ব্যবসায়ীরা পরিশুদ্ধ হলে পুলিশ চাঁদাবাজির সুযোগ পাবে না

ডিসিসিআই’র সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : রমজানে ইফতার পার্টির নামে বিভিন্ন সংগঠন, সমিতি ও গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল চাঁদাবাজি হয়। এছাড়া পণ্য পরিবহনের সময় পথে পথে চাঁদাবাজির শিকার হন ট্রাক মালিকরা। এসব চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে রমজানে পণ্যমূল্য কমানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ করে বলেছেন, ব্যবসায়ীরা পরিশুদ্ধ হলে পুলিশ চাঁদাবাজির সুযোগ পাবে না।

গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ‘রমজানের রাজনৈতিক অর্থনীতি: বাজার ব্যবস্থা, ভোক্তা অধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ শীর্ষক এ মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আবুল কাসেম খান। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। এতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান।

সভার প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সে বিষয়ে আমাদের সরকার সচেতন। তবে ভেজাল নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। ভেজাল তো সরকার করে না। ভেজাল দেন ব্যবসায়ীরা। আমি ব্যবসায়ীদের বলি, আপনারা পরিশুদ্ধ হন, তাহলে কোনো আইনশৃঙ্খলা লাগবে না। আমরা অপরাধী ধরতে পারি, কিন্তু তারপর আবার নানা সুপারিশ আসে।’

পরিবহনে চাঁদাবাজির বিষয় স্বীকার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গাড়ির লাইসেন্স ঠিক থাকলে, ফিটনেস ঠিক থাকলে পুলিশ চাঁদাবাজির সুযোগ পাবে না। আর ব্যবসায়ীরা সবাই নিজের স্বার্থ দেখেন। ২০ টনের ট্রাকে ৪০ টন বোঝাই করেন। তখন তাদের পুলিশ আটকায়।’

এছাড়া ব্যবসায়ী আরও অনেক বিষয় ঈদের আগে প্রশাসনকে দেখতে হবে। অনেক ব্যবসায়ী কারখানা বন্ধ করে চলে যান, শ্রমিকদের ঈদের আগে বেতন দেন না। তখন তাদের ধরে আনতে হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও একজন ব্যবসায়ী উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দুর্বলতার কারণে পুলিশ সুযোগ পায়। চাঁদাবাজির শিকার হলে তা জানানোর জন্য অনুরোধ করে বলেন, পুলিশও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘রমজান মাসে ভোক্তাদের মূল স্বার্থ হচ্ছে বিশুদ্ধ পণ্য ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকা সত্ত্বেও ডলারের দামের ওঠানামাসহ নানা কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। রাস্তাঘাটে যানজট, বন্দরগুলোয় জাহাজ ও পণ্যবাহী ট্রাকের জটের ফলে চাহিদা মাফিক পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাই এ সমস্যা সমাধানে বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে। ভেজাল ও নি¤œমানের পণ্য রোধকল্পে অনেকগুলো সংস্থা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। কিন্তু এর মধ্যে সমন্বয় হওয়া প্রয়োজন।

তিনি জানান, বাংলাদেশে সয়াবিন তেলের চেয়ে পামঅয়েল বেশি আমদানি করা হলেও বাজারে সয়াবিন তেল বেশি বিক্রি হয়। এটা অসম্ভব, কিন্তু তা হচ্ছে। অর্থাৎ পামঅয়েলকে সয়াবিনের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থা নিরসনে দুটি পণ্য আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামোর সংস্কারের প্রস্তাব করেন তিনি।

মূল নিবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় সাধনের পাশাপাশি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সার্বিক ও বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার আইন এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন তিনি। অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে ন্যায্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ সেল গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি।

এ অধ্যাপক আরও বলেন, ব্যবসায়ীরাই আজ আইন প্রণেতা। এ কারণে ভোক্তার অধিকার বিঘিœত হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে আরও স্পষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে। এ সময় তিনি ব্যবসায়ীদের নৈতিক চর্চা বাড়িয়ে মুনাফালোভী আচরণ পরিহার করার আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে চেম্বার সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গড়ে ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। বাজারে পণ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অপর্যাপ্ত ও সমন্বয়হীন বাজার মনিটরিং, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, দুর্বিষহ যানজট এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের কারণে এ মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি পাঁচ দশমিক ৮২ শতাংশ। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যে মূল্যস্ফীতি সাত দশমিক ১৩ শতাংশ। এ পরিস্থিতে আসন্ন রমজান মাসে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়লে মধ্যবিত্ত আয়-ব্যয়ে সমন্বয় করতে হিমশিম খাবে।

আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, ব্যাংকঋণের সুদহার বৃদ্ধিও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণ। বক্তারা ভোগ্যপণ্যে ট্যারিফ ও শুল্ক হ্রাস করার প্রস্তাব করে বলেন, যথাসময়ে আমদানি করা গেলে ভোক্তারা রমজানে সে সুবিধা পাবেন। কিন্তু আমদানিতে বিলম্ব হলে রমজানের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। আলোচনায় অন্যদের মধ্যে ডিসিসিআই পরিচালক মো. আলাউদ্দিন মালিক, এসএম জিল্লুর রহমান, প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি আলহাজ আবদুস সালাম, এমএস সেকিল চৌধুরী, প্রাক্তন সহসভাপতি মো. সিরাজ উদ্দিন মালিক, প্রাক্তন পরিচালক আলহাজ মো. শারফুদ্দিন, ডিসিসিআই’র আহ্বায়ক শামসুন নাহার, বাংলাদেশ জুট গুডস্ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনামুল হক পাটোয়ারী, বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব মো. আবুল হাসেম এবং বাংলাদেশ ডাল ও ছোলা বুট ব্যবসায়ী সমিতি শফিকুর রহমান প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।