ব্যবসায়িক বিবেচনার বাইরে নতুন শাখার অনুমোদন নয়

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সালে তাদের লোকসানি শাখা ছিল ১৫৯টি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫৭টিতে। অর্থাৎ গত সাত বছরে এসব ব্যাংকে লোকসানি শাখা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের অভিমত রাজনৈতিক বিবেচনায় যত্রতত্র শাখা খোলার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতি। এছাড়া রয়েছে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণ। বাস্তবতা হলো, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নামে যত্রতত্র শাখা খোলার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে ক’বছর ধরে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করে না। এও মনে রাখা দরকার, কোনো শাখা যদি লাভজনকভাবে টিকে থাকতে না পারে সর্বোপরি তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের জন্য। শাখা বাড়ালে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। নিয়ম অনুযায়ী, পরিচালন ব্যয় বাড়লে কমে যায় মুনাফা। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে কোনো ব্যাংকের নতুন শাখা অনুমোদন দেওয়ার আগে তার লোকসানি শাখা রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা। শাখা অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা গেলে লোকসানি শাখা কমাতে ব্যাংকগুলো কিছুটা হলেও উদ্যোগী হবে।

ব্যাংক একটি মুনাফামুখী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। তাই কোনো এলাকায় ব্যাংকের শাখা খোলার আগে উচিত হলো তার ব্যবসা সম্ভাব্যতা যাচাই করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও উচিত এমন অনুমোদন দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাংকের নতুন শাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না কিংবা অনুমোদন দেওয়া হলে শাখাটি লাভজনকভাবে পরিচালিত হতে পারবে কিনা, তা খতিয়ে দেখা। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের যেসব শাখা এখন লোকসানে, সেগুলোর অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে এ লক্ষ্যে কোনো জরিপ চালানো হয়েছিল কি না জানি না। তবে এ ব্যবস্থা চালু করা উচিত ব্যাংকগুলোর স্বার্থেই। এতে তারাও সম্ভাব্য কিছু ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে। শুধু প্রধান কার্যালয়ের আবেদনের ভিত্তিতে কোনো এলাকায় ব্যাংকের শাখা খোলার অনুমোদন দেওয়াই নয়Ñক্ষেত্রবিশেষে অনুমোদন না দেওয়াটাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব মনে করি।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে অনেক ক্ষেত্রে। এ কারণে গ্রাহকরা ব্যাপকভাবে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় ওইসব শাখা লোকসানে চলে গেছে কি না, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার কারণেও কোনো শাখা মুনাফা ধরে রাখতে কিংবা কাক্সিক্ষত মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয় অনেক সময়। এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর ব্যবস্থাপনাগত ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা। এরপরও যদি দৃশ্যমান উন্নতি না হয়, তাহলে পরিস্থিতি বিশ্লেষণপূর্বক নিতে হবে উপযুক্ত পদক্ষেপ। ঋণ জালিয়াতি, অব্যবস্থাপনাসহ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ সম্প্রতি বেশি করে শোনা যাচ্ছে, তার সূচনা অনেক ক্ষেত্রেই হয় রাজনৈতিক বিবেচনায় শাখা অনুমোদন থেকে। এতে এ কার্যক্রমে জড়িতরা ওই শাখা থেকে বিশেষ বিবেচনায় সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় থাকেন; পরিস্থিতির কারণে শাখার পক্ষেও সেটা উপেক্ষা করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। এজন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় যাতে কোনো ব্যাংকের নতুন শাখা অনুমোদন দেওয়া না হয়, সেটাই দেখতে চাইব আমরা।