‘ব্যবসা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফাইন্যান্স বিভাগ’

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়। খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর আব্দুল্লাহ আল মাহবুব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

আব্দুল্লাহ আল মাহ্বুব সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমসে (এআইএস) বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে সম্পন্ন করেছেন কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্সি ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পেশাগত ডিগ্রি। তিনি দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) একজন ফেলো

শেয়ার বিজ: ক্যারিয়ার গড়ার গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেডের বাজেটিং টিমের সঙ্গে কন্ট্রোলিং বিজনেস পার্টনার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করি ২০০৪ সালে। এরপর আইসিএমএবি’তে ভর্তি হই এবং ২০০৬ সালে সিএমএ (কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্সি) পাস করি। একই বছর সানোফি থেকে চাকরি ছেড়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সিতে ভর্তি হই এবং আর্টিকেলশিপের জন্য রহমান রহমান হক (আরআরএইচ) চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্মে কাজ শুরু করি। এর মধ্যে ছয় মাস ওয়ারিদ টেলিকমে (বর্তমানে এয়ারটেল) ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করি। ২০০৮ সালে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পাস করি। ২০০৯ সালে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের ফাইন্যান্স ও অ্যাকাউন্টস বিভাগে অ্যাসিসট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করি। ২০১১ সালে অবার সানোফিতে ফাইন্যান্সিয়াল কন্ট্রোলারের দায়িত্ব গ্রহণ করি। পদোন্নতি পেয়ে ফাইন্যান্স বিভাগের ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। চাকরির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিএবি ও আইসিএমএবিতে গেস্ট লেকচারার হিসেবে ক্লাস নিয়েছি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্সকে কেন বেছে নিলেন?

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: ফাইন্যান্সকে বেছে নেওয়ার পেছনের কারণ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। আমার বাবা বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র ছিলেন। এটি একটি কারণ হতে পারে। তবে এটা সজ্ঞানে নয়। এইচএসসি শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ভর্তি পরীক্ষায় আমার সিরিয়ালটা প্রথম দিকেই ছিল। অ্যাকাউন্টিং যেহেতু ভালো বিষয়ের একটি, তাই এ বিষয়ে পড়ালেখা শুরু করি।

শেয়ার বিজ: সানোফি সম্পর্কে কিছু বলুন

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: সানোফি একটি বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এটি। জীবনকে উন্নত করার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা সমস্যার সামাধান করে থাকে এ প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রায় ১০০টি দেশে এর কার্যক্রম রয়েছে। স্বাস্থ্য ও মানুষের কল্যাণে প্রায় ১১ হাজার বিজ্ঞানীসহ প্রায় এক লাখ কর্মচারী কাজ করছেন। সানোফির গ্লোবাল হেড অফিস প্যারিসে।

বাংলাদেশে সানোফির যাত্রা ১৯৫৮ সালে। এটি একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। এখানে বাংলাদেশ সরকারের প্রায় ৪৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ শেয়ার আছে। ভ্যাকসিন, ইনসুলিন ও কেমোথেরাপিউটিক ওষুধের মতো সংবেদনশীল ও উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকে আমদানি করি আমরা। সমাজ পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে সানোফি বাংলাদেশ লিমিটেড।

 শেয়ার বিজ: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) প্রতিষ্ঠানের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। প্রভাব ফেলার কথাও নয়। অ্যাক্টের মাধ্যমে গঠিত কাউন্সিলটি সঠিকভাবে রিপোর্টিং প্র্যাকটিস করছে কি না, সেটি দেখাশোনা করবে। এফআরএ হয়তো ভ্যালু অ্যাড করবে। কিন্তু বর্তমানে আইসিএবি প্র্যাকটিসটি দেখাশোনা করছে। প্র্যাকটিস ঠিকমতো না হলে আইসিএবি পদক্ষেপও নিচ্ছে। এর আগেও আইসিএবি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা কাজ করে যাচ্ছে। আইন হওয়ার পর এখন এটি আইনের মধ্য দিয়ে কাজ করবে। মঙ্গলের জন্যই আইন। আমি এ আইনকে শ্রদ্ধা করি। অডিট বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিএবি তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে নিশ্চিত করেই কাজ করবে বলে মনে করি। এ কাউন্সিলে প্রফেশনাল বডিগুলোর (আইসিএবি, আইসিএমএবি, আইসিএসবি) প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে।

 শেয়ার বিজ: বাংলাদেশের কর পলিসিকে কীভাবে  মূল্যায়ন করেন?

