ব্যবসায় নৈতিকতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড

তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল: ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ কী, তা জানার আগে জানতে হবে ইথিক্যাল ট্রেড অথবা ব্যবসায় নৈতিকতা কী। ব্যবসায় নৈতিকতা নিশ্চিত করার মূল লক্ষ্য হলো রিটেইলার, ব্র্যান্ড ও তাদের সাপ্লায়ার সবাই তারা যে পোশাক বা পণ্য বিক্রি করে, তা প্রস্তুত করতে যারা কাজ করছে তাদের জন্য উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। মূলত এসব শ্রমিক বিশ্বজুড়ে সব সাপ্লায়ার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। এ ধরনের শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে বিশেষ করে অনুন্নত অথবা উন্নয়নশীল দেশগুলোয়, যেখানে হয়

শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কোনো আইন প্রণয়ন হয়নি, কিংবা আইন থাকলেও তা কার্যকর নয়।

রিটেইলার ও ব্র্যান্ডগুলো তাদের সাপ্লায়ারদের সঠিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য সাধারণত লেবার প্র্যাকটিসের একটি আচরণবিধি (কোড অব কনডাক্ট) সরবরাহ করে থাকে। এই বিধিতে সাধারণত শ্রমিকের মজুরি, কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং সংগঠন গঠনের স্বাধীনতা (ফ্রিডম অব অ্যাসোসিয়েশন) প্রভৃতি বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইটিআই বা ইথিক্যাল ট্রেড ইনিশিয়েটিভ (ব্যবসায় নৈতিকতা প্রবর্তন) : ইথিক্যাল ট্রেড বা ব্যবসায় নৈতিকতা কথাটি শুনতে অনেক সুন্দর মনে হলেও আসলে এটি কার্যত প্রয়োগ করা অনেক কঠিন একটি বিষয়। আধুনিক সাপ্লাই চেইনের কথা চিন্তা করলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, বর্তমান যুগে এটি বিশাল, জটিল ও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। আর শ্রমসংক্রান্ত বিষয় বা সমস্যাগুলো আসলে অনেক জটিল ও স্পর্শকাতর! গুরুত্ব বোঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি প্রশ্ন করা যায়, যেমন ‘লিভিং ওয়েজ’ আসলে কী? একজন সাপ্লায়ার কী করবে, যদি তার প্রতিষ্ঠানে একজন শিশুশ্রমিক পাওয়া যায়? হয়তো অনেক ক্ষেত্রে শিশুশ্রমিক পেলে তাকে চাকরিচ্যুত করা কিংবা শিশুশ্রমিক নিয়োগ না দেওয়া কোনো একটি পরিবারিক জীবন কিংবা সামাজিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে!

ইটিআই হলো কোম্পানি, ট্রেড ইউনিয়ন ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর একটি নেতৃস্থানীয় জোট, যা বিশ্বজুড়ে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের সব শ্রমিক যেন শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত এবং নিরাপদ একটি কর্মপরিবেশ পায় এবং তাদের যেন কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়।

আর তাই ইটিআই বা ইথিক্যাল ট্রেড ইনিশিয়েটিভ (ব্যবসায় নৈতিকতা) করপোরেট, ট্রেড ইউনিয়ন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের একসঙ্গে কাজ করার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়, যার ফলে যেসব কণ্টকাকীর্ণ বা স্পর্শকাতর বিষয় কারও বা কোনো প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয় তা তারা একসঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সমাধান করে।

নিচে ইটিআই’র বেস কোডের ভাবার্থ ঠিক রেখে উপস্থাপন করা হলো

চাকরি স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়া: এর বিভিন্ন দিক হলো জোরপূর্বক, দ্বাসত্বজনিত বা কারাগারে ইচ্ছার বিরুদ্ধে শ্রম করতে দেওয়া হয় না। কর্মীদের কোনো ‘আমানত’ বা তাদের পরিচয়জ্ঞাপক কাগজ, যেমন পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) কিংবা সার্টিফিকেট প্রভৃতি নিয়োগকর্তাদের কাছে জমা রাখতে হয় না এবং সংগত নোটিশ দেওয়ার পরে তারা স্বেচ্ছায় তাদের কাজ ছেড়ে দিতে পারে।

সংগঠনে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতা ও সংঘবদ্ধ হয়ে দর কষাকষির অধিকারের সম্মান করা হয়: কোনো পার্থক্য ছাড়াই শ্রমিকদের তাদের নিজেদের পছন্দমতো ট্রেড ইউনিয়নে যোগ দেওয়া বা তা শুরু করার ও একজোট হয়ে দর কষাকষি করার অধিকার আছে। নিয়োগকর্তা শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর কাজকর্ম ও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্রিয়াকলাপগুলোর বিষয়ে উদার মনোভাব পোষণ করেন। কর্মীদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় না এবং কাজের জায়গায় তাদের প্রতিনিধিত্বমূলক কাজ করার জন্য সুযোগ থাকে। যেখানে কোনো সংগঠনে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতা ও একজোট হয়ে দর কষাকষির অধিকারের বিষয়টি আইন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত, নিয়োগকর্তা স্বাধীন ও মুক্ত সংগঠন ও দর কষাকষির কোনো সমান্তরাল উপায় তৈরির সুযোগ করে দেবেন এবং তাতে বাধার

