বৃক্ষরোপণে সম্পৃক্ত করতে হবে সবাইকে

সারা দেশে ৩০ লাখ গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি পালন করা হয়েছে বুধবার। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের স্মরণে নেওয়া হয়েছে এ উদ্যোগ। বিশ্ব পরিবেশ দিবস, বৃক্ষমেলা ও বৃক্ষরোপণ অভিযান উপলক্ষে উদ্যোগটি নেয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগানো হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এর পর থেকে প্রতিবছর সারা দেশে ৩০ লাখ গাছ রোপণ করবে। এর আগে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি-বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি সবাই সম্পৃক্ত হলে এ উদ্যোগ আরও সফলতা পেতে পারে।
গাছের চারা রোপণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে গাছের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রতিদিনই গাছ কাটা হচ্ছে। এতে প্রাণীকুলের জীবন ধারণের অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেন কমছে। গাছপালা নিয়মিত বৃষ্টিপাতে সাহায্য করে, নদীভাঙন থেকে স্থলভাগ রক্ষা করে। ঝড়-ঝঞ্ঝার মতো দুর্যোগ থেকে বসতবাড়ি রক্ষা করে। গাছ কমে গেলে মরুকরণ, ভূমিধস ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা বেড়ে যায়। এসব মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে গাছ লাগানোর বিকল্প নেই।
বিশ্বের যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন দুর্যোগের কবলে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে – বাংলাদেশের অবস্থান সেসব দেশের তালিকার শীর্ষে। যদিও জলবায়ুর এ পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়। উন্নত বিশ্ব এবং ভারত, চীন, রাশিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো বেশি মাত্রায় কার্বন নির্গমন করে। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তন। এ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর উচিত বেশি করে গাছ লাগানো। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক। কিন্তু জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) সাম্প্র্রতিক তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ভূখণ্ডের সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি। বনভূমি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট বলেছে, গত সাত বছরে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে।
গাছপালা উজাড় হওয়ার যত কারণ থাকতে হয়, সেগুলোর সবই আমাদের রয়েছে। যেমন, বাড়িঘর তৈরি, শিল্পকারখানা স্থাপন, সড়ক সম্প্র্রসারণ, নদীভাঙন প্রভৃতি। এতে আবার যোগ হয়েছে তিনটি উপলক্ষ। এক. রোহিঙ্গা বসতি স্থাপনে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে উজাড় হয়েছে কয়েক হাজার একর বনভূমি। দুই. মহেশখালীতে সংরক্ষিত বনের ২০০ একর অধিগ্রহণ করা হয়েছে অপরিশোধিত তেলের ডিপো ও পাইপলাইন স্থাপনের জন্য। তিন. দেশের বিভিন্ন এলাকায় বনভূমির জায়গায় গড়ে উঠছে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। অবশ্য গ্রামেও যথেচ্ছ বাড়ি নির্মাণ ঠেকাতে আইন করেছে সরকার। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন করতে গেলে বাংলাদেশে বনভূমি ২২ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। জাতিসংঘের কাছে এ অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ।
সার্বিকভাবে দেশের ইকোসিস্টেম ও আবহমান বাংলার চিরায়ত চাষাবাদ মৌসুম ঠিক রাখতে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো অপরিহার্য। এজন্য টেকসই বনায়ন কর্মসূচির পাশাপাশি বড় উজাড়কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় টেকসই আবাসন গড়ে তুলতে হবে। আবাদযোগ্য অব্যবহৃত জমির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি যেসব দেশের অতিমাত্রায় কার্বন নির্গমনের কারণে আমরা ক্ষতির শিকার হচ্ছি; তাদের কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।