করপোরেট টক

ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিএসসিসিএল

আর্থিকভাবে সফল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)। বিস্তারিত তুলে ধরেছেন শরিফুল ইসলাম পলাশ

বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্লের জগতে প্রবেশ করে ২০০৬ সালে। এর দু’বছর পর বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) নামে একটি পূর্ণাঙ্গ কোম্পানি গড়ে তোলা হয়। মূলত বাংলাদেশ থেকে বিশ্বব্যাপী আদর্শ মান ও উচ্চগতিসম্পন্ন আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সেবাদানে শীর্ষস্থানীয় সংস্থা হিসেবে এগিয়ে থাকার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পথচলা শুরু হয়। এরপর থেকে সুনামের সঙ্গে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবা দিচ্ছে বিএসসিসিএল। পথচলার ১১ বছরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দেশের অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত সেবাদানকারী কোম্পানির মধ্যে ব্যতিক্রমী, লাভজনক ও সম্ভাবনাময় কোম্পানি হয়ে উঠেছে বিএসসিসিএল।
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিস্তৃত টেলিযোগাযোগ সেবাদান, সব ধরনের আন্তর্জাতিক ভয়েস ও ডেটা সংযোগের জন্য সাবমেরিন কেব্ল ও অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যান্ডউইড্থ সরবরাহ করা বিএসসিসিএলের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী তথ্য মহাসড়কে বাংলাদেশকে সংযুক্ত করা, জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ
প্রযুক্তি ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে গুণগত ব্যান্ডউইড্থ সরবরাহ করাও এর লক্ষ্য। একই সঙ্গে সরকারের নীতিমালা, প্রবিধান ও নিয়ন্ত্রণনীতির আলোকে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার সব সুফল পেতে বাংলাদেশের জনগণকে সার্বিক সহায়তা করাই বিএসসিসিএলের মূল লক্ষ্য।
বিএসসিসিএল একটি মূল টেলিযোগাযোগ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। এটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের সাবমেরিন কেব্লের অপারেটর। একইসঙ্গে বিএসসিসিএল ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠান। বিএসসিসিএলের সেবার মাধ্যমে বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরপাল্লার যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।
২০০৮ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ল্যান্ডিং স্টেশনসহ সাবমেরিন কেব্ল অধুনালুপ্ত বিটিটিবি থেকে আলাদা করে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়। বর্তমানে এটি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একটি প্রতিষ্ঠান।
২০০৮ সালের ২৪ জুন বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে (আরজেএসসিএফ) নিবন্ধিত হয়। ৩০ জুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভেন্ডর চুক্তির পর ১ জুলাই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে বিএসসিসিএল। পথচলার মাত্র চার বছর পরই ২০১২ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি।
২০১৫ সালের জুনে ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিএসসিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ভারতের বিএসএনএলের চেয়ারম্যান
ত্রিপুরা প্রদেশের জন্য ১০ জিবিপিএস আইপি ব্যান্ডউইড্থ রফতানি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর অংশ হিসেবে বিএসসিসিএল ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ জিবিপিএস আইপি ব্যান্ডউইড্থ ত্রিপুরায় রফতানি করছে।
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি ২০১৪ সালে এসএমডব্লিউ-৫ কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে বিএসসিসিএলের ভাণ্ডারে আরও এক হাজার ৩০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইড্থ যোগ হয়েছে। সময়ের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে মাথায় রেখে এখন তৃতীয় সারমেরিন কেব্ল নিয়ে কাজ শুরু করেছে বিএসসিসিএল।
আর্থিকভাবে সফল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে বিএসসিসিএল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের সব শর্ত পূরণ করে টেলিযোগাযোগ সেক্টরে সরকারের প্রথম কোম্পানি হিসেবে বিএসসিসিএল সাফল্যের সঙ্গে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনের ক্ষেত্রে বিএসসিসিএলের শেয়ার প্রথম দিকের শেয়ারগুলোর মধ্যে রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ‘এএএ’ রেটিং অর্জনকারী কোম্পানি। কয়েক বছর ধরে ওই রেটিং পাচ্ছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কারণে বিএসসিসিএল বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানি হিসেবে দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) দেওয়া বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। সে সঙ্গে করপোরেট সুশাসনের জন্য ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৭ সালে দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) বিএসসিসিএলকে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে।

বিএসসিসিএলের সময়োপযোগী সেবা আইপিএলসি
বিএসসিসিএল ব্যান্ডউইড্থ সেবাদান ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। কক্সবাজারের ঝিলংজায় বিএসসিসিএলের সাবমেরিন কেব্ল ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে। এখানে ‘ব্যাকহোল’ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সংযুক্ত হয়েছে। গ্রাহকরা আইপিএলসি (আন্তর্জাতিক বেসরকারি লিজ সার্কিট) সেবার জন্য ‘ব্যাকহোল’ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সহ-অবস্থান কেন্দ্র থেকে তাদের ফাইবার অপটিক কেব্লের মাধ্যমে সংযুক্ত হতে পারেন। এছাড়া ‘ব্যাকহোল’ সংযোগের জন্য একাধিক বিকল্প হিসেবে কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশনে একটি
সহ-অবস্থান কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিএসসিসিএলের গ্রাহকরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ‘ব্যাকহোল’ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে পারেন। আর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমতি নিয়ে যে কোনো করপোরেট গ্রাহককে ডেডিকেটেড আইপিএলসি সেবাও দিচ্ছে বিএসসিসিএল।

