বৈদেশিক মুদ্রা আনছে শেলাবুনিয়ার নকশিকাঁথা

শুভ্র শচীন:  আবহমান গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যগুলোর অন্যতম একটি নকশিকাঁথা শিল্প। শীতের কাঁথা কিংবা বিছানার চাদর অথবা বালিশের কভার হিসেবে নকশিকাঁথার ব্যবহার আমাদের দেশে প্রচলিত। নারীরা সময় পেলেই বসে যান সুই-সুতা নিয়ে। তৈরি করেন নতুন নকশিকাঁথা। নিজেদের প্রয়োজনে নকশিকাঁথা অনেকে সেলাই করলেও এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বা সংগঠিত সেলাইকেন্দ্র আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। তবে ব্যতিক্রমী একটি নকশিকাঁথা সেলাই কেন্দ্র গড়ে উঠেছে দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবন-সংলগ্ন বাগেরহাটের মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে।

অসহায়-দুস্থ নারীদের জন্য শেলাবুনিয়ায় এ সেলাই কেন্দ্রটি গড়ে তোলেন ফাদার মারিনো রিগন। তিনি মোংলার সেন্ট পলস গির্জার পুরোহিত ছিলেন। একাধারে তিনি কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজসেবক। বাংলাদেশে ধর্মপ্রচার করতে এসে এখানকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে যান তিনি। ইতালির এ ধর্মযাজক মনেপ্রাণে একজন বাঙালি। যদিও বয়সের কারণে গত কয়েক বছর তিনি ইতালিতেই বসবাস করছেন।

1 Nakshi Katha (1)গির্জার আঙিনায় ১৯৮২ সালে গড়ে তোলেন সেলাই কেন্দ্রটি। এখানে বর্তমানে কাজ করছেন অর্ধশতাধিক নারীকর্মী। যারা বেশিরভাগ অসহায়, দুস্থ ও স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা বিধবা। কর্মীরা নকশিকাঁথায় ফুটিয়ে তোলেন আমাদের আবহমান সবুজ-শ্যামল গ্রামবাংলার ফুল, ফল, পাখি প্রভৃতি। রয়েছে কবিতা, নদী, পালকি, ঢেঁকি, গ্রাম্যবধূ, কৃষাণ-কৃষাণি কিংবা কাঁচা-পাকা ধানক্ষেতও। বাদ পড়েনি পশুপাখিও। হাতি, ঘোড়া, বাঘসহ নানা ধরনের পশু-পাখি রয়েছে। রাখাল বালকের গরু চরানোর দৃশ্য কিংবা নদী-ঘাট, পালতোলা নৌকা, নৌকা পারাপারের মনকাড়া দৃশ্য তো আছেই। নারীদের ধানভানা, ধান শুকানো, আয়না দেখা, চুল বাঁধা, ঢেঁকিতে পার দেওয়ার দৃশ্য সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন তারা। বধূ সাজে পালকি, কনে দেখা, বিয়েতে হলদি বাটা, মেহেদি বাটা, কনে বরণও দেখা যায় অনেক নকশিকাঁথায়। দইওয়ালা, নাগরদোলা, বৈশাখী মেলা অথবা বাংলাদেশের রূপ-বৈচিত্র্য কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।

হাতেগোনা কয়েকজন কর্মী নিয়েই এর যাত্রা শুরু। মারিনো রিগন কর্মীদের সেলাইয়ের ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেন। তবে এতে তৃপ্ত ছিলেন না তিনি। ভাবতেন, কর্মীদের নকশিকাঁথার বিষয়ে ভালো কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় কি-না। এজন্য ছুটে আসেন ঢাকায়।

1 Nakshi Katha (2)ধানমন্ডিতে নকশিকাঁথার একটি প্রদর্শনীর প্রধান উদ্যোক্তা শিল্পী সুরাইয়া রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। সুরাইয়া রহমান সেলাই কেন্দ্রের দুই কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেন। এভাবে চলতে থাকলো নকশিকাঁথা সেলাইয়ের ব্যাপক কাজ। তবে কোথায় বিক্রি হবে কিংবা কারা কিনবে অথবা যারা নকশিকাঁথাগুলো সেলাই করছে তাদের সংসারই বা চলবে কী করেÑএ নিয়ে কিছুটা হতাশায় পড়েন রিগন।

বিক্রির একটা স্থায়ী পথ খুঁজছিলেন রিগন। তাকে একাজে সহায়তা করেন আনুনসিয়েত্তা। গ্রামবাংলার মেয়েদের সেলাই করা এসব নকশিকাঁথা দেখে তার পছন্দ হয়ে যায়। ইতালিতে ফেরার সময় তিনি অনেকগুলো নকশিকাঁথা নিয়ে যান। সেগুলো তিনি সেখানে বিক্রি করে বেশ সাড়াও পান। তিনি ভাবলেন, ইতালির শিল্পরসিকদের কাছে এসব নকশিকাঁথার খবর পৌঁছে দেওয়া দরকার। সেজন্য তিনি আয়োজন করলেন নকশিকাঁথার প্রদর্শনী। আনুনসিয়েত্তা ফাদার রিগনের বোন।

১৯৮৬ সালের ২ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ইতালির ভিসেনজা শহরের মনতে ডি পিয়েত্রা হলে প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। আর এর মাধ্যমেই তৈরি হয় সেলাই কেন্দ্রের কাঁথা বিক্রির নতুন পথ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ৮ থেকে ১৯ ডিসেম্বর ও ২০০২ সালে রোমের ডোমাস ম্যারিয়ে অব ক্যাথলিক অ্যাকশানে আরও দুটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এসব প্রদর্শনীতে এখানকার অনেক কর্মীও অংশ নিয়েছিলেন। বর্তমানে এখানকার নকশিকাঁথা ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়।

 

খুলনা