ব্যবসাবান্ধব অনেক হয়েছে, এবার চাই ভোক্তাবান্ধব বাজেট

ড. আর এম দেবনাথ: অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যদি দেখা করতে পারতাম, তাহলে তাকে একটা অনুরোধ করতাম। বলতাম, সবকিছুই তো করেছেন; এবার ‘ভোক্তাবান্ধব’ একটা বাজেট করুন। সারাদিন শুনি খালি ব্যবসাবান্ধব বাজেটের কথা। আর শুনি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ইত্যাদির কথা। ব্যবসায়ীরা এমনিতেই এসব বলেন। আর বাজেটের সময় এলে তারা বলেন আরও চড়া সুরে।
এই তো সেদিন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) বক্তব্য দেখলাম খবরের কাগজে। তারা হিসাব করে দেখিয়ে দিচ্ছেন, কীভাবে ব্যবসাবান্ধব বাজেট ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এনে দেবে। শুধু ব্যবসায়ীরা নন সরকারের মন্ত্রী, আমলারাও একই কথা বলেন। এখন বাজেটের মৌসুম। জুন মাসের সাত তারিখে সংসদে বাজেট উত্থাপিত হবে। অর্থমন্ত্রী বলছেন, এটি হবে তার শ্রেষ্ঠতম বাজেট। বলছেন, করপোরেট কর হার কমাবেন। ব্যক্তিগত আয়করের কী হবে, এ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য নেই। খবরের কাগজে আছে নানা ‘স্পেকুলেশন’ বা জল্পনা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার কত হবে, বাজেটের আকার কত হবে, কোন কোন খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে থাকছে এর ওপর নানা ভবিষ্যদ্বাণী। পাচ্ছি না কেবল একটি কথা কেউ বলছেন না, ভোক্তাবান্ধব বাজেট চাই।
ভোক্তাবান্ধব মানে দেশের জনগণের প্রতি বন্ধুপ্রতিম বাজেট। এর অর্থ কী? এর অর্থ সহজ একটা কথা। এমন একটা বাজেট চাই, যাতে করের বোঝা বাড়বে না; যা বাড়বেÑতার বোঝা বহন করবে ধনীরা, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। শত হোক, এটাই করের নীতি। এ কথাই শুনে আসছি ছাত্রাবস্থা থেকে। কর মানে যার যত বেশি আয়, তার কর তত বেশি। যার কম, তার কর কম। অথচ দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি, অর্থমন্ত্রীর বাজেট তৈরি হচ্ছে ভ্যাটকে সম্প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে। ‘ভ্যাট’ একটা পরোক্ষ কর। এই কর দেশের শ্রেষ্ঠ ধনী যে হারে দেয়, অফিসের একজন কেরানিও সেই হারে দেয়। আয়করের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধনীরা আয়কর দেয় না, দিলেও কম। এর বোঝা সব পড়ে কতিপয় চাকরিজীবীর ওপর। পেশাজীবীরা কর দেন খুব কম। দোকানদার শ্রেণির লোক কোনো করই দেয় না। অর্থাৎ যারা কর দেওয়ার কথা, তারা দেয় না। যারা পারে না, তারা দেয়।
অগ্রিম আয়কর যা উৎসে কেটে নেওয়া হয়, তাতেও দেখা যায় সমানভাবে, সমান হারে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে কেটে নেওয়া হয়। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। ‘বন্ডেড ওয়্যার হাউজ’ একটা সুবিধা আমদানিকারকদের জন্য, বিশেষ করে গার্মেন্ট রফতানিকারকদের জন্য। সেখানে কর ফাঁকি বছরে কমপক্ষে ৬০ হাজার কোটি টাকা। এটা আমার কথা নয়Ñজাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কথা। এই ফাঁকি কারা দেয়? ধনী ও বড় বড় পোশাক রফতানিকারকরা। অর্থমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টরা এসব অবিচার অবলীলাক্রমে করে বা এড়িয়ে যাচ্ছেন, যার বোঝা বহন করছে দেশের ১৬-১৭ কোটি লোক; যার অধিকাংশই গরিব। এই কি শেষ? না, এটা শেষ নয়।
একটা খবর দিচ্ছি পাঠকদের। খবরের কাগজে দেখলাম, আমাদের আমদানিকৃত পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ যে পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ১০০ টাকা, সেই পণ্যের দাম আমাদের বাজারে ১৭০ টাকা। এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে ট্যারিফ ভ্যালু। ট্যারিফ ভ্যালু হচ্ছে এমন একটা মূল্য, যা প্রতিটি আমদানিকৃত পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট। এটি নির্দিষ্ট করে সরকার। যে যেই মূল্যেই আমদানি করুক না কেনÑরাজস্ব বিভাগ কর বসাবে ট্যারিফ ভ্যালু দেখে। এটা করা হয় দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা (প্রটেকশন) দেওয়ার উদ্দেশ্যে। দেখা যাচ্ছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই ট্যারিফ ছিল ৭০ শতাংশ, যা ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশ থেকে অনেক বেশি। এর ফলে এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের ভোক্তারা পালাক্রমে মোট ১৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। টাকার অঙ্কে কত হয়? এক ডলার মাত্র ৮০ টাকা ধরে নিলেও ওই সালে সারা দেশের মানুষ এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি মূল্য দিয়েছে। তার মানে, সঠিক মূল্যে আমদানি করলে এই পণ্যের দাম এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা কম পড়ত। তার আরও মানে আছে। তার মানে, সারা দেশের লোক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যবসায়ীদের ভর্তুকি দিয়েছে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। কী কারণে এই উচ্চমূল্য বা উল্টো ভর্তুকি আমরা দিলাম? দিলাম শিল্পপতিরা যাতে টিকে থাকতে পারে। সরকার যদি ভোক্তাবান্ধব নীতি অনুসরণ করত, তাহলে এভাবে মানুষের কাছ থেকে উচ্চমূল্যের মাধ্যমে এক ধরনের কর আদায় করে নিত না।
