বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মহাসড়ক নির্মাণে দুই প্রকল্প!

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন

ইসমাইল আলী: বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মহাসড়ক ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন। ২০১৬ সালের মে মাসে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। সে সময় এর ব্যয় ছিল ছয় হাজার ২৫২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। পরে তা আরও ৬০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। চলতি বছর জুনের মধ্যে এটি শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ হয়েছে ৬০ শতাংশ।
এরই মধ্যে বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পটির মেয়াদ। এছাড়া ভুল পরিকল্পনা সংশোধনে নতুন বেশকিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে প্রকল্পটিতে। পাশাপাশি নির্মাণব্যয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। ফলে অসমাপ্ত রেখেই শেষ করা হচ্ছে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণকাজ। এতে বাকি কাজ শেষ করতে নেওয়া হচ্ছে আরেকটি প্রকল্প। দুই প্রকল্প মিলিয়ে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণব্যয় ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যদিও অসম্পন্ন অবস্থায় আগামী ১৩ অক্টোবর উদ্বোধন করা হবে মহাসড়কটি।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রকল্পটির স্টিয়ারিং কমিটির সভায় বিষয়টি উঠে আসে। এতে জানানো হয়, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেনে উন্নয়ন প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করতে অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তকরণ শীর্ষক আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে জানানো হয়, প্রকল্পটির আওতায় যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার ও পাঁচ্চর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। এর দুই পাশে সাড়ে পাঁচ মিটার প্রশস্ত সার্ভিস সড়ক ও মাঝে পাঁচ মিটারবিশিষ্ট মিডিয়ান রয়েছে। এছাড়া ২৯টি ছোট ও মাঝারি সেতু, ৫৪টি কালভার্ট, চারটি রেলওয়ে ওভারপাস, পাঁচটি ফ্লাইওভার, ২০টি আন্ডারপাস, দুটি ইন্টারচেঞ্জ ও দুটি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে। জুন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৯১ শতাংশ। তবে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৬০ শতাংশ।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ছয় হাজার ২৫২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বাড়ায় পরে তা ৬০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ছয় হাজার ৮৫২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। কাজের পরিধি ও পরিমাণ বৃদ্ধি, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে প্রকল্পটির ব্যয় ১০ হাজার ৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়। চলতি বছর ৬ এপ্রিল পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। তাদের সুপারিশের আলোকে ব্যয় বেড়ে ১০ হাজার ৯৯৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।
গত ১৮ আগস্ট উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা ফেরত দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ডিপিপিতে নতুন কাজ বা অঙ্গ যেভাবে আছে তা আলাদাভাবে বাস্তবায়নের জন্য পৃথক প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। এ অবস্থায় প্রথম প্রকল্পটির ব্যয় ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ বাড়িয়ে ছয় হাজার ৮৯২ কোটি পাঁচ লাখ টাকা করা হয়েছে। আর বাকি কাজ শেষ করার জন্য নতুন প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে চার হাজার ১১১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। শিগগিরই তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।
জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণে দুটি প্রকল্প নিতে হচ্ছে। তবে পদ্মা সেতুর লিঙ্ক প্রকল্প এটি, সরকারের ফাস্ট ট্র্যাকভুক্তও। তাই দ্রুত প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই প্রকল্প দুটির পৃথক ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।
সূত্র জানায়, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণ প্রকল্পটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এতে দেখা যায়, প্রকল্পটির প্রাথমিক পরিকল্পনায় ভুল ছিল। এ কারণে নির্মাণ শুরুর দুই বছরের মাথায় দ্বিতীয় দফায় ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের জন্য অতি প্রয়োজনীয় হলেও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করা হয়নি। এজন্য প্রকল্পটিতে কোনো পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা (ইএমপি) অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ভূগর্ভস্থ পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তরে নেই কোনো মাস্টারপ্ল্যান। ফলে এ কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমি ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ব্যবহার করেছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ডিপিপি সংশোধনের প্রস্তাবে নতুন কিছু কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজউক কর্তৃক নির্মিতব্য শান্তিনগর-ঝিলমিল ফ্লাইওভারের সঙ্গে সংগতি রেখে দুই হাজার ৩৩৩ মিটার তেঘরিয়া-বাবুবাজার ফ্লাইওভার নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। ভাঙ্গা-ফরিদপুর অংশে নির্মিতব্য ইন্টারচেঞ্জ ক্লোভার লিফের র‌্যাম্পের অ্যালাইনমেন্টের সঙ্গে সমন্বয় করে কুমার ব্রিজ ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। টোল প্লাজার ডিজাইন পরিবর্তনসহ এর সঙ্গে রেস্তোরাঁ, অফিস ও বাসস্থান, পাম্প হাউজ, নির্বাপণ কেন্দ্র, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, পানির ট্যাংক এবং পুলিশ পোস্ট অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ খাতে ব্যয় বেড়ে গেছে।
এর বাইরে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী রেলওয়ে ওভারপাসের উচ্চতা বাড়ানোয় এর দৈর্ঘ্য দুই দশমিক ৮০ কিলোমিটার থেকে চার দশমিক ৪৪৪ কিলোমিটার হয়ে গেছে। সড়কের মাটির গুণাগুণ খারাপ হওয়ায় ও সড়কের উভয় পাশে অনেক পুকুর, জলাশয় ও নিচু ভূমি থাকায় এবং অতিবৃষ্টিতে বন্যায় সড়কের নতুন এমব্যাংকমেন্ট রক্ষার জন্য সড়কের উভয় পাশে প্রচুর পরিমাণে রক্ষাপদ কাজের পরিকল্পনা নিতে হয়েছে।
এদিকে প্রকল্প এলাকায় বিদ্যমান কয়েকটি সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে হচ্ছে। এতে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ডাইভারশন রোড নির্মাণ করতে হচ্ছে, যা আগের ডিপিপিতে ছিল না। প্রকল্পের কাজ দ্রুত করতে অ্যালাইনমেন্টের মধ্যে বিভিন্ন সংস্থার ইউটিলিটিগুলো পুনঃস্থাপন ব্যয়ও ডিপিপির অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে।
জানতে চাইলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, নির্মাণ শুরুর সময় কিছু বিষয় ছিল না, যা পরে যুক্ত হয়েছে। এতে প্রকল্পটির কাজের পরিধি বেড়ে গেছে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে হয়েছে। এজন্য খাতটির ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ব্যয়ও বাড়ছে। আর আয়কর, ভ্যাটসহ নতুন কিছু বিষয় যুক্ত হয়েছে। মাটির সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় তা নতুন প্রকল্পটিতে যুক্ত হয়েছে।