ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন ব্রোকারেজ হাউজ মালিকরা

পুঁজিবাজারে লেনদেনে খরা

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: সময়ের বিবর্তনে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার লেনদেন নেমে এসেছে হাজার কোটির নিচে। সম্প্রতি লেনদেন ঘুরপাক খাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে। কালেভদ্রে লেনদেন কিছুটা বাড়লেও তা স্থির থাকছে না। এদিকে আশঙ্কাজনকহারে লেনদেন কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন হাউজ মালিকেরা। লেনদেনের সঙ্গে তাদের ব্যবসার সম্পর্ক থাকার কারণে ব্রোকারেজ হাউজ চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। তাদের শঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্রোকারেজ হাউজের ব্যবসা হুমকির মুখে পড়বে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ডিএসইতে ইতিহাসের রেকর্ড লেনদেন হয়, যার পরিমাণ ছিল তিন হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। ওই সময়ে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর আয় ছিল চোখে পড়ার মতো। বড় কিছু হাউজ থেকে এ সময়ে প্রতিদিনই প্রায় ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত শেয়ার লেনদেন হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের ধসের পর থেকে বাজার পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকেÑকমতে থাকে লেনদেন, যার জের ধরে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর আয় কমতে থাকে। বাধ্য হয়ে হাউজ মালিকেরা কর্মী ছাঁটাই করতে থাকেন। অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে অন্য ব্যবসায় ঝুঁকে পড়েন। কেউ কেউ ব্রোকারেজ হাউজ বিক্রিও করে দেন। বর্তমানে কিছু বড় হাউজ ছাড়া অন্যদের লেনদেন এক কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে।
এদিকে ২০১০ সালের পর মিউচুয়াল ফান্ড এবং কোম্পানি মিলে প্রায় ১০০ প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু তারপর লেনদেনে নেই কোনো উন্নতি। এর জের ধরে কমে যাচ্ছে সূচক। গত মঙ্গলবার ডিএসইর প্রধান সূচকের অবস্থান ছিল পাঁচ হাজার ২০৪ পয়েন্টে, যা ছিল সূচকের গত ২২ মাসের সর্বনি¤œ অবস্থায়।
এ প্রসঙ্গে মিডওয়ে সিকিউরিটিজ হাউজের চেয়ারম্যান রকিবুর রহমান শেয়ার বিজেকে বলেন, ‘লেনদেন কমে যাওয়াতে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে আমাদের। কারণ আমাদের ইনকাম আগের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে। এর জের ধরে অনেকেই ব্যবসা ছোট করে ফেলেছেন। আবার প্রতিষ্ঠানের হাতবদলও হয়েছে। অনেক হাউজকর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে।’
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাজার ভালো হলে লেনদেন বাড়বে, আর লেনদেন বাড়লে আমাদের আয়ও বাড়বে। তাই সবার আগে মার্কেটের দিকে নজর রাখতে হবে। মার্কেটে নিয়ে আসতে হবে ভালো ভালো কোম্পানি। আর ভালো কোম্পানি এলে মার্কেট এমনিতেই ভালো হবে।’
বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, লেনদেন এবং বাজার মূলধন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ পুঁজিবাজারের নাজুক পরিস্থিতি। ছোট ছোট কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি হওয়ার কারণে এসব কোম্পানিতে ঝুঁকছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, যে কারণে ভালো মৌলভিত্তি এবং বেশি সংখ্যক শেয়ারধারী কোম্পানির শেয়ারের দর কমে যাচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাজার মূলধনে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিকে সামনে রেখে বাজারে অস্থির অবস্থা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার মামলার রায় এবং স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীন-ভারতকে নিয়ে টানাহেঁচড়ার কারণে বাজার নি¤œমুখী হয়। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বাজারে নি¤œমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, যে কারণে সূচকের পতন ঘটে ৯৮৫ পয়েন্ট। গত বছরের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক ছিল ছয় হাজার ২৪৪ পয়েন্ট, গতকাল যা স্থির হয়েছে পাঁচ হাজার ২৫৯ পয়েন্টে।
এ সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার-বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর অনেক কম। সে কারণে বাজার মূলধন কমে গেছে। এটিই প্রধান কারণ। তবে আরেকটি কারণ হতে পারেÑএই সময়ের মধ্যে বাজারে অর্থের পরিমাণ আসা কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজার মূলধন ও লেনদেনে। আর লেনদেন কমে গেলে হাউজ মালিকদের চিন্তিত হওয়ার কারণ রয়েছে। কারণ তাদের আয় আসে বিনিয়োগকারীদের লেনদেন থেকে।