ব্যবসা নয়, চিকিৎসাকে সেবায় পরিণত করতে হবে

শামিমা নাসরীন: ‘পরের বাড়ির পিঠা লাগে বড় মিঠা’ আসলেই কি তাই? আংশিক সত্য! আংশিক বলছি এ কারণেই, সবাই পরের বাড়ির পিঠা পছন্দ করে না। অনেকেই নিজের তৈরি জিনিসই বেশি পছন্দ করে। এটি ছাড়াও আরেকটি ব্যাপার রয়েছে। যদি পিঠাটা টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়, তাহলে অনেকের কাছেই আর মিঠা থাকে না। সামর্থ্যবানদের হয়তো ঠিকই মিঠা লাগে কিন্তু অসামর্থ্যবানদের বড়ই তিতা লাগে। কিন্তু নিজের রান্না করার সরঞ্জাম যদি না থাকে, যতই তিতা লাগুক টাকা দিয়েই কিনে খেতে হয়। ঠিক একই অবস্থা আমাদের দেশের চিকিৎসা খাতের। ভারত, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে দৌড়াচ্ছে আমাদের দেশের রোগীরা। ধনবানদের তো কথাই নেই, সামান্য ফুসকুড়ি দেখা দিলেও বিদেশে দৌড়। হয়তো সবাই সমান সামর্থ্যবান নয়, তবুও কষ্ট করে হলেও অনেককে যেতে হয়। এত অর্থ খরচ করে বিদেশে চিকিৎসার জন্য আগ্রহী কেন? কেন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এত বিরক্ত বা আগ্রহ নেই? শুধু চিকিৎসা খাতেই কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে। শুধু ভারতেই গত অর্থবছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। অথচ যে টাকা চিকিৎসার জন্য বিদেশে দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়েই কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল করা যায় দেশে।
বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া প্রসঙ্গে অধিকাংশ রোগীর কাছ থেকে কয়েকটি সাধারণ বিষয় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হলো, দেশের ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসকদের দুর্ব্যবহার ও দালালদের দৌরাত্ম্য। এত ভুল চিকিৎসার ঘটনা রয়েছে যে, এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন দেশের নাগরিকরা। কয়েক মাস আগে চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় তিন বছর বয়সী শিশু রাইফার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করলে চট্টগ্রামের চিকিৎসকরা জোট বেঁধে আন্দোলনে নামেন এবং ঘোষণা দেন তারা আর সাংবাদিকদের চিকিৎসা করবেন না। ভুল চিকিৎসা দিয়ে একটি শিশুকে হত্যার পর বিচার দাবি করায় এমন নোংরা ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন বিশ্বের আর কোন কোন দেশে হতে পারে? শুধু কি তাই? মাত্র কয়েকদিন আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে কিডনির চিকিৎসা করার জন্য চলচ্চিত্র পরিচালক রফিক শিকদার তার মা রওশন আরাকে ভর্তি করেন। তার বাম কিডনি অস্ত্রোপচার করে অপসারণ করার কথা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর বেসরকারি হাসপাতাল ল্যাবএইডে সিটি স্ক্যান করার পর দেখা যায় ডান কিডনিও নেই। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন, তবে পরিচালক রফিক শিকদার বলেছেন, ওই তদন্তে কোনো বিশ্বাস নেই তার। বিশ্বাস তো আর একদিনেই উঠে যায়নি। এমন ঘটনার শিকার হাজার হাজার রফিক শিকদার। বাংলাদেশে একটি পরীক্ষা একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। একই পরীক্ষা একেক জায়গা একেক রকম ফল আসে। আর দালালদের খপ্পরে পড়লে তো কথাই নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বড় ভাই এহসান হাবিবের স্ট্যাটাস পড়ে বুঝলাম তিনি খুবই রাগান্বিত। ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কী ব্যাপার। হাবিব ভাই জানালেন, দুই বছর বয়সী কন্যা কাব্যকে চিকিৎসকের কাছে নিলে চিকিৎসক কয়েকটি পরীক্ষা করতে বলেন। সেই ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী পরীক্ষার পর প্রতিবেদন দেখে চিকিৎসক জানান, কাব্যর থ্যালাসেমিয়া হয়েছে। এমন খবর শুনে একজন বাবার মানসিক অবস্থা যেমন হওয়ার তেমনই হয়েছে। পারিবারিক চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, নির্ঘাত এটি ভুল। এরপর সামরিক হাসপাতালে একই বিষয়ে পরীক্ষা করার পর দেখা যায় কাব্য থ্যালাসেমিয়ার রোগী নয়, আগের প্রতিবেদন ভুল। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে দেখানো হয় শিশুটিকে। সেখানে বলা হয় কাব্যর থ্যালাসেমিয়া হয়নি। সে ই-ডিজিজ বহন করছে।
আমি বেশ কিছু বর্ণমালা, শব্দ ও বাক্যের মাধ্যমে খুবই দ্রুত ঘটনাটি সংক্ষেপে লিখে ফেললাম। ঘটনাটি বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে লিখলেও হয়তো কয়েক পাতার বেশি হতো না। কিন্তু এ ঘটনার শিকার কাব্যর বাবা, মা ও স্বজনদের প্রায় মাস খানিক ধরে কেমন গেছে সেটি হয়তো আমি লিখে বোঝাতে কিংবা নিজেও অনুভব করতে পারব না। এটি শুধু তারা এবং এরকম ঘটনার ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারবেন। যে মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছেন তারা তার ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে, কে দেবে? শুধু এতেই থেমে থাকা যায় না; যে চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসা, যে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ভুল পরীক্ষার প্রতিবেদন দিল তাদের কী হবে। এক বাক্যে বলা যায়, কিছুই হবে না। কারণ বাংলাদেশে চিকিৎসকদের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেলেও কিছুই হয় না। বরং চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ করলেও, উল্টো তারাই ধর্মঘট করে, রোগীর স্বজনদের মারধর করে, চিকিৎসা বন্ধ করে হাসপাতালের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এটি বাংলাদেশে খুবই পরিচিত ঘটনা।
