ব্যক্তিজীবনে জহুরুল ইসলাম

ঢাকার পতিত নগর পরিসরে সহসা রাজধানী জেগে ওঠায় আবাসন ও নির্মাণ খাত হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। সেই বাতাবরণে জহুরুল ইসলামের সৃজনী পদক্ষেপ ছিল তুরুপের তাস। ক্ষুদ্র ঠিকাদারি দিয়ে শুরু। দেশের সীমানা মাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তিনি গড়েছেন আকাশচুম্বী অট্টালিকা, সড়ক-মহাসড়ক, কল-কারখানা; এমনকি দেশের আঙিনায় বুলন্দ করেছেন বিদেশি বড়-প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক ও শৌখিন গাড়ির সমৃদ্ধি। রাজধানী ঢাকার নির্মাণ, আবাসন ও বিস্তৃতির বিবর্তনিক ইতিহাসের ধারাক্রমে জহুরুল ইসলাম তাই এক অবিচ্ছেদ্য প্রাসঙ্গিকতা। পর্ব-৪৫

মিজানুর রহমান শেলী: ব্যক্তিগত জীবনে জহুরুল ইসলাম ছিলেন সাধারণ। ছিলেন মিতব্যয়ী। ধূমপানের মতো কোনো বাজে অভ্যাস তার ছিল না। সাধারণ পোশাক-আশাকে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এ-দেশ ও-দেশের সংস্কৃতির প্রতি তার ছিল অগাধ আত্মবিশ্বাস ও মমত্ববোধ। ধর্মের প্রতি ছিল অগাধ আনুগত্য। খাবার-দাবার ও পোশাক-আশাকে তিনি দেশি সংস্কৃতিকে বেছে নিতেন। বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়েও তার এই আপন সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ অটুট থেকেছে। সাধারণত পায়জামা ও শেরওয়ানি তিনি পরতেন। এই পোশাকে তিনি স্থান কালভেদে ইতস্তত, বিব্রত কিংবা অহমিকায় আচ্ছন্ন হতেন না। যেমন দেশের মাটিতে তেমনি বিদেশ-বিভুঁইয়ে, আবার ধনী কিংবা গরিব সব মহলেই তিনি এই পোশাকে নিজেকে সাজাতেন। খাবার দাবারেও কোনো বিলাসিতা তাকে ছুঁইতে পারেনি। সাধারণ খাবার তিনি খেতেন। ভাত আর মাছ ছিল তার দিবাভাগের আহার। চাপাতি খেতেন রাতে। প্রতি সকাল ছিল তার কাছে আরাধ্য, মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনিতে তার ঘুম ভাঙাত। মসজিদে গিয়ে আর দশজন সাধারণের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি ফজরের নামাজ আদায় করতেন। নামাজের পর তার হালকা ঘুমানোর অভ্যাস ছিল। ঘুম থেকে উঠে তার দিবসের চাঞ্চল্য শুরু হতো। কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। দিনের কাজ শেষ করতে তার রাত-দুপুর পেরিয়ে যেত। মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতেন। এই মানুষটি সমাজকে এড়িয়ে ব্যবসায় পরিধি নিয়ে কখনও ভাবেননি। পাশাপাশি ব্যবসায় কাঠামোর বাইরেও তিনি মানুষ ও সমাজসেবায় অংশ নিয়েছেন। নিজের ঘাম, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছেন।
জহুরুল ইসলাম ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মুক্ত মনের। সাহায্য-সহযোগিতা, কিংবা সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে মিলেমিশে থাকা ছিল তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তাই তিনি যেমন বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে ছিলেন প্রিয়, তেমনি আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও ছিলেন প্রশংসনীয় চরিত্রের অধিকারী। তিনি তার ব্যবসায় উদ্যোগে নিজেই যথেষ্ট থাকার পরেও সমগ্র ব্যবসায় কার্যক্রম থেকে ভাইদের পৃথক রাখেননি। নিজের ব্যবসাটিকে পারিবারিক ব্যবসায় রূপান্তর করেছেন। তার ব্যবসায় কার্যক্রমে যখন মোটামুটি সফলতা এসেছে, তখনই তিনি ১৩ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের সবাইকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকায় আসার পরে তিনি ভাইবোনদের পড়ালেখা এবং তাদের জীবন উন্নয়নে বাবার মতো অভিভাবকত্ব করেছেন। তাদের সবাইকে যোগ্যতা ও স্তর অনুসারে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। তারা উচ্চশিক্ষিত হয়েছে। কাছে কিংবা দূরের বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের প্রতিও তিনি তার সহযোগিতার হাতকে সংকুচিত করেননি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর সেবামূলক ব্যবসায় কাঠামো তিনি গড়ে তুলেছেন তার ব্যবসায় সাম্রাজ্যের