বিশ্বরাজনীতির বর্তমান সংকটে প্রয়োজন নেলসন ম্যান্ডেলাকে

কাজী সালমা সুলতানা: কিংবদন্তি শব্দটির জন্ম নেলসন ম্যান্ডেলার জন্য। অথবা বলা যায়, নেলসন ম্যান্ডেলা জন্ম দিয়েছেন ‘কিংবদন্তি’ শব্দের। শব্দটির আভিধানিক গতি শুধুই ম্যান্ডেলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যুগে যুগে দেশে দেশে অনেক রাজনৈতিক নেতার জন্ম হয়েছে। অনেকেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আবার অনেকেই ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। আবার ইতিহাস কোনো কোনো নেতাকে ধারণ করতে পেরে নিজেই সমৃদ্ধ হয়। একজন নেতা ও ইতিহাস এক ও একাকার হয়ে যায় তিনি শুধুই নেলসন ম্যান্ডেলা। পূর্ণ নাম নেলসন রোলিহলাহলা ম্যান্ডেলা। কোনো বিশেষণই তাকে সিদ্ধ করতে পারে না। তার জন্য কোনো বিশেষণ দেওয়াও সম্ভব নয়। তাই সহজভাবে বলা যায়, বর্ণবাদ, শোষণ নিপীড়ন ও বৈষম্যবিরোধী বিশ্বনেতা নেলসন ম্যান্ডেলা।
নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম ১৮ জুলাই ১৯১৮ দক্ষিণ আফ্রিকার মভেজো গ্রামে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টও তিনি। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টর দায়িত্ব পালন করেন। আজন্ম লড়াই করেছেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আফ্রিকার কালো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। এফডব্লিউডি ক্লার্ক জাতিগত বৈষম্যের দেশটির বর্ণবাদবিরোধী ব্যবস্থাকে সমর্থন করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের শান্তিপূর্ণ রূপান্তর শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলা ও ক্লার্ক যৌথভাবে ১৯৯৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
লাঞ্ছিত নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামী নাম নেলসন ম্যান্ডেলা। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। এটি বাংলাদেশে খুব বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ। এর অর্থ যে, যার জন্য যে উপমা প্রযোজ্য নয়, তার সে নাম নাম রাখা। তেননি একটি বিষয় নেলসন রোলিহলাহলা ম্যান্ডেলা নামের বেলায়। ম্যান্ডেলার মানের মাঝের অংশ রোহিহলাহলা। এই অংশটি যেন ম্যান্ডেলার নামের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। একেবারেই বিপরীতার্থক। ম্যান্ডেলার মানের এ অংশটির অর্থ হচ্ছে ‘সংকট সৃষ্টিকারী’। অথচ বাস্তবে ম্যান্ডেলার আবির্ভাব ঘটেছে বিশ্বেও যাবতীয় সংকট মোচনের জন্য। সারা বিশ্বে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার মানচিত্র অতিক্রম করে তিনি বিস্তৃত হয়েছেন বিশ্ব মানচিত্রে। যেখানেই বর্ণবৈষম্য, জাতিগত বিভেদ, সামাজিক অস্থিরতা, দুর্বলের ওপর সবলের নিপীড়নÑসেখানেই নেলসন ম্যান্ডেলা। ম্যান্ডেলা নামটি আজ সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী চেতনা। অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক শান্তির বার্তাবাহী নাম নেলসন ম্যান্ডেলা।
নেলসন ম্যান্ডেলার নাম মনে এলে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক স্পর্ধিত সাহস। আফ্রিকার বর্ণবাদী শেতাঙ্গদের চোখে অস্পৃশ্য ঘৃণ্য কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সারা জীবন লড়েছেন নেলসন ম্যান্ডেলা। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা অর্জনে অহিংস আন্দোলন, সে আন্দোলনকে আবার সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ দেওয়া এবং সিআইএ’র সহযোগিতায় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবরণ করেও আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি না ঘটা কেবল নেলসন ম্যান্ডলার পক্ষেই সম্ভব। নিজের স্বার্থকে তুচ্ছ করে বঞ্চিত নিপীড়িত কালো মানুষের অধিকার আদায়ে দৃঢ়চেতা ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, শোষণ মুক্তির স্বপ্ন, বর্ণবৈষম্যের অবসান এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার চতুর্মাত্রিক বৈশিষ্ট্য নেলসন ম্যান্ডেলাকে দিয়েছে জাতীয়তাবাদী নেতার সম্মান। সবচেয়ে বড় বিষয়, যে ম্যান্ডেলা সারাজীবন বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ নেতাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে সেই শ্বেতাঙ্গদের মর্যাদাও দিয়েছেন সমভাবে। তাই তিনি আফ্রিকার সীমা ছেড়ে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে ছিলেন বিশ্বজুড়ে।
আজ বিশ্বের বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর যুদ্ধ উম্মাদনা, অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে বশ্যতায় বাধ্যকরণ ও গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধকরণের মাধ্যমে এক অস্থির রাজনীতির জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে হচ্ছে এক
সংকটময় কাল। আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বাণিজ্য সামম্রাজ্যবাদিতার কূটচালে আবদ্ধ। জাতিসংঘও অনেক ক্ষেত্রে অসাহায় ভূমিকায় দৃষ্টিকটু দর্শক। এমন এক অস্থির বিশ্বরাজনৈতিক মঞ্চে বড় প্রয়োজন, অনুভূত হয় নেলসন ম্যান্ডেলাকে। তাই জন্মশতবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী নেলসন ম্যান্ডেলাকে।

গণমাধ্যমকর্মী