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: ট্যাক্সের পরিধি বিস্তৃত করার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে হবে। জোরজবরদস্তি করে কর আদায়ের চেয়ে সচেতনতা বাড়ালে মানুষ কর দিতে আগ্রহী হবে। কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবে মানুষ তার বিপক্ষে যেতে চায়। তাই সচেতনতা বাড়িয়ে সবাইকে কর প্রদানের সুবিধা-অসুবিধা বুঝিয়ে দিতে হবে। মানুষ কর প্রদানের

সুযোগ-সুবিধা বুঝতে পারলে নিজ উদ্যোগেই দিতে আগ্রহী হবে। আমাদের দেশের অনেক এলাকা করের আওতার বাইরে। সেগুলো ট্যাক্সের আওতায় আনা সম্ভব। ট্যাক্স রেট কমিয়ে আওতা বাড়ালে ভোক্তারা উপকৃত হবেন। কম খরচে ভালো প্রোডাক্ট পাওয়া যাবে।

অনেকেই কর দিতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েন। এটাকে আমি দুইভাবে দেখি। এক. সরকারের হয়ে কর আদায় করা এনবিআরের দায়িত্ব। তারা দায়িত্ব পালন করবে। দুই. আমার দায়িত্ব হলো নিয়মানুসারে কোম্পানির কর নিশ্চিত করা। দেশের নাগরিক হিসেবে আমাকে দেশের আইন মানতে হবে। আইন অনুযায়ী কর দিতে হবে। অনেক সময় এনবিআর অনেক ব্যয় সমর্থন করে না। এটা অনেক ইস্যু তৈরি করলেও এখন আমরা এটা আশা করতে পারি যে, এফআরএ বাস্তবায়নের পর এনবিআর আর এমন করবে না বা এখানে কোনো  সন্দেহ থাকবে না। আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে। আমাদের উচিত, আইন অনুযায়ী ট্যাক্স প্ল্যানের মাধ্যমে কর কমানো।

শেয়ার বিজ: বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি সিএ ফার্মের সহযোগিতা নেওয়ার প্রবণতা বেশি কেন?

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মান মেনে চলে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের অডিট ফার্মের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়। আরও একটি ব্যাপার হলো একটি প্রতিষ্ঠানের প্যারেন্ট অডিটর কেপিএমজি (নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান) হলে তারা অন্য কোনো দেশে তাদের অডিট ফার্ম আছে কি না, তা খুঁজে দেখবে। তবে আমাদের দেশি ফার্মের মানও বেশ ভালো। আমরা নিজেরাও বিভিন্ন ধরনের অডিটের কাজ করি। অডিটের ভালো মান আছে বলেই আইসিএবি অনুমতি দিচ্ছে।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে ফাইন্যান্স বিভাগের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: ব্যবসাকে সংখ্যায় ব্যাখ্যা করলে সেটা হবে ফাইন্যান্স। ব্যবসা করতে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়, সে বিষয়গুলোই ফাইন্যান্সের জন্য চ্যালেঞ্জের। ধরুন একটা পণ্যের আশানুরূপ বিপণন হয়নি। কেন এমন হলো? পরিকল্পনায় কোনো ঘাটতি ছিল কী? কিংবা বাজার বিশ্লেষণ কী ভুল ছিল? বাজারে ঠিকমত পণ্যটি পৌঁছেছিল কিনা? এসব বিষয় খতিয়ে দেখে ফাইন্যান্স বিভাগ। এজন্য প্রথমে তারা সমস্যাটা চিহ্নিত করে। পরে কি ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, তার প্রস্তুতি নেয়। সুতরাং ব্যবসা পরিচালনার সবকিছুই ফাইন্যান্স বিভাগের জন্য চ্যালেঞ্জের। ফাইন্যান্স কর্মকর্তা শুধু অর্থ নিয়েই যে কাজ করেন, তা নয়। তিনি একজন বিজনেস পার্টনারও বটে।

 শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে অর্থ কর্মকর্তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: পেশা হিসেবে ফাইন্যান্স একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। বিশ্বব্যাপী এর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ফাইন্যান্স বিভাগ। তাছাড়া পেশা হিসেবেও বেশ আকর্ষণীয়।

 শেয়ার বিজ: সম্প্রতি সিএফও বিডির পক্ষ থেকে আপনি বেস্ট সিএফও (বহুজাতিক কোম্পানি ক্যাটাগরি) পুরস্কার পেয়েছেন, সে সম্পর্কে কিছু বলুন

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ যে কোনো জায়গা থেকেই পুরস্কার পাওয়াটা উৎসাহজনক। চমৎকার অনুভূতি কাজ করে তখন। আমার দৃষ্টিতে সিএফও বিডি একটি ভালো প্ল্যাটফর্ম। এটা খুবই চমৎকার ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। আমাদের দেশে এ ধরনের পুরস্কার এটাই প্রথম। এ ধরনের পুরস্কার মানুষের মধ্যে কর্মপ্রেরণা সৃষ্টিতে সাহায্য করবে। সিএফও বিডির এ উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: যারা ফাইন্যান্সে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?

আব্দুল্লাহ আল মাহবুব: প্রথমে লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। কী করবো, কীভাবে করবো এমন ভাবনার পাশাপাশি সঠিক ক্যারিয়ার প্ল্যান থাকা উচিত। সব কাজ সময়মতো করতে হবে। প্রশিক্ষণটা হওয়া উচিত অনেক কঠিন। যেন পরবর্তী সময়ে নিজেকে যোগ্য প্রতিযোগী হিসেবে তুলে ধরা যায়। পরিকল্পনা থাকা জরুরি। আমি কোথায় যেতে চাই, কীভাবে যেতে চাই সে পথ বা লক্ষ্য চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।