বোনাস ডিভিডেন্ড দিচ্ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানি

ভাবনায় নির্বাচন-পরবর্তী বছর

শেখ আবু তালেব: দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বারাকা পাওয়ার। গত বছর কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ১৫ শতাংশ বোনাস ও পাঁচ শতাংশ নগদ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। তবে এবার ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ডের পুরোটাই বোনাস দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বারাকা পাওয়ার।
অপরদিকে প্রকৌশল খাতের জিপিএইচ ইস্পাত কোম্পানি গত বছর বিনিয়োগকারীদের পাঁচ শতাংশ নগদ ও পাঁচ শতাংশ বোনাস ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। এবার ডিভিডেন্ডের পুরো ১০ শতাংশই দিয়েছে বোনাস শেয়ার। শুধু এই দুই কোম্পানি নয়, ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর মাঝেই এ বছর বোনাস দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো বলছে, সামনে জাতীয় নির্বাচন। পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এজন্য অর্থ হাতে রেখেছে কোম্পানিটি। অধিকাংশ কোম্পানি এ রকম পরিকল্পানায় এগোচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সাধারণত নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনায় কোম্পানিগুলো পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধি ও নগদ অর্থ বাঁচাতে বছর শেষে বোনাস শেয়ার দিত বিনিয়োগকারীদের। এতে কোম্পানির সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রমাণ মেলে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘমেয়াদে হওয়ার শঙ্কায় এবার বোনাস শেয়ারে আগ্রহী হচ্ছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। ক্রেতা না থাকায় এতে বিনিয়োগ ঝুঁকি বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে তারা পরামর্শ দিয়েছেন, বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা করার।
জানা গেছে, জুন ক্লোজিংয়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১৬০টির বেশি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিয়েছে। এর মধ্যে ১৩৯টি অক্টোবরের মধ্যে ডিভিডেন্ড দিয়েছে। এর মধ্যে পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুধু বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে ৪০ কোম্পানি এবং বোনাস ও নগদ লভ্যাংশ মিলিয়ে দিয়েছে ২৭টি। এছাড়া কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ১২টি কোম্পানি ও ২৮টি কোম্পানি নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচালনা পর্ষদের সভায় ডিভিডেন্ড দেওয়ার প্রস্তাব পাস হবে কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম)। এর পরে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বোনাস শেয়ার বুঝে পাবেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে তখন চাহিদার চেয়ে বেশি শেয়ারের সরবরাহ থাকবে পুঁজিবাজারে। ফলে বাজারে বোনাস শেয়ারের আধিক্য বাড়বে, যা বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে সামনে পুঁজিবাজারে অর্থের প্রবেশ না ঘটলেও বোনাস শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে। বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিলে শেয়ার বিক্রি বৃদ্ধি পাবে। এতে শেয়ারের দরও কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অস্বাভাবিক বোনাস শেয়ার ডিভিডেন্ডের বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ভালো কোম্পানি বোনাস শেয়ার দিলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে দুর্বল কোম্পানির বোনাস শেয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের শেয়ারের ক্রেতা পাওয়া যায় না। ফলে সামগ্রিকভাবে বাজারের ওপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দুর্বল ও বিতর্কিত কোম্পানির বোনাস শেয়ার না কেনার জন্য বিনিয়োগকারীদের অনুরোধ করেন তিনি।
জানা গেছে, গত জুনে শেষ হওয়া হিসাববছরের জন্য বিএসআরএম বিনিয়োগকারীদের জন্য নগদ ১০ শতাংশ ও ১০ শতাংশ বোনাস মিলিয়ে ২০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এই সময়ে কোম্পানিটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস হয়েছে ১২ টাকা ৯৫ টাকা। সমন্বিত শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য বা এনএভি হয়েছে ৬৩ টাকা ৭০ পয়সা। এ সময় কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ৭৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
আগের বছর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ হিসাববছরের জন্য কোম্পানিটির ইপিএস ছিল তিন টাকা ৫৩ পয়সা ও এনএভি ছিল ৫৫ টকা ৭৫ পয়সা। এ হিসাবে গত বছরে ইপিএস বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বছর শেষে ইপিএস ও এনএভি দুটিতে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। তবে পূর্ববর্তী বছরের মতো বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানিটি মোট ২০ শতাংশ (১০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার) লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল।
মুনাফা বাড়লেও লভ্যাংশ না বাড়ানোর কারণ হিসেবে কোম্পানিটি জানিয়েছে, নতুন বছরে ব্যবসা হবে কি না, তাও বলতে পারছি না। এজন্য বিনিয়োগকারীদের কম লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে হাতে নগদ অর্থ রাখার জন্য, যাতে আমরা ভবিষ্যতেও ডিভিডেন্ড দিতে পারি।
বোনাস শেয়ার ঘোষণার কারণ সম্পর্কে বিএসআরএমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সামনে জাতীয় নির্বাচন। দেশের রাজনৈতিক সংকট এখনও কাটেনি। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের আর্থ-সামাজিক ও ব্যবসার পরিস্থিতি কী হবে তা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করছে। বিএসআরএম প্রতিনিয়ত বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলছে। সামনের বছরে যদি বিনিয়োগ সক্ষমতা কাজে লাগাতে না পারি, তাহলে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য প্রয়োজনীয় রিজার্ভ রাখা হয়েছে।
একই ধারাবাহিকতায় চলেছে বিতর্কিত কোম্পানি মুন্নু জুট স্ট্যাফলার। কোম্পানিটি ৩৫০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া স্টাইলক্র্যাফট, রেনাটা, সাইফ পাওয়ার, বিবিএস কেব্লস, জিপিএইচ ইস্পাত, স্কয়ার ফার্মা, বারাকা পাওয়ার ও সিমটেক্স পর্যন্ত নগদের পাশাপাশি বোনাস শেয়ার দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
অবশ্য বোনাস দেওয়ার প্রবণতা ও রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব কিছুটা পড়তে শুরু করেছে পুঁজিবাজারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা ও চীনা কনসোর্টিয়ামের অর্থ ছাড়া হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বাজার। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ করে দেশের প্রথম সারির একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান গত সপ্তাহ শেষে ১১ লাখ টাকা পুঁজি হারিয়েছে কয়েকটি শেয়ার কিনে।
প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে যে পরিমাণ শেয়ার রয়েছে, বোনাস ঘোষণায় এর পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। নতুন এই শেয়ারের ক্রেতা নেই। ফলে চাহিদা না থাকায় দ্রুতই সব শেয়ারের দর পতনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের সঙ্গে পুঁজিবাজারের সরাসরি তেমন কোনো সম্পর্ক না থাকলেও বিনিয়োগকারীরা নিজেদের পুঁজি নিরাপদ রাখতে চান। দেশের অর্থনীতির সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকায় তারাও সতর্ক থাকতে চান।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আসছে না সেভাবে। ব্যাংকের বোনাস শেয়ারে পুঁজিবাজারে দরপতন হয়েছিল। এত শেয়ার কেনার মতো লোক নেই। সবাই ধরেই নিচ্ছে সামনে বাজার পড়ে যেতে পারে। এজন্য সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও হাত গুটিয়ে বসে আছেন। বোনাস শেয়ার ঘোষণায় কোম্পানিভেদে বিএসইসির খোঁজ নেওয়া উচিত।’