অপরদিকে ভারতের চিকিৎসকরা ঠিক উল্টো। তাদের অমায়িক ব্যবহার, চিকিৎসায় আস্থা ও বিশ্বাস ভারতে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ। দালালদের দৌরাত্ম্যও তেমন নেই। ফেসবুকে একটি ঘটনা দেখলাম, ক্যান্সারে আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন শফিক নামে এক ব্যক্তি। সেখানকার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ জয়দীপ চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসার একপর্যায়ে অর্থ সংকটে পড়লে জয়দীপ চক্রবর্তী নিজে ও তার বন্ধুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ৯০ হাজার রুপি দেন শফিককে। শুধু চিকিৎসকের ব্যবহার ভালো বা চিকিৎসার মান ভালো তাই নয়, কতটা মানবিক সেটিও বোঝা যায় এ ঘটনার মাধ্যমে। রোগীর সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্টদের দুর্ব্যবহার, নিয়মের চেয়ে দ্বিগুণ ফি, সময় নিয়ে রোগী না দেখা, এক্স-রের বিভিন্ন প্রতিবেদন ভুল, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরীক্ষাসহ নানা কারণে আমাদের দেশের চিকিৎসার প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। এতে দেশের মানুষ ভালো চিকিৎসা পাচ্ছেন, সুস্থ হচ্ছেন কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে ভারত।
দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে যাচ্ছে ভারতসহ অন্যান্য দেশগুলোয়। বিদেশি রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে ভারত যা আয় করে, তার বেশিরভাগই বাংলাদেশ থেকে যাওয়া রোগীদের কাছ থেকে পাওয়া। সেখানকার সরকারি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিদেশিদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে ৬২ কোটি তিন লাখ ১৫ হাজার ডলার আয় করেছে ভারত, যার অর্ধেকের বেশি দিয়েছে বাংলাদেশি রোগীরা। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছরে দেশটি বাংলাদেশি রোগীদের কাছ থেকে ৩৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করেছে। ওই সময়ে ভারতের হাসপাতালগুলোয় চার লাখ ৬০ হাজার বিদেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, যার মধ্যে এক লাখ ৬৫ হাজার বাংলাদেশি। এছাড়া ২০১৫ সালে যেখানে এক লাখ ২০ হাজার ৩৮৮ জন বাংলাদেশি চিকিৎসা নিতে ভারতে এসেছিলেন; সেখানে ২০১৭ সালে সেই সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছে দুই লাখ ২১ হাজার ৭৫১ জন। অর্থাৎ গত তিন বছরে মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে আসা বাংলাদেশি পর্যটকদের সংখ্যাটা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এক অর্থবছরে ৩৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা শুধু চিকিৎসার জন্য ভারতকে দেওয়া হচ্ছে। এ টাকা দিয়ে কি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল দেশে করা সম্ভব নয়? শুধু একটি নয়, কয়েকটি করা সম্ভব। ১৯৪৪ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় কুমুদিনী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন রণদা প্রসাদ সাহা। সেই সময় তিনি বিদেশি ভালো ভালো চিকিৎসক দিয়ে হাসপাতাল চালিয়েছেন। যদিও বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে, যেখানে বিদেশি চিকিৎসকও আছেন। কিন্তু সেসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মরা রোগী আটকে রেখে অর্থ আদায় করার অভিযোগও রয়েছে। এসব হাসপাতাল এখন সেবা নয়, চিকিৎসা ব্যবসায় নিয়োজিত।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, চিকিৎসার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো নীতিমালা ও কৌশল নির্ধারণ করা নেই। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে বিদেশগামীদের বিষয়ে কোনো তথ্যও সংরক্ষণ করা নেই। ভারত ছাড়াও থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিতে যায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি। ভারতে পর্যটন ভিসা নিয়েও অনেকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকেন। একমাত্র দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমেই এ বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় বন্ধ করা সম্ভব। আর এজন্য শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসতে পারে।

গণমাধ্যমকর্মী