ব্যবসা পরিবর্তনের উদ্বিগ্নতা

মিজানুর রহমান শেলী: কোনো পণ্য বাণিজ্যে বিনিয়োগ করা বা বিনিয়োগ না করার উভয় সংকট কীভাবে আচ্ছন্ন করে সেটা বোঝার জন্য বার্লিংটনের কারখানাগুলোর দিকে আমরা তাকাতে পারি। এখানকার বড় বড় টেক্সটাইল কোম্পানির আজ ও পেছনের আরও ২১ বছরের নথি থেকে আমরা একটি উপলব্ধি দাঁড় করাতে পারি। ১৯৬৪ সালে বার্লিংটন ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে এক দশমিক দুই বিলিয়ন ডলার বিক্রয় করেছিল। এটা উৎপাদন ও বণ্টন উভয় খাতেই একটি শক্তিশালী অবস্থানে আসতে সক্ষম হয় তখন। আজকের এই দিনে এ সক্ষমতার সঙ্গে আমরা নিজেদের কোনোভাবেই মেলাতে পারি না। এমনকি আশাও করতে পারি না। এমনকি তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ব্যবধানের উপার্জন রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৬৪ সালের শেষের দিকে এদের স্টক বিক্রি ৬০-এ পৌঁছেছিল, আর আজ আমাদের মাত্র ১৩।
এরপর বার্লিংটন টেক্সটাইল ব্যবসার দিকে নজর দিল এবং ১৯৮৫ সালে প্রায় দুই দশমিক আট বিলিয়ন ডলার তারা বিক্রি করেছিল। ১৯৬৪-৮৫ সালের দিকে কোম্পানি ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (কোনো ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী সম্পদ যেমন ভূমি, ভবন ও যন্ত্রপাতি ক্রয় বা ব্যবস্থাপনার জন্য যে খরচ করে থাকে।) করেছিল প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ ছিল যে কোনো যুক্তরাষ্ট্রীয় টেক্সটাইল কোম্পানির চেয়ে অনেক অনেক বেশি। আমি নিশ্চিত, এই ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে খরচ হয়েছিল। আমি মনে করি, কোম্পানির এই মূলধনি সিদ্ধান্ত ছিল মোটামুটি যৌক্তিক।
তবু বার্লিংটন বাস্তবে বিক্রির গতি হারিয়ে ফেলেছিল। বিক্রি কমে এসেছিল। এমনকি বিক্রি ও সমমূলধনে তাদের রিটার্ন কমে আসতে থাকে। ২০ বছর আগের চেয়ে এখন অনেক কম। ১৯৬৫ সালের তুলনায় বিক্রি আজ প্রায় অর্ধেকে এসে পৌঁছেছে। তবে সিপিআই ইতোমধ্যে তিনগুণ হয়েছে। নিয়মিত ডেভিডেন্টও বেড়েছিল। কিন্তু ক্রয় ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল।
শেয়ারহোল্ডারদের জন্য এরকম ধ্বংসযোগ্য ফলাফলই প্রমাণ করে একটি ভুল বিষয়ে বুদ্ধি খাটানোর পরিণাম ভালো হয় না। এই পরিস্থিতিটাকে স্যামুয়েল জনসনের ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়: ‘একটি ঘোড়া দশ পর্যন্ত গুনতে জানে। এ কারণে এই ঘোড়াটা একটি খ্যাতি পেয়ে গিয়েছিল। তবুও ঘোড়াটি কোনো নাম করা অঙ্কবিদ হতে পারেনি।’ একইভাবে একটি টেক্সটাইল কোম্পানি তার কারখানার মধ্যে অনেক টাকা লগ্নি করে নাম কুড়াতে পারে, কিন্তু তাতে যে কোম্পানি ব্যবসায় ভালো চলবে তা বলা যায় না।
আমার শেষ মন্তব্য আমি আমার অন্যান্য ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে দিতে পারি। আসলে ভালো ব্যবস্থাপনার মানে হলো, আপনি কীভাবে একটি বাণিজ্য তরীতে উঠছেন সেটা যত গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি কোন বাণিজ্য তরীতে উঠবেন? আসলে আপনি যদি বুঝতে পারেন কোনো তলা ছিদ্র নৌকায় আপনি চড়েছেন, তবে সেই নৌকার তলা সংস্কারের সময় ব্যয় না করে কোনো ভালো নৌকা খুুঁজে নৌকা পরিবর্তন করে নেওয়া অনেক বেশি বুদ্ধিমানের মতো কাজ।

আমাদের সব ব্যবসাই মুনাফা বাড়নোর লক্ষ্যে পরিচালিত হয় না। যখন কোনো কারখানার অধঃপতিত অর্থনীতি বারবার হোঁচট খাচ্ছে, তবে একজন বুদ্ধিমান ব্যবস্থাপকের কাজ হবে এই অধঃগতির হার কমিয়ে আনা। যদিও এরকম ক্ষয়িষ্ণু দশায় থাকলে ব্যবস্থাপকের সব দক্ষতা মলিন হয়ে আসে। আমার এক বুদ্ধিমান বন্ধু বলেছিল, ‘তুমি যদি একজন ভালো ব্যবসায়ী হিসেবে তোমার খ্যাতি অর্জন করতে চাও, তবে নিশ্চিত হয়ে নিও তুমি একটি ভালো ব্যবসায় নিযুক্ত হচ্ছো।’
চার্লি ও আমি যখন তরুণ ছিলাম তখন আমেরিকায় টিকে থাকার জন্য সংবাদপত্র ব্যবসা থেকে সহজে আয় করা যেত। একজন অখ্যাত প্রকাশকের বিখ্যাত কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই, ‘আমি আমেরিকার দুটি রীতি আচারের সঙ্গে আমার ভাগ্যকে বেঁধে রাখতে চাই: একচেটিয়া আর স্বজনপ্রীতি। আসলে যে নগরে একটি পত্রিকার একচেটিয়া আধিপত্য সে নগরীতে আর কোনো পত্রিