মত-বিশ্লেষণ

বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ বুকে ধারণ করে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে হবে

ড. শিল্পী ভদ্র: ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘বীর নারী’। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ চলাকালে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত নারীদের অবদানকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব দিয়েছিলেন। এই খেতাবপ্রাপ্ত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ বলা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামকালীন ধর্ষিত নারীদের ‘ধর্ষিত রমণী’, ‘অপমানিত রমণী’, ‘দুস্থ মহিলা’, ‘ধর্ষণের শিকার’, ‘সৈন্যদের নিপীড়নের শিকার’, ‘ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা’, ‘ভাগ্যবিড়ম্বিতা’ প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করা হতো। এসব নারীকে পুনর্বাসনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন করে। গৃহীত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নির্যাতিতদের মর্যাদা সমুন্নত করার উপায় উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয় এবং তাদের অবদানকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব প্রদানের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর অমিতা মালিক বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, একজন পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিক বলেছে, ‘আমরা যাচ্ছি, কিন্তু আমরা পেছনে আমাদের উত্তরসূরি রেখে যাচ্ছি।’ এই ‘উত্তরসূরি’ বলতে পূর্বপরিকল্পনা-প্রসূত ধর্ষণের মাধ্যমে যেসব বাঙালি নারীকে অন্তঃসত্ত্বা করা হয়েছে, তাদের গর্ভের সন্তানদের বোঝায়।
পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালিদের দুর্বল জাতি হিসেবে উল্লেখ করে এবং যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে বাঙালি নারীদের ধর্ষণ করে। বাঙালি জাতিকে ‘শুদ্ধ’ করতে তারা বাঙালি নারীদের ধর্ষণ করে গর্ভবতী করার মাধ্যমে ‘বিশুদ্ধ জাতি’ তৈরির নোংরা প্রকল্প হাতে নেয়। এজন্য তারা হিন্দু নারীদের ও বাংলাভাষী নারীদের অনেককেই অমানবিকভাবে গণধর্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেরে ফেলে। অসংখ্য হিন্দু ও সুশ্রী নারীকে ফুর্তি করার জন্য ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যাদের গর্ভবতী করে বিশুদ্ধ পাকিস্তানি সন্তান জš§ানোর নষ্ট খেলায় মাতে তারা।
জেনারেল টিক্কা খান (‘বাংলার কসাই’ অভিধাপ্রাপ্ত, ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর প্রণেতা) ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বলেন, ‘আমি এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করব।’ বীনা ডি’ কোস্টা মনে করেন, টিক্কা খানের ব্যবহার করা এই উপমাটি একটি সংকেত, যার মাধ্যমে তিনি সামরিক অভিযানকালে ‘গণধর্ষণ’কে কৌশল হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। যশোরে সাংবাদিকদের একটি দলের সঙ্গে আলাপকালে টিক্কা খান ‘প্যাহেলে উনকো মুসলমান কারো (প্রথমে এদের মুসলমান বানাও)’ এ উক্তি করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। ডি’ কোস্টা যুক্তি দেখান এর দ্বারা প্রতীয়মান হয়, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরের কাছে বাঙালিদের সম্পর্কে অনুভূতি হচ্ছে ‘আনুগত্যহীন মুসলিম ও দেশপ্রেমহীন পাকিস্তানি।’