ঠিক আছে, ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে হবে, শিল্পপতিদের টিকিয়ে রাখতে হবে, তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। বুঝলাম, এসব তো প্রতিবছরই বলা হচ্ছে। ‘সুরক্ষা’র বোঝা সাধারণ মানুষ, সাধারণ ভোক্তারা কেন বছরের পর বছর বহন করবেÑএ প্রশ্নটি প্রথমেই তোলা যায়। সুরক্ষা কত দিন দেওয়া হবে; নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, নাকি বিরতিহীন সময়ের জন্য। দ্বিতীয় প্রশ্ন, কোন কোন শ্রেণির ব্যবসা-শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া হবে? কেন দেওয়া হবে, তার যুক্তি কীÑএসবও বিবেচনায় আসবে নিশ্চয়ই। সবচেয়ে বড় কথা, এসব সুরক্ষা দেওয়ার কারণে দেশ যে অদক্ষ শিল্প ও ব্যবসায় ভরে যাচ্ছে; তার কী হবে? আরও প্রশ্ন, সে প্রশ্ন সামাজিক ও নৈতিক। দেখা যাচ্ছে, অনেক ব্যবসায়ী সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা নিয়ে অর্থাৎ দেশবাসীকে আমদানিকৃত পণ্যের উচ্চমূল্য দিতে বাধ্য করে যে লাভ করছেন, তা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আবার তৈরি হচ্ছে পাহাড়সম বৈষম্য। শিল্পপতিদের অনেকেই এমন জীবন যাপন করেন, যা কোনোভাবেই অভিপ্রেত নয়। একজন সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিচ্ছেন, সাধারণ মানুষের কাছে আমদানি বিকল্প পণ্য বিক্রি করছেন খুবই বেশি দামে, কম মূল্যে ব্যাংকঋণ নিচ্ছেন, আয়কর সুবিধা নিচ্ছেন, আরও অনেক সুবিধা নিচ্ছেন। অথচ সেই ব্যবসায়ী-শিল্পপতি কোনো সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ করছেন না। যখন-তখন লোকের চাকরি খাচ্ছেন। মানুষকে ন্যায্য পারিশ্রমিকে চাকরি না দিয়ে আউটসোর্সিং করছেন ‘দাসমূল্যে’। এসব কি উচিত?
বাদ দিলাম এসব প্রশ্ন। এখন তো বাজার অর্থনীতির দেশ। দক্ষতা, প্রতিযোগিতা, শ্রম ও মেধা দিয়ে অর্থনীতিতে টিকে থাকার কথা সবারই। যদি তা-ই হয়, তাহলে শিল্পপতিরা বছরের পর বছর এই ট্যারিফ সুবিধা কেন নেবেন? কথা উঠেছে, এ সুবিধার অপব্যবহার হচ্ছে। অথচ দেশীয় শিল্পের অনেকগুলোই দাঁড়াতে পারছে না। একটি খবরের কাগজে দেখলাম, অর্থমন্ত্রীও নাকি দারুন অসন্তুষ্ট। এই ব্যবস্থায় নাকি শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। তাহলে এই অন্যায্য ব্যবস্থা টিকে থাকছে কীভাবে? আর এর ফলে বছরের পর বছর সাধারণ মানুষ আমদানি বিকল্প পণ্য কিনছে বেশি দামে, অনেক বেশি দামে। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রেও তা-ই। খবরের কাগজে দেখলাম, স্টিলের দাম নিয়ে কথা উঠেছে। এখানেও ব্যবসায়ীদের ট্যারিফের মাধ্যমে অন্যান্য সুবিধা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিদ্যুৎ মালিকেরা নানা অন্যায্য সুবিধা পেয়ে গ্রাহকদের ঠকাচ্ছে। ব্যাংক ঠকাচ্ছে গ্রাহকদের। একটি হিসাব খুললে ব্যাংক যে কতভাবে টাকা কেটে নেয়, তার হিসাব কেউ রাখে না। একটা সার্ভিস নিতে গেলে ব্যাংক কতভাবে চার্জ করে, তাও জানা যায় না। সেলফোন কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ। নানা সার্ভিসের কথা বলে তারা গ্রাহকদের সমানে ঠকিয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় যদি দাবি করা হয় ‘ভোক্তাবান্ধব’ বাজেট চাই, তাহলে আপত্তি কোথায়? আশা করব সরকার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট লেখা শেষ করার আগে সাধারণ মানুষের কথাগুলো শুনবে। উন্নয়নের কথা আমরা জানি, প্রবৃদ্ধির কথাও জানি, আমাদের অগ্রগতির কথাও জানি। এখন শুধু চাই একটু স্বস্তি। স্বস্তি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থেকে, স্বস্তি মজুরি বৃদ্ধির খবর থেকে। ব্যবসায়ীদের বাঁচান, শিল্পও বাঁচান; কিন্তু তা সাধারণ ভোক্তার স্বার্থের বিনিময়ে নয়। যে পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ১০০ টাকা দাম, তা আমরা ১৭০ টাকায় কেন কিনব? এর যুক্তি কী? এই অন্যায্য ব্যবস্থায় শিল্প গড়ে তুলতে হবে, এর যৌক্তিকতা কোথায়?

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক