দুরে কোথাও

বেইজিংয়ের পথে-প্রান্তরে

পরের দিনের গন্তব্য ছিল বেইজিংয়ের বহুল পরিচিত পার্ল মার্কেট। মূলত কেনাকাটার উদ্দেশ্যেই দলের সবাই এখানে আসি। মার্কেটের ভেতরে ঢুকে আবিষ্কার করলাম, এটি অনেকটা আমাদের বঙ্গবাজার হকার্স মার্কেটের মতো। পার্থক্য বলতে এখানকার দোকানগুলো পরিপাটি, সাজানো-গোছানো ও টাইলস করা। রয়েছে চলন্ত সিঁড়ি। আরেকটি বড় পার্থক্য
হলো, এখানকার দোকানিদের প্রায় সবাই
মহিলা-তরুণীদের সংখ্যা বেশি। তবে কেনাকাটায় সতর্ক না হলে ধরা খাওয়ার শঙ্কা শতভাগ। এখানে চলে তীব্র দর কষাকষি।
মার্কেটে ঢোকার আগেই আমাদের গাইড এরিক জানান, দোকানি দ্বিতীয়বার যে দাম চাইবে এর ৩০ ভাগের বেশি ওঠা যাবে না। বাস্তবেও হলো তাই। দেখা গেছে, কোনো পণ্যের দাম প্রথমে চেয়েছে ৪০০ ইউয়ান। আর দরাদরি করতে গেলে এক লাফে ২৫০ ইউয়ানে নেমে এসেছে। শেষ পর্যন্ত বিক্রি করছে ৫০ থেকে ৮০ ইউয়ানে। মজার ব্যাপার, দরাদরি চলে ক্যালকুলেটরে। দোকানি মেয়েদের সঙ্গে দর কষাকষি বেশ উপভোগ্য। তাদের সেন্স অব হিউমার খুব চমৎকার। মজা করতে জানে। তবে কখনও তা সীমার বাইরে নয়। মার্কেটটিতে রয়েছে পরিধেয় জুতা, গয়না, ব্যাগ, কসমেটিকস, ট্রাভেল ব্যাগ, ইলেকট্রনিক্স, স্যুভেনির শপ প্রভৃতি।
আরেক সকালে যাই বেইজিং ক্যাপিটাল মিউজিয়ামে। চীনের যে কোনো জাদুঘর ঘুরে দেখা যায় প্রবেশ ফি ছাড়াই। স্বদেশিদের যে কোনো ধরনের পরিচয়পত্র ও বিদেশিদের পাসপোর্ট দেখালেই চলে। পাঁচতলাবিশিষ্ট বিশাল জাদুঘরটির বাইরের দৃশ্য খুবই চমৎকার। সবাইকে দুই ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে আপাতত বিদায় নেন গাইড। ওপর থেকেই ঘুরে দেখা শুরু করি দলের সবাই। প্রথমেই দেখি, পঞ্চম তলার গ্যালারি। পুরো গ্যালারিজুড়ে রয়েছে প্রাচীন বেইজিংয়ের লোকপ্রথার নানা উপকরণ। আছে সে সময়কার মৃৎশিল্প, কাঠের আসবাব, কাপড়-চোপড় ও গয়না। প্রাচীন কালের বেইজিংয়ের লোকশিল্পের নানা উপকরণ দেখে নামি চতুর্থ তলায়। এখানে রয়েছে তিনটি পৃথক গ্যালারি। প্রথম গ্যালারিটি সজ্জিত প্রাচীন কালের চীনামাটির বাসনপত্রে। দ্বিতীয় গ্যালারিতে রয়েছে বৌদ্ধমূর্তি নিয়ে আদিকালে নির্মিত কিছু নির্ধারিত শিল্পকর্ম। বলাবাহুল্য, অধিকাংশ মূর্তি তামা ও পিতলের। তৃতীয় গ্যালারি ভরপুর পেকিং অপেরার পুরাকীর্তি দিয়ে। সংস্কারকাজ চলমান থাকায় তৃতীয় তলা দেখা যায়নি। দ্বিতীয় তলায় সংরক্ষিত আছে লিয়াও রাজত্বের রাজধানীগুলোর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ। নিচতলায় দেখা যায়, প্রাচীন বেইজিংয়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিচিত্র সব বিবরণ। প্রতি তলায় মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র অনবরত প্রদর্শিত হচ্ছে। আছে স্যুভেনির শপও। আন্ডারগ্রাউন্ডের পুরোটাই ব্যবসা কেন্দ্র। আছে হস্তশিল্প ও বইয়ের দোকান, রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে। তবে দামটা তুলনামূলকভাবে চড়া। নিচতলায় অভ্যর্থনা কেন্দ্রের বিপরীতে রয়েছে প্রায় ১০০ আসনের থিয়েটার। এক ঘণ্টা পরপর বেইজিংয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষ্টি নিয়ে নির্মিত ১২ মিনিটের ডকুমেন্টারি ‘গ্লোরিয়াস বেইজিং’ দেখার সুযোগ পান দর্শকরা।