সৃষ্টি করবেন না।

কাজের পরিস্থিতিগুলো নিরাপদ ও স্বাস্থ্যবিধিসম্মত: কোনো একটি শিল্পের বিষয়ে সেখানে বিদ্যমান পরিস্থিতি ও তার বিশেষ ঝুঁকিগুলোর কথা মনে রেখে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যবিধিসম্মত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। কাজের পরিবেশে অন্তর্নিহিত ঝুঁকিগুলোর কারণগুলো যথাসম্ভবভাবে কমিয়ে এনে কাজের সময়ে কোনো দুর্ঘটনা ও কোনো স্বাস্থ্যজনিত আঘাত এড়ানোর জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যা কাজের দরুন, বা তার সংশ্লিষ্ট বা তার কারণে হতে পারে। কর্মীরা নিয়মিত ও রেকর্ড করা স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রশিক্ষণ পাবেন এবং নতুন বা আবার কাজে যোগদানকারী কর্মীদের জন্য এই প্রশিক্ষণ পুনরায় করা হবে। পরিষ্কার শৌচাগার ব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ পানীয় জল ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া হবে এবং যথাযথ হলে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য স্বাস্থ্যবর্ধক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শ্রমিকদের যদি আবাসনের ব্যবস্থা করা হলে তা পরিষ্কার ও নিরাপদ হবে এবং কর্মীদের সাধারণ প্রয়োজন মেটাবে। যে কোম্পানিটি বিধিটি মেনে চলবে, তারা তাদের পরিচালনা পর্ষদের এক ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিকে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দায়িত্ব দেবে।

শিশুশ্রম ব্যবহার করা হবে না: কোনো নতুন শিশুশ্রমিক নিয়োগ করা হবে না। কর্মরত শিশুশ্রমিককে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত শিক্ষালাভ করা ও উচ্চ গুণমানের শিক্ষালাভ বজায় থাকে, এমন নীতি ও কর্মসূচিগুলো তৈরি করবে বা তাতে অংশগ্রহণ করবে এবং অবদান রাখবে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। শিশু ও ১৮ বছরের কম বয়সী অল্পবয়স্ক ব্যক্তিদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে রাতে কাজের ক্ষেত্রে নিয়োগ করা হবে না। এ নীতি ও পদ্ধতিগুলি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও প্রণীত মানদণ্ডগুলোর ধারাগুলো অনুযায়ী হবে।

বাস করার মতো মজুরি দেওয়া হবে: শ্রমিক বা কর্মীকে সাধারণ কাজের সপ্তাহে যা মজুরি এবং সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে, তা ন্যূনতম জাতীয় আইনি মানদণ্ড বা শিল্পটির স্থির করা মানদণ্ডগুলোর মধ্যে যেটি অধিকতর, অন্তত সেটির সমান হবে। যে কোনো অবস্থাতেই মূল প্রয়োজনগুলো মেটাতে এবং কিছু স্বেচ্ছায় খরচ করার ক্ষেত্রে মজুরি যেন যথেষ্ট হয়। কোম্পানিগুলো চাকরিতে নিয়োগ হওয়ার আগে সব কর্মীকে তাদের মজুরির বিষয়ে, চাকরির শর্তগুলোর বিষয়ে এবং প্রতিবার তাদের মজুরি মেটানোর সময় তাদের সেই অর্থ মেটানোর সময়কালের মজুরির বিষয়ে লিখিতভাবে ও অনুধাবনযোগ্য তথ্য দেবে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মজুরি থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার আইন নেই, জাতীয় আইন অনুযায়ী না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া মজুরি থেকে কোনো অর্থ কর্তন করা যাবে না। সব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রেকর্ড করতে হবে।