প্রতি ক্ষণে। তিনি তার মিল-কারখানাকে নিজের এলাকায় স্থাপন করেছেন। এতে করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার গ্রামের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা সবাই উপকৃত হয়েছে। সরাসরি চাকরি নিয়েছেন, আবার অনেকে জহুরুল ইসলামের এসব ব্যবসায় কাঠামো কেন্দ্র করে আরও অনেক ধরনের ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছেন। তাছাড়া এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সফল উন্নয়নের প্রভাব সামগ্রিক সামাজিক দশাতেই পড়েছে। সবাই তা উপভোগ করছেন। কেবল বাজিতপুরের বিভিন্ন এলাকাতেই তিনি অর্ধশতাধিক ফার্ম গড়ে তুলেছেন। একটি গ্রামস্থানিক পরিপ্রেক্ষিতের উন্নয়নের জন্য কৃষিনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি আরও ব্যবসা-বাণিজ্যিক কর্মসংস্থানের প্রয়োজন হয়। ঠিক তেমনিভাবে বাজিতপুরের গ্রামাঞ্চলে জহুরুল ইসলাম ও তার পরবর্তী প্রজšে§র মিলকারখানা স্থানিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
তাছাড়া বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও সুযোগ-সুবিধার স্বল্পতা একটি অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করে। সে হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, উপাসনালয় বা বিনোদন, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও আধুনিকতার প্রয়োজন হয়। তার জীবনের শেষের দিকে তিনি মেডিক্যাল শিক্ষাকে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ। তারও আগে তিনি গ্রামের মানুষের স্বাস্থসেবা নিয়ে ভেবেছেন। তিনি একজন গ্রামের ছেলে হিসেবে, গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ভালো বুঝতেন। তাই গ্রামেই একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা করেন এবং ১৯৮৯ সালে জহুরুল ইসলাম হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটা বাজিতপুরের ভাগলপুরের তার পিত্রালয়ের পাশেই অবস্থিত। এলাকাবাসীর মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তিনি প্রথমত হাসপাতাল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। কিন্তু এ উদ্যোগেও তিনি সন্তুষ্ট হননি। আবার হাসপাতালের সফলতা তাকে আরও বেশি আশান্বিত করে তুলেছিল। বিশেষ করে হাসপাতালের সেবা গ্রামের মানুষকে যেভাবে উপকৃত করে তুলেছিল তাতে তিনি স্বাস্থ্যসেবায় আরও বেশি বড় অবদান রাখার আশা সঞ্চার করেন। এজন্য হাসপাতালের উন্নত যন্ত্রপাতি ও দক্ষ লোকবল তিনি নিশ্চিত করেন। উপযুক্ত পরিকাঠামো তিনি নির্মাণ করেন। এমনকি স্থানীয় মানুষের সক্ষমতা বিচারে তিনি হাসপাতালে সুলভ খরচের মধ্যে উন্নত সেবা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কার্যত স্থানিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ভেতর দিয়েই তিনি তার কাজ শেষ করলেন না। বরং সামগ্রিক দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নের বিষয়টি তিনি ভাবতে থাকেন। তাই তিনি হাসপাতালকে মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটে পরিণত করেণ। এ প্রতিষ্ঠানটি এখন বাংলাদেশের মেডিক্যাল শিক্ষায় নির্ভরযোগ্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। তবুও বলতে হয় মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালটির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য একে অনেক বেশি গুরুত্বাবহ করে তুলেছে। গ্রাম্য পরিবেশে উন্নত চিকিৎসা কিন্তু খরচ কম। মনোহারী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতা মেডিক্যাল শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য উপযোগী। এই মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং হোমের শিক্ষার্থীরা কেবল বাজিতপুরের উন্নয়নেই অবদান রাখছেন না। তারা সারা দেশ ও বিদেশে স্বাস্থ্যসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে এখানকার পাঠ-প্রশিক্ষণ শেষ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া স্কুল-কলেজও তিনি গড়ে তুলেছেন। ফলে ভাগলপুর গ্রামটি একটি উন্নত শিক্ষা নগরীতে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য আর শিক্ষার জন্য এ গ্রামে আজ সারা দেশ থেকে মানুষ ছুটে আসছে। তাদের আনাগোনায় মুখরিত হচ্ছে এখানকার পরিবেশ।