আইপি ট্রানজিট
২০১৩ সালের ৮ জুলাই থেকে আইপি ট্রানজিট সংযোগ সেবা দিচ্ছে বিএসসিসিএল। বাংলাদেশ সরকারের ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণের নীতি সমুন্নত ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার গতিকে সহজতর করা এবং গুণগত মানসম্পন্ন ব্যান্ডউইড্থের ব্যবহারে উৎসাহ দিতে বিএসসিসিএল তার আইপি ব্যান্ডউইড্থ গ্রাহকদের সর্বোত্তম মূল্য প্রস্তাব করছে।
বিএসসিসিএল আইপি ট্রানজিট সার্ভিস বিশ্বব্যাপী টায়ার-১ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এনটিটি কমিউনিকেশনস ও টেলিকম ইতালিয়া স্পার্ক্লের সঙ্গে সিঙ্গাপুরে এবং কোজেন্ট ও টেলিকম ইতালিয়া স্পার্ক্লের সঙ্গে ফ্রান্সের মার্সেই শহরে যুক্ত রয়েছে। বিএসসিসিএলের অটোনোমাস সিস্টেম এএস-১৩২৬০২-এর সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ২০০টি (অটোনোমাস সিস্টেম) নেটওয়ার্ক ও ১০০ জিবিপিএস ইন্টার কানেক্টটিভিটির সংযোগ রয়েছে।

কো-লোকেশন সেবা
সময়ের সঙ্গে এগিয়ে থাকতে বিএসসিসিএল একটি অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার গড়ে তুলেছে। ঢাকা, কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় গড়ে তোলা ওই ডেটা সেন্টার থেকে যে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে ওয়েব সার্ভার বা হার্ডওয়্যার হিসেবে স্পেস ভাড়া নিতে পারে। আইপিএলসি ও আইপি ট্রানজিট সেবার পাশাপাশি কো-লোকেশন সেবা হিসেবে ওই বিশ্বমানের ডেটা সেন্টার ভাড়া দিয়ে আয়ের নতুন খাত তৈরি করছে বিএসসিসিএল।

গ্রাহকের তিন প্রশ্ন ও উত্তর


বিএসসিসিএল কোন ধরনের সেবাদান করে?
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) মূল কাজই হচ্ছে চাহিদা মোতাবেক টেলিকমসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট ব্যবহারকারীদের ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিজ সার্কিট (আইপিএলসি) এবং আইআইজি ও আইএসপি গ্রাহকদের জন্য আইপি ট্রানজিট ব্যান্ডউইড্থ সরবরাহ করা। কোনো বৈষম্য ছাড়াই ‘আগে এলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যান্ডউইড্থ সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিএসসিসিএলের কাছ থেকে ব্যান্ডউইড্থ কিনে প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিএসসিসিএলের গ্রাহক কারা?
বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ব্যান্ডউইড্থ ব্যবহারকারী টেলিকম সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই বিএসসিসিএলের বড় গ্রাহক। এসব দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিএসসিসিএল চাহিদা অনুযায়ী ব্যান্ডউইড্থ বিক্রি করে। এর মধ্যে বিটিসিএল, লেভেল-৩ ক্যারিয়ার লিমিটেড, সামিট কমিউনিকেশন্স লিমিটেড, ম্যাক্সনেট লিমিটেড, বিডি হাব লিমিটেড, বাংলা ট্র্যাক লিমিটেড, নভোটেল লিমিটেড, মীর টেলিকম লিমিটেড ও ম্যাংগো টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। এছাড়া খ্যাতনামা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাও বিএসসিসিএলের সেবা নিচ্ছে।

টেলি-মেডিসিন, দূরশিক্ষণ ও ভিডিও কনফারেন্সের জন্য বিএসসিসিএল কীভাবে সেবা দিচ্ছে?
টেলি-মেডিসিন, ভিডিও অন ডিমান্ড ও দূরশিক্ষণের মতো সেবার ক্ষেত্রে উচ্চগতিসম্পন্ন ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন। সন্তোষজনক রেজুলেশন ও পরিষ্কার শব্দসহ একটি ভিডিও অনলাইনে উপভোগ করার জন্য কমপক্ষে পাঁচ এমবিপিএস উচ্চমানসম্পন্ন নিরবচ্ছিন্ন ব্যান্ডউইড্থ দরকার। বিএসসিসিএল বাংলাদেশ ও ত্রিপুরাবাসীকে এ সেবা নিশ্চিত করছে। এ কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরাও এখন টেলি-মেডিসিন, দূরশিক্ষণ ও ভিডিও কনফারেন্সের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট পাচ্ছে।

 

 

সর্বশেষ..