এক বিবৃতিতে জেনিক অ্যারিন্স বলেছেন, যেকোনো একটি জাতিগত গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। কানাডীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যাডাম জোনস বলেছেন, এই গণধর্ষণের অন্যতম একটি কারণ ছিল বাঙালি নারীদের অসম্মান করার মাধ্যমে বাঙালি সমাজের মনস্তাত্ত্বিকভাবে পতন ঘটানো। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি পুরুষদেরও ধর্ষণ করেছিল। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর জাস্টিস মন্তব্য করেছে, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা ছিল একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী দ্বারা স্বেচ্ছায় গৃহীত নীতির একটি অংশ। লেখক মুলক রাজ আনন্দ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে বলেছেন, ‘ধর্ষণগুলো এতটাই পদ্ধতিগত ও পরিব্যাপক ছিল যে এগুলো সচেতনভাবে গৃহীত সমরনীতির অংশ ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানি পরিকল্পিত একটি নতুন জাতি তৈরি করতে ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে দুর্বল করে দিতে।
পাকিস্তানিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাতের বেলা অভিযান পরিচালনাকালে আক্রমণকারীরা গ্রামের মহিলাদের ওপর চড়াও হতো। প্রায়ই ত্রাস সৃষ্টির অংশ হিসেবে তাদের পরিবারের সদস্যদের সামনেই এগুলো ঘটানো হতো। এছাড়া আট থেকে ৭৫ বছর বয়সি নারীদের অপহরণ করে বিশেষভাবে নির্মিত শিবিরে নিয়ে যাওয়া হতো, যেখানে তারা বারবার লাঞ্ছিত হতো। ক্যাম্পে বন্দি থাকা অনেককেই হত্যা করা হয়, অথবা তারা নিজেরাই আত্মহত্যা করে। কিছু নারী তাদের নিজেদের চুল ব্যবহার করে আত্মহত্যা করায় সৈন্যরা বন্দিনীদের চুল কেটে দেয়। যারা অপহৃত হয়েছিল এবং সেনাবাহিনীর হাতে আটক ছিল এ ধরনের ৫৬৩ নারী সম্পর্কে টাইম ম্যাগাজিনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যখন সেনাবাহিনী তাদের মুক্তি দেওয়া শুরু করে, তখন তাদের সবাই তিন থেকে পাঁচ মাসের গর্ভবতী ছিল। কিছু নারীকে জোর করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। পাকিস্তান সরকারের হিসাবমতে যেক্ষেত্রে ধর্ষণের সংখ্যা শতাধিক, সেখানে অন্যান্য হিসাবমতে, এই সংখ্যা আনুমানিক দুই লাখ থেকে চার লাখ। এই নির্যাতিতরা পাঁচ-ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হলে তাদের মুক্তি দিয়ে উপহাস করে বলা হতো, ‘যখন আমার ছেলে ভূমিষ্ঠ হবে, তুমি তাকে অবশ্যই আমার কাছে নিয়ে আসবে।’(Daktar: Diplomat in Bangladesh by Dr. Viggo Olsen)
পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের নারী নির্যাতন-সম্পর্কিত প্রতিবেদনগুলো এ অঞ্চলের বাইরে পাঠাতে বাধাদানের চেষ্টা করলেও গণমাধ্যমে তাদের নৃশংসতার সংবাদ বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়ে সাধারণ্যে পৌঁছে যায়। ফলে এটি স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য ব্যাপক ‘আন্তর্জাতিক জনসমর্থন’ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
‘ইস্ট পাকিস্তান: দি এন্ড গেম’ বইটিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির একটি বিতর্কিত উক্তি ফাঁস করেন লেখক ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী, যেখানে একাত্তরে সংগঠিত ধর্ষণ-কীর্তিগুলোর সাফাই গাইতে জেনারেল নিয়াজি বলেন, ‘আপনি এ রকম আশা করতে পারেন না যে, সৈন্যরা থাকবে, যুদ্ধ করবে ও মুত্যুবরণ করবে পূর্ব পাকিস্তানে আর যৌনচাহিদা নিবারণ করতে যাবে ঝিলামে (ঝিলাম পাঞ্জাব প্রদেশের সর্ববৃহৎ নদ)।’
ব্রাউনমিলার লিখেছিলেন, ‘একাত্তরের ধর্ষণ নিছক সৌন্দর্যবোধে প্রলুব্ধ হওয়া কোনো ঘটনা ছিল না আদৌ। আট বছরের বালিকা থেকে শুরু করে ৭৫ বছরের নানি-দাদির বয়সি বৃদ্ধাও শিকার হয়েছিল এই লোলুপতার। পাক সেনারা কেবল ঘটনাস্থলে তাদের পৈশাচিকতা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, প্রতি ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ১০ জনকে ক্যাম্প বা ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হতো সৈন্যদের জন্য। রাতে চলত আরেক দফা নারকীয়তা। কেউ কেউ হয়তো ৮০ বারেরও বেশিবার ধর্ষিত হয়েছেন! এই পাশবিক নির্যাতনে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, আর কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা কল্পনাও করা যাবে না। (Brownmiller)