জহুরুল ইসলাম সব সময় আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে নিয়ে খেতে বসতেন। একা খেতেন না। অভাবগ্রস্ত বা সংকটাপন্নদের নিয়ে তিনি কখনও বিরক্ত হতেন না। সহযোগিতা করতে তিনি পছন্দ করতেন। আত্মীয়স্বজনের সবাইকেই তিনি একটি উন্নত পরিসরে দেখতে চাইতেন। ছোট ভাই শফিউল ইসলাম (কামাল), জহুরুল ইসলাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, জহুরুল ইসলাম শুধু আমার ভাই না আমার বাবা, আমার জীবন, আমার সব। তার মতো চরিত্রবান লোক আমার চোখে পড়ে না।
নতুনভাবে স্বাধীন হওয়া এই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রয়েছে তার অর্জন বা অবদান। তিনি মূলত পারিবারিকভাবে সমন্বিত ব্যবসানীতি পছন্দ করতেন। ব্যবসায় তার খুব ইতিবাচক ধারণা ছিল। তিনি অনেক কাঠিন্য অতিক্রম করেছেন। আবার ব্যবসায় জীবনে জয়ী হয়েছেন সফলতার সঙ্গে। ইতিবাচক ধ্যান আর সমন্বিত প্রচেষ্টায় তিনি সফল হন। তিনি তার অংশীদারীদের কখনও বঞ্চিত করেননি। এমনকি তিনি তার প্রতিযোগীদের সঙ্গেও খুব ইতিবাচক আচরণ করেছেন। তার এ উদ্যোক্তা জীবনের অর্জনের পাশাপাশি, সমাজকর্মে বা সেবায় ও শিক্ষায় তার ছিল গভীর আকর্ষণ।
উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি। পারিবারিকভাবেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষা পেয়েছিলেন। একজন শিল্পপতি হয়েও তিনি নিজেকে ভোগবিলাসে মাতিয়ে তোলেননি। ধর্মচার করেছেন। তিনি ছিলেন মুমিন মুসলমান। এক আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, নবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর দেখানো পথে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তার ধর্মের এই চর্চাটা ছিল তার ধর্মীয় জ্ঞানের সীমারেখা পর্যন্ত। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সচেতন। জহুরুল ইসলাম জামাতের সহিত নামাজ পড়তে খুব পছন্দ করতেন। সে কারণে তার প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেকটি স্থাপনা প্রকল্পে মসজিদ ও ইমামের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতেন। রোজার ব্যাপারে তিনি ছিলেন আরও বেশি সিরিয়াস। একবার ভুল করে একটি রোজা ভেঙে গেলে ইমাম সাহেবের শরণাপন্ন হন। ইমাম একটি রোজার বিপরীতে ৬০ জন মিসকিনকে খাইয়ে দিতে বলেন। জহুরুল ইসলাম ইমাম সাহেবকে বলেন, এতে তো আমার কোনো কষ্ট হবে না। বরং আমি ৬০টি রোজা রেখে ফেলি। এই বলে একাধারে ৬০টি রোজা রাখলেন। তিনি হজকে পুনর্জšে§র মতো করে দেখতেন। জাকাতের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সব সময় অগ্রগামী। পুত্র মঞ্জুরুল ইসলাম পিতা সম্পর্কে বলেন, আমি বাবার মাঝে বদ অভ্যাস, বদ স্বভাব কোনো দিন লক্ষ করিনি। তিনি নেশাজাতীয় দ্রব্য এমনকি পান, সিগারেট খেতেন না। তিনি অসম্ভব রকমের ধার্মিক ছিলেন। ১২ বছর বয়স থেকে নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন। জীবনে কোনো দিন নামাজ ছেড়ে দিতে দেখিনি। যত দিন শক্তি ছিল, সমর্থন ছিল তত দিন হজ পালন করেছেন। মাঝেমধ্যে দুর্বল শরীর নিয়েও বছরে দুই বা তিনবার ওমরাহ করেছেন। হজে বেশি ভিড় হতো বলে তিনি ওমরাহ করতেন। বাবা বলতেন, তার জন্য ওমরাহ হচ্ছে বাস্তবের ছুটির সময়। কারণ ওই একটি জায়গায় যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিবারকে ভুলে আল্লাহর ইবাদত করা যায়। প্রচুর ধন-সম্পদের মাঝেও তিনি তার নিজ জীবনকে দুনিয়া ও আখেরাতের মাঝে সামঞ্জস্য রেখেছেন। প্রচারবিমুখ জহুরুল ইসলাম প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা দান করতেন। তার দান-খয়রাতের অনেকাংশই ছিল নীরবে। প্রকাশ্যে তিনি অঢেল দান করেছেন। তা সবার চোখের সামনেই আজ স্পষ্ট রয়ে গেছে।

গবেষক, শেয়ার বিজ