বেইজিংয়ে আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য ছিল ৭৯৮ চিত্র অঞ্চল। ঢাকায় বেইলি রোড যেমন নাটকপাড়া, বেইজিংয়ের ৭৯৮ এলাকাটিও তেমনি পুরো এক অঞ্চল চিত্রপাড়া। রাস্তার দু’পাশে অনেক চিত্রশালা। কোনোটি ফ্রি আর কোনোটি দেখতে প্রয়োজন নির্ধারিত প্রবেশ ফি। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে ঢুঁ মারি ঝুবিন গ্রিন কপার আর্ট সেন্টারে। বিভিন্ন প্রাণী, বাদ্যযন্ত্র, বৃক্ষরাজি ও পাহাড় আছে এই চিত্রালয়ে। সব চিত্রই তামার। এ যেন তামার কারখানা। এখান থেকে বের হয়ে একটু সামনে যেতেই চোখে পড়ে বিশাল এক দেয়ালজুড়ে রংতুলির আঁচড়। সুউচ্চ ও বেশ প্রশস্ত দেওয়ালে তুলে ধরা হয়েছে বেইজিং শহরের বিভিন্ন চিত্র। এরপর একে একে দেখা হয় ইউলেনস সেন্টার ফর কনটেমপরারি আর্ট, আর্ট ব্রিজ, এশিয়ান আর্ট ওয়ার্কস, সউল কালেকশনসহ বেশ কিছু চিত্রশালা। হাঁটতে হাঁটতে লেনের একেবারে শেষ মাথায় দেখা মিলল কয়েকজন শিশু চিত্রশিল্পীর সঙ্গে। গভীর আগ্রহে, একান্ত মনোনিবেশে তারা বোর্ডের কাগজে ছবি আঁকায় ব্যস্ত। সন্তানদের এমন সৃষ্টিশীল কর্ম পাশে বসে সানন্দে উপভোগ করছেন অভিভাবকরা। তাদের অনুমতি নিয়ে শিশুদের এমন চিত্রকর্মের প্রচেষ্টাকে কেউবা স্থিরচিত্রে, কেউবা ভিডিওচিত্রে ধারণ করে নিই।
বেইজিং শহরের রাস্তার দু’পাশজুড়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সুরম্য ভবন। পুরো শহরজুড়ে রয়েছে সবুজের সমারোহ। সড়ক বিভাজকগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে ফুলবাগান, নেই কোনো যানজট, জনজট। নির্দিষ্ট লেন মেনে চলছে গাড়ির
আসা-যাওয়া। যাত্রীবাহী বাসগুলো নির্ধারিত স্টপেজ দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠা-নামার সুযোগ দিচ্ছে। পারস্পরিক ধাক্কাধাক্কি বা ওভারটেকিংয়ের কোনো প্রবণতা নেই। স্বয়ংক্রিয় সুনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কখনও কোনো ট্রাফিক পুলিশকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে দেখিনি। চমৎকার পিচঢালা রাজপথ। সব মার্কেটের সামনে রয়েছে পার্কিং ব্যবস্থা। আছে দখলমুক্ত, প্রশস্ত ও পরিচ্ছন্ন ফুটপাত। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের রাজধানীর পথ দিয়ে বহুবার যাওয়া-আসা করেছি, অথচ কখনও ঢাকার মতো মানুষের স্রোত চোখে পড়েনি। এখানকার সড়কে লোকসমাগম আমাদের ছোট্ট যেকোনো জেলা সদরের চেয়ে কম মনে হয়েছে।
চীনে সাইকেলে চড়ার চল রয়েছে। সব কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কিংবা শপিংমলের সামনে দেখা যায় সাইকেলের দীর্ঘ সাড়ি। এছাড়া সাইকেল আরোহীদের জন্য রয়েছে রাস্তার উভয় পাশে পৃথক লেন।
ইংরেজি জানা গাইড ছাড়া পথ চলা খুব কষ্টকর। কোথায়ও তেমন ইংরেজির বালাই নেই। আমাদের প্রাথমিক পড়–য়া শিক্ষার্থীরা যে মাত্রায় ইংরেজি জানে, এখানকার বিশ্বখ্যাত চেইনশপের বিক্রয় প্রতিনিধিরা তাও জানে না। দরদাম করতে হয় ক্যালকুলেটর টিপে। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে গুগল অনুবাদকের সহায়তায় স্বাভাবিক টুকটাক বাতচিত চালিয়ে নেওয়া যায়।
স্থানীয় চীনারা যারা ইংরেজি জানেন ও ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করেন (পেশাদার বা স্বেচ্ছাসেবী), সবারই একেকটা ইংরেজি নাম আছে। জš§সূত্রে পাওয়া চীনা নাম বিদেশিদের মনে রাখা কঠিন বলে তারা নিজেরাই ইংরেজি নামকরণ করেন। কিছুদিন পরে ওই নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করেন। সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্সের অর্থনীতির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবী ট্যুর গাইড এন্ডারসন জানান, এটি তার তৃতীয় ইংরেজি নাম। বিদেশিদের কাছে ইংরেজি নামে পরিচিত হলেও নিজেদের মাঝে তারা চীনা নামেই পরিচিত। একে অপরকে ইংরেজি নামে চেনে না।

মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ

সর্বশেষ..