কাজ করার সময় (কর্মঘণ্টা) খুব বেশি হবে না: কাজ করার সময় বা কর্মঘণ্টা জাতীয় আইন, একজোট হয়ে করা চুক্তি এবং নিচে বর্ণিত উপধারাগুলোর মধ্যে যেটি কর্মচারীদের বেশি সুরক্ষা দেয়, সে অনুযায়ী হবে। উপধারাগুলো আন্তর্জাতিক শ্রমমানের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। এগুলো হলো অতিরিক্ত সময় (ওভারটাইম) বাদ দিয়ে কাজের সময় চুক্তি অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত হবে এবং সপ্তাহে সেটি ৪৮ ঘণ্টার বেশি হবে না। ওভারটাইম সব সময় স্বেচ্ছাধীন হবে। ওভারটাইম দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে এবং নি¤œলিখিত সবকটি বিষয় বিবেচনা করে করতে হবে, যেমনÑব্যক্তিবিশেষ কর্মী এবং সমগ্র কর্মীদলের কাজ করার পরিধি, তা কত ঘন ঘন করা হয় এবং কত ঘণ্টা কাজ করা হয়। এটি নিয়মিত চাকরির বদলে ব্যবহার করা চলবে না। ওভারটাইমের জন্য সাধারণের চেয়ে বেশি হারে মজুরি দিতে হবে, যা সাধারণ মজুরির হারের ১২৫ শতাংশের কম না হওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হলো। প্রতি সাত দিনের সময়কালে কাজ করা মোট ঘণ্টার পরিমাণ ৬০ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না। এর ব্যতিক্রম হবে যেখানে তা নিচের উপধারার আওতাভুক্ত হবে। কাজের ঘণ্টা সাত দিনের সময়কালে ৬০ ঘণ্টার বেশি হতে পারে যদি নি¤œলিখিত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়Ñ ক. এটি করতে জাতীয় আইন অনুমতি দেয়; খ. এটি করতে সমবেত চুক্তি অনুমতি দেয়, যা কর্মীদের কোনো ইউনিয়নের সঙ্গে দর কষাকষি করে স্থির করা হয়েছে, যারা কর্মীদের এক অর্থপূর্ণ সংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করেন; গ. কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে; এবং ঘ. নিয়োগকর্তা এটি প্রদর্শন করতে পারেন যে, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি প্রযোজ্য হবে, যেমনÑঅপ্রত্যাশিত বেশি উৎপাদন, দুর্ঘটনা বা আপৎকালীন সময়। কর্মীদের প্রত্যেক সাত দিনের সময়কালে অন্তত এক দিন ছুটি দিতে হবে, অথবা যেখানে জাতীয় আইন অনুমতি দেয়, প্রতি ১৪ দিন সময়কালে দুই দিন ছুটি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানগুলো সুপারিশ করে যে কাজের সাধারণ ঘণ্টা ক্রমাগত কমানো হয় সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা পর্যন্ত, কিন্তু লক্ষ রাখতে হবে যে, তাতে যেন কর্মীর মজুরি কমে না যায়।

কোনো বৈষম্য করা হয় না: নিয়োগ, মজুরি, প্রশিক্ষণের সুযোগ, পদোন্নতি, ছাঁটাই বা অবসরের বিষয়ে জাতি, জাত, জাতীয় পটভূমি, ধর্ম, বয়স, প্রতিবন্ধকতা, লিঙ্গ, বৈবাহিক পরিস্থিতি, যৌন প্রবণতা, ইউনিয়নের সদস্যপদ বা রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা হবে না।

নিয়মিত চাকরি প্রদান করা হয়: যত দূর সম্ভব যে কাজগুলো করতে দেওয়া হবে তা অবশ্যই যেন স্বীকৃত চাকরির সম্পর্ক অনুযায়ী হয় এবং তা জাতীয় আইন ও প্রচলনের মাধ্যমে স্থির করতে হবে। শুধু শ্রমের চুক্তি, সাব-কনট্রাক্ট করা, বাসায় থেকে কাজ করার ব্যবস্থা, বা শিক্ষানবিশি কর্মসূচির মাধ্যমে নিয়মিত চাকরির সম্পর্ক থেকে উদ্ভূত শ্রম বা সোশ্যাল সিকিউরিটি আইন বা নিয়মাবলি অনুযায়ী কর্মীদের প্রতি দায়-দায়িত্বের অবহেলা করা যাবে না, যেখানে মূলত দক্ষ শ্রমিক গড়া বা নিয়মিত চাকরি দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য নেই। এছাড়া স্থির সময়নির্ভর চাকরির চুক্তির অত্যধিক ব্যবহারের মাধ্যমেও এ ধরনের দায়-দায়িত্ব এড়ানো যাবে না।

কোনো কঠোর বা অমানবিক আচরণের অনুমতি নেই: শারীরিক নির্যাতন বা শাসন, শারীরিক নির্যাতনের ভয় দেখানো, যৌন বা অন্য হয়রানি এবং মৌখিক গালাগাল বা অন্য কোনোভাবে ভয় দেখানো নিষিদ্ধ।

এই আচরণবিধির ধারাগুলো ন্যূনতম মানদণ্ডগুলো নির্ণয় করে, উচ্চতম মানদণ্ডগুলো নয়, এবং এই কোডগুলোর ব্যবহার কোম্পানিগুলোকে অধিক সুবিধা প্রদানে বাধা সৃষ্টির জন্য নয়। যে কোম্পানিগুলো এই কোডটির প্রয়োগ করবে তারা জাতীয় ও অন্যান্য প্রযোজ্য আইন মেনে চলবে এ প্রত্যাশা এবং যেখানে এই আইনের বিধিগুলো এবং এ বেস কোড একই হয়, সেই বিধিটি ব্যবহার করবে যেটিতে আরও বেশি সুরক্ষা প্রদান করা যাবে।

উল্লেখ্য, মূলত বেস কোডটি ইটিআই কর্তৃক সরবরাহকৃত কপি থেকে অনূদিত। পাঠকসাধারণের বোধগম্য করার জন্য কিছু ক্ষেত্রে ভাষা একটু পরিবর্তন করা হয়েছে।

 

মানবসম্পদ প্রশিক্ষক

chanchal.songÑgmail.com