(১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল প্রেরিত একটি রক্তাক্ত তারবার্তা): হত্যাযজ্ঞের মাত্রা দেখে ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ‘গণহত্যা’ হচ্ছে বলে টেলিগ্রাম পাঠায়। এর মধ্যে একটি টেলিগ্রাম ব্লাড টেলিগ্রাম নামে সুপরিচিত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য পাঠানোর সপক্ষে বলেন, ‘আমরা কি বসে বসে তাদের (বাংলাদেশের) নারীদের ধর্ষিত হতে দেখব?’ এ ঘটনা নিয়ে ব্রিটেনের হাউজ অব কমন্সে আলোচনা হয়।
‘মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে আড়াই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছে। কিন্তু ‘ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ তাদের গবেষণায় বলছে, এ সংখ্যা প্রায় চার লাখ ৬০ হাজার। এমনকি ৯ মাসে যে ৩০ লাখ বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছে, তার ২০ শতাংশই নারী। নির্যাতনের ধরন ছিল বর্বরোচিত: একাত্তরে যে ‘সাড়ে চার লাখ নারী’র ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়, তার ধরন ছিল অমানুষিক। ঘাতকরা কেবল নির্যাতন বা ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, ৭০ শতাংশ ধর্ষিতার সামনে হত্যা বা নির্যাতন করা হয়েছে তাদের স্বামী বা নিকট আত্মীয়কে। নির্যাতিত নারীর মধ্যে ৭০ শতাংশ নারীকে স্পট ধর্ষণ ও স্পট গণধর্ষণ এবং ১৮ শতাংশ নারীকে কারাগারে ও ক্যাম্পে নির্যাতন করা হয়েছে। ‘ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’র আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীদের ৫৬ দশমিক ৫০ শতাংশ মুসলমান, ৪১ দশমিক ৪৪ শতাংশ হিন্দু এবং দুই দশমিক ০৬ শতাংশ ছিলেন অন্যান্য ধর্মের। দেশের ৪২ জেলার ৮৫ থানায় নির্বাচিত ২৬৭ জনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা চালানো হয়। গবেষণায় আরও বলা হয়, নির্যাতিত নারীদের মধ্যে বিবাহিত ছিল ৬৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং অবিবাহিত ৩৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। ভারতে আশ্রয় নেওয়া নির্যাতিত ও ধর্ষিত হিন্দু নারীদের মধ্যে কুমারী বা অবিবাহিত ছিল ৪৪ শতাংশ। যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকা তাদের অধিকাংশই আর দেশে ফেরেনি। গবেষণায় দেখা যায়, নির্যাতন-পরবর্তী সময়ে নারীদের স্বাস্থ্যসমস্যা ছিল প্রকট। এসব নারী আক্রান্ত হয়েছে নানা যৌন রোগে। তারা দীর্ঘদিন আক্রান্ত ছিল মানসিক রোগেও। ৮০ শতাংশ নারী বিষাদগ্রস্ততা এবং ৮০ শতাংশ অস্থিরতা, নৈরাশ্য ও মাথাব্যথায় ভুগেছে দীর্ঘকাল। একইভাবে ৯০ শতাংশ নারী ভুগেছে গ্লানিতে। আর সাত শতাংশ নারীকে স্থায়ী ক্ষত নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়েছে সারা জীবন। বেঁচে আছে এখনও অনেকে। ডা. এম এ হাসান বলেন, ‘সংস্থার নিজস্ব ল্যাবরেটরি ও নির্বাচিত হাসপাতালে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে নির্যাতিত নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সেই ফলাফলের ভিত্তিতেই উঠে এসেছে এই চিত্র।
নির্যাতন-পরবর্তী সময়ে এসব নারীকে সইতে হয়েছে নানা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। নির্যাতিত হওয়ায় স্বামী আর ঘরে তোলেনি সাত শতাংশ নারীকে। ৯০ শতাংশ নারীকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে স্বজন বা পরিবারের অন্য সদস্যদের দ্বারা। গ্রামাঞ্চলে নির্যাতিত নারীদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সবকিছু জানিয়ে বিয়ে দিতে হয়েছে। আর শরণার্থী হয়ে যারা দেশত্যাগ করেছিল কিংবা যারা শহরাঞ্চলে বাস করত, তাদের বিষয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে।
ডিসেম্বর ও মার্চ মাস তাই আমাদের জন্য উৎসব পালনের পাশাপাশি অনুতাপ ও দুঃখ করার মাসও বটে। ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া গণহত্যা ও গণধর্ষণের পুনর্বিচার দাবি করার মাস যেন ডিসেম্বর ও মার্চ মাস। এসব বীরাঙ্গনার দুঃখ, যন্ত্রণা ও ত্যাগ আমাদের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করে। দেশ গঠনে আমাদের তাই কাজ করতেই হবে। দেশকে ভালোবাসতেই হবে।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..