বেসরকারি খাতের ডিজেলচালিত ৭ কেন্দ্রের বোঝা টানছে পিডিবি

প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় ২০-৩১ টাকা

ইসমাইল আলী: বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ কেনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি হয় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে স্থাপিত দেশ এনার্জি থেকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ মেগাওয়াট। ভাড়াভিত্তিক ডিজেলচালিত এ কেন্দ্রটিতে গত অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় প্রায় ১২ কোটি ৬৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৪০০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে ৩১ টাকা ৬৬ পয়সা।
এদিকে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গত অর্থবছর নতুন করে উৎপাদন শুরু করে বাংলা ট্র্যাকের ২০০ মেগাওয়াটের ডিজেলচালিত একটি কেন্দ্র। এতে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় ৩১ টাকা পাঁচ পয়সা। কেন্দ্রটি থেকে মাত্র চার কোটি ৩৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হয়। এজন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) গুনতে হয় ১৩৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
শুধু দেশ এনার্জি বা বাংলা ট্র্যাকই নয়, ডিজেলভিত্তিক বেসরকারি বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিদ্যুৎ কেনায় গড়ে ব্যয় হয়েছে ২০ থেকে ৩১ টাকা। যদিও গ্রাহক পর্যায়ে ৬-১০ টাকা দরে বিদ্যুৎ বিক্রি করছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। আর বাল্কে (পাইকারি) চার টাকা ৮৪ পয়সা দরে তা বিক্রি করে পিডিবি। ফলে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে পিডিবিকে।
সূত্র জানায়, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অত্যধিক উৎপাদন ব্যয়ের জন্য দায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ। কেন্দ্রভেদে এক্ষেত্রে মেগাওয়াটপ্রতি মাসে ১৩ থেকে ১৫ হাজার ডলার চার্জ দিতে হয় পিডিবিকে। কোনোটিতে চার্জ আরও বেশি। চুক্তি অনুযায়ী, বছরে ১০ শতাংশ সময়ে ওভারহলিংয়ের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকলেও এ চার্জ পরিশোধ করতে হয়। আবার চাহিদা না থাকলে কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনা না হলেও এ চার্জ দিতে হয়।
ক্যাপাসিটি চার্জের সঙ্গে যুক্ত হয় অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স চার্জ ইউনিটপ্রতি এক-দেড় টাকা। আরও আছে জ্বালানি তথা ফুয়েল চার্জ। এছাড়া ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা (প্লান্ট ফ্যাক্টর) ও জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা (ফুয়েল ইফিশিয়েন্সি) অনেক কম। ফলে সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি পড়ে।
পিডিবির তথ্যমতে, গত অর্থবছর কেরানীগঞ্জের ব্রাহ্মণগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াটের আরেকটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে এগ্রিকো পাওয়ার। ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) এ কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র এক কোটি ৫০ লাখ ইউনিট। এ বিদ্যুৎ কেনায় ব্যয় হয় ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় ২৬ টাকা ৩৩ পয়সা।
গড় উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকে এর পরের অবস্থানেই রয়েছে ঢাকার অদূরে পাগলায় স্থাপিত ডিপিএ পাওয়ার। ডিজেলচালিত ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রটিতে গত অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১০ কোটি ৯১ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় ২৮৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এ হিসাবে ইউনিটপ্রতি দাম পড়ে ২৬ টাকা আট পয়সা।
এদিকে গত অর্থবছর এপ্রিলে যশোরের নওয়াপাড়ায় নতুন করে উৎপাদন শুরু করে বাংলা ট্র্যাকের ১০০ মেগাওয়াটের ডিজেলচালিত দ্বিতীয় ইউনিট। এতে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় ২৫ টাকা ৯৯ পয়সা। কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় তিন কোটি ৮৭ লাখ ইউনিট। এজন্য পিডিবিকে গুনতে হয় ১০০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আর গড় উৎপাদন ব্যয়ে ডিজেলচালিত অন্য কেন্দ্র খুলনার এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল রয়েছে পরের অবস্থানে। কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৫৫ মেগাওয়াট। গত অর্থবছর এ কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় ৯ কোটি ৯৩ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় ২৩৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আর ইউনিটপ্রতি দাম পড়ে ২৩ টাকা ৬৪ পয়সা।
এদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের সামিট মেঘনাঘাট কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় ৮৩ কোটি দুই লাখ টাকা। ৩৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ কেনার জন্য বিল পরিশোধ করা হয় এক হাজার ৬৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ফলে গত বছর কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যয় পরে ইউনিটপ্রতি ১৯ টাকা ৮৭ পয়সা। যদিও গত ১ ডিসেম্বর থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত টানা চার মাসের বেশি (১২৫ দিন) কেন্দ্রটি বন্ধ রাখা হয়। আর চুক্তির শর্তের কারণে এ সময় বসিয়ে রেখেও প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয় পিডিবিকে।
জানতে চাইলে ক্যাবের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমান সরকার ২০০৯ ও ২০১০ সালে বেশকিছু ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেয়। তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া হলেও পরে সেগুলোর মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। যদিও কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা খুবই কম। অথচ এ সময়ে কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল। তবে তা ভঙ্গ করে সরকার।
তিনি আরও বলেন, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও গত কয়েক বছরে নতুন করে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ করা হচ্ছে পিডিবিকে। আর এ উচ্চ মূল্যের বিদ্যুতের বোঝা জনগণের কাঁধে চাপানোর জন্য দফায় দফায় দাম বাড়ানো হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ ডিপিএ পাওয়ার ও দেশ এনার্জির। কেন্দ্র দুটির জন্য মাসে মেগাওয়াটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয় যথাক্রমে ২০ হাজার ৬০০ ও ১৮ হাজার ৯৫০ ডলার। ডিজেলচালিত অন্য কেন্দ্র খুলনার এগ্রিকোর ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল মেগাওয়াটপ্রতি মাসে ১৪ হাজার ডলার। নতুন অনুমোদন দেওয়া আইপিপিগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ক্ষেত্রভেদে এর চেয়ে বেশি।
জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ বলেন, ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি হয়। কারণ কেন্দ্রগুলোর প্লান্ট ফ্যাক্টর কম। চাইলেও এগুলো ৫০ শতাংশ সময় চালানো সম্ভব নয়। এছাড়া ডিজেলের উচ্চমূল্যও বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ার আরেকটি কারণ। এর সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জ তো আছেই। তবে ডিজেলচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত কেন্দ্রেও ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ২৬-২৭ টাকাই পড়ে। তাই চাইলেও এ খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।