বিষয়: খাদ্য নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশ মূলত কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সিংহভাগ মানুষের প্রধান খাদ্য হলো ভাত। প্রবাদ আছে ‘আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি’। বর্তমানে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে; কিন্তু বিভিন্ন কারণে খাদ্য উৎপাদনে দেশ পিছিয়ে পড়ছে। মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী গত বছর দেশে ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। স্বাধীনতার পর এত মাছ উৎপাদন এই প্রথম। কিন্তু মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি শস্য উৎপাদনের দিকেও আমাদের নজর দেওয়া দরকার। বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বার্ষিক এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি জানায়, শস্য ক্ষতির সবচেয়ে বড় হুমকি হলো ঘূর্ণিঝড়। বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে শস্য উৎপাদনে। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয় বাংলাদেশে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। লবণাক্ত হয় উর্বর ফসলি জমি। প্রতিবছর বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় কোটি কোটি টাকার ফসল। বিনষ্ট হয় শস্য। যেহেতু দেশের প্রধান জীবিকা কৃষি, তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তো আছেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ধান উৎপাদন কম হলে প্রায়ই চালের দাম বেড়ে যায়। জরিপে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এখানকার মাটিতে লবণ ও দারিদ্র্যতা বেশি হওয়ায় ওই অঞ্চলের মানুষ বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত বছর বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটের মুখে পড়ে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বেশি সংকটে ছিল। এফএও’র স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন শীর্ষক প্রতিবেদন এমনটাই বলছে। গত ২০ বছরে সাতক্ষীরার মাটিতে লবণ অনেক বেড়েছে। তাছাড়া দেশের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ প্রতিবছর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা সম্ভব নয়; কিন্তু আমরা চাইলে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হতে পারি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শস্য রক্ষার আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি। এক জরিপে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও পুষ্টিহীনতা বাড়ছে! বিশেষজ্ঞরা এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন দেশে খাদ্য উৎপাদনের নি¤œমুখিতা। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিকেই সব সমস্যার মূলে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিস (বিসিএএস) বলছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মূল কারণই হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে চাল উৎপাদন কমে গেছে। সিডর ও আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়ের কারণে অনেক অঞ্চল চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়েছে; যার ফলে শস্য উৎপাদনে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রতিবছর দেশের শস্য উৎপাদনের জমি হ্রাস পাচ্ছে, যা আমাদের জন্য মোটেও শুভকর নয়। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি একটি পৃথক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯৪০ জন বাস করে। আর মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ মানুষ যেখানে বাস করে, তারা সবাই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র পাঁচ মিটার উঁচুতে রয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণ-পানি ও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে চালের দাম বেশি। বাঙালিরা ভাত ছাড়া কিছু বোঝে না; তাই ভাতের ওর চাপ কমানো উচিত। যত দিন যাচ্ছে, দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু সে অনুপাতে শস্য উৎপাদন বাড়ছে না বরং কমছে। এ বিষয়ে সবার সজাগ থাকা উচিত। শুধু খাদ্য উৎপাদন ও মজুত নয়, খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়েও সরকারকে সুনজর দেওয়া উচিত। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বাড়ছে। চাহিদার জোগান দিতে গিয়ে চাষাবাদের জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে বাসস্থান, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, হাটবাজার। ফলে খুব দ্রুতই হ্রাস পাচ্ছে খাদ্য উৎপাদনের জমির পরিমাণ। এসব বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে এখনই। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এভাবে ক্রমাগত শস্য উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হবে, এতে সন্দেহ নেই। পরনির্ভরশীলতা ও খাদ্য আমদানি করে সামগ্রিক চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তাই সমাধান খুঁজতে হবে আগেভাগেই। ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন কমে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব রোধ করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে বিশ্ব ভয়াবহ খাদ্য হুমকির সম্মুখীন হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশÑতা জাতিসংঘ অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আশা করি সরকার খাদ্য নিরাপত্তার দিকেও জোর দেবে।

হিমেল আহমেদ
শিক্ষার্থী
সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া