বৈদেশিক শ্রমবাজার রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে

আমাদের দেশের বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ আসছে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো আয় থেকে, রেমিট্যান্স হিসেবে। এ বিপুল অর্থ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। আমাদের অর্থনীতিতে তাদের বিশাল অবদান অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি শ্রমবাজারে অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সেখানে শ্রমিকরা হয়রানি-ভোগান্তির শিকার হওয়ার পাশাপাশি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। বিষয়টি উদ্বেগজনক। বৈদেশিক শ্রমবাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বৈদেশিক শ্রমবাজারে এ ধরনের সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে সৌদি আরবে। গতকালের শেয়ার বিজে ‘সৌদি থেকে ফিরলেন আরও ১১৭ শ্রমিক’ শিরোনামে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এতে বলা হয়, টানা তৃতীয় দিনের মতো সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ ১১৭ জনসহ তিন দিনে ৪৩১ জন দেশে ফিরেছেন। ফিরে আসা শ্রমিকদের দাবি, এ সংখ্যা আরও বেশি। উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও এসব শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এমনকি এসব শ্রমিককে ফেরত পাঠানোর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ সৌদি সরকার আমাদের অবহিত করেনি। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক। তাদের ফেরত পাঠানোর কারণ জানতে সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের আরও জোরাল ভূমিকা রাখতে হবে।
ক’বছর ধরেই বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলোয় অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর মধ্যে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও লিবিয়ার বাজার বেশি আলোচনায় রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কয়েক দফা শ্রমিক পাঠানো বন্ধের পর অচলাবস্থা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানোর পর তা নিয়ে ভয়াবহ কিছু খবর আমাদের আবার ভাবিয়ে তুলেছে। অনেকে ইতোমধ্যে দেশে ফিরে করুণ অবস্থার কথা জানিয়েছেন। এখন সেখান থেকে পুরুষ শ্রমিকরাও ফিরতে শুরু করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া থেকেও অনেকে ফিরে এসেছেন। এ বিষয়গুলো অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। এসব দেশে বহু বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত। তাদের এভাবে ফিরে আসা আরও বাড়লে একসময় দেশীয় শ্রমবাজারে চাপ আরও বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বিদেশে শ্রমবাজার নিয়ে আমাদের দূতাবাসগুলোর বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে। এছাড়া দেশে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কথা শোনা যায়। এর অবসান হওয়া জরুরি। দূতাবাসগুলোতে শ্রমিকরা কোনো অভিযোগ করলে তা যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সমাধান হয়, তার উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া দেশে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শ্রমিক পাঠানোয় নিয়োজিতরা কোনো অনিয়মে জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে কারও দায় পেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই বলেই আমরা মনে করি।
বৈদেশিক শ্রমবাজারের ওপর আমাদের নির্ভরতার বিষয়ে নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে কি না, সেটিও চিন্তা করে দেখা দরকার। সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ অধিকাংশ দেশ এখন অভ্যন্তরীণভাবেই শ্রমিকের চাহিদা পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। দিন দিন এসব দেশে বৈদেশিক শ্রমিকের চাহিদা কমে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক। খবরেই উল্লেখ করা হয়েছে, সৌদি আরব ১২টি সেক্টরকে সৌদিকরণের ঘোষণা দেওয়ায় সেখান থেকে বিদেশি শ্রমিক নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। বৈদেশিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কর্মসংস্থানের জন্য বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে আমাদের। এ বিষয়ে সরকার দ্রুতই প্রয়োজনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।