প্রায় তিন লাখ মানুষ আহত হয় ওই বছর। প্রতিবছর এ মৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে। নিরাপদ সড়ক নিয়ে দেশটি যেন উদাসীন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, হাইড্রোলিক হর্ন, ফুটপাতে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল না মানা সবই চলে সমানে। তাই রাস্তায় চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করা শ্রেয়। সড়কে চলাচলের সময়ে স্থানীয় কারও সাহায্য নিন যিনি ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সিদ্ধহস্ত।
প্রায় প্রতিদিনই ইরানে ভূমিকম্প হয়। এ প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলাকালে ঘরে থাকলে ঘরের বিমের নিচে ও কলামের পাশে বা দেয়ালের কোণে অবস্থান নিন। মজবুত টেবিল বা খাটের নিচে চলে যান। কাচের জানালা, ভারী ও উঁচু আসবাব থেকে দূরে থাকুন। বহুতল ভবনে থাকলে ভূমিকম্প না থামা পর্যন্ত কোনোভাবেই বের হবেন না। বাড়ির বাইরে থাকলে উঁচু দালান, গাছ ও বিলবোর্ড থেকে দূরে থাকুন। গাড়িতে থাকলে গাড়ি থামিয়ে দিন। কম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ি থেকে নামবেন না। যেখানেই থাকুন না কেন কম্পন না থামা পর্যন্ত মাথা হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। আতঙ্কিত হবেন না।
ইরানিয়ান রিয়ালে রূপান্তর করে নিন সঙ্গে থাকা ডলার, ইউরো কিংবা ব্রিটিশ পাউন্ড। যতদিন থাকবেন একটা হিসেব করে সেই পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা সঙ্গে রাখুন। সরকারি রেটের পাশাপাশি ব্ল্যাক মার্কেটেও অর্থ বিনিময় করতে পারবেন। দেশটিতে আন্তর্জাতিক ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ করা হয় না।
যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন। রাজনৈতিক সমাগম রয়েছে এমন কোনো স্থানে যাবেন না। অ্যালকোহলের চিন্তা ভুলেও মাথায় আনবেন না।
মার্জিত পোশাক পরিধান করতে হবে। পাবলিক প্লেসে চলাফেরার সময়ে নারীদের অবশ্যই হিজাব বা স্কার্ফ পরে থাকতে হবে। লুজ ফিটিং কাপড় পরতে হবে, যেন শারীরিক গঠন বোঝা না যায়। অসতর্কতাবশত মাথা থেকে স্কার্ফ পড়ে গেলে স্থানীয়রাই ঠিক করে নিতে বলে। মাথা, বাহু ও পা ঢেকে রাখতে হবে সবসময়। পুরুষেরা শর্ট সিøভ শার্ট পরিধান করতে পারবেন। তবে শর্টস কখনও হয়। অপরিচিত নারী ও পুরুষ কখনও একে অপরকে স্পর্শ করবেন না। যেমন হ্যান্ডশেক, হাগিং প্রভৃতি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখতে হবে। স্থানীয় কারও বাড়িতে বেড়াতে গেলে অবশ্যই উপহার সঙ্গে নিয়ে যাবেন। যেমন ক্যান্ডি, পেস্ট্রি, ফুল প্রভৃতি।
কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়ার জন্য গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করতে পারেন। দেশটির ভাষা পারসিয়ান (ফার্সি)। স্থানীয়দের অনেকে ইংরেজিতে টুকটাক কথাবার্তা চালিয়ে নিতে পারে।
ইরানের খাবার ভীষণ মজাদার ও সুস্বাদু। শুধু কাবাব খেয়ে কাটাবেন না। ফালাফেল স্যান্ডউইচ চেখে দেখতে ভুলবেন না। ভেজ কিংবা ননভেজ কী নেই দেশটিতে? ডিম, ডাল, মুরগি, সালাদ, ভাত প্রভৃতির পাশাপাশি স্থানীয় অনেক মুখরোচক ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার রয়েছে।
ইরানিরা সময়সচেতন জাতি। ৮টায় কারও সঙ্গে সাক্ষাতের সময় দিয়ে থাকলে পৌনে আটটায় উপস্থিত থাকতে পারেন। দেখবেন অপরপক্ষও ১৫ মিনিট আগে উপস্থিত। বাস, ট্রেন, ট্যাক্সি ড্রাইভার সবই ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় চলে।
কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা হয়েছে ইরানে। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ছাড়া এসব সাইটে প্রবেশ করা যায় না। ফেসবুক, ফেসবুক মেসেঞ্জার, টুইটার, ইউটিউব কিংবা পিন্টারেস্টে অ্যাকসেস পাবেন না। ইনস্টাগ্রামে লগ ইন করতে পারবেন ভিপিএন ব্যবহার করে। অনেকে এক্সপ্রেসভিপিএন ব্যবহার করে। ৩০ দিনের জন্য বিনা খরচে এ সার্ভিসটি পাবেন। দেশটিতে যাওয়ার আগে ভিপিএন ডাউনলোড করতে হবে। কেননা অনেক ভিপিএন সাইট দেশটির সরকার ব্লক করে রেখেছে। কোনো কারণ ছাড়াই সরকার যখন-তখন যে কোনো ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিতে পারে। চাইলে ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করতে পারেন। তবে তা ভীষণ ধীরগতির। কথা বলার জন্য স্থানীয় সিম কার্ডের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে ইরানসেল বেশ জনপ্রিয়।
ইরানের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হচ্ছে, আপনি চাইলে যেকোনো ট্যাপের পানি পান করতে পারেন নিশ্চিন্তে। বিদেশে বেড়াতে গেলে যে কোনো পর্যটকই সাধারণত পানি কিনে পান করেন। কিন্তু ইরানে পানি কিনে খাওয়ার দরকার পড়ে না। বিষয়টি শুধু আমাদের জন্যই নয়, সব দেশের পর্যটকদের কাছে বিস্ময়কর বৈকি! বিভিন্ন স্বাদের চা পান করেন ইরানিরা। তবে কফি পাওয়া যায় না সচরাচর।
বিভিন্ন উন্নত দেশের সচেতন সরকার তাদের নাগরিকদের ইরানে ভ্রমণের জন্য অনেক পরামর্শ দিয়ে থাকে। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইটালি প্রভৃতি। দেশটিতে ভ্রমণের আগে এসব দেশের কয়েকটি ওয়েবসাইট দেখে নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র: www.travel.state.gov। যুক্তরাজ্য: www.gov.uk/foreign-travel-advice| কানাডা: www.voyage.gc.ca| ফ্রান্স: www.diplomatie.gouv.fr/fr/conseils-aux-voyageurs। নিউজিল্যান্ড:www.safetravel.govt.nz অস্ট্রেলিয়া:www.smartraveller.gov.au| ইতালি:www.viaggiaresicuri.mae.aci.it|

 লোনলি প্লানেট ও এক্সপ্যাট অ্যারাইভালস অবলম্বনে রতন কুমার দাস

সর্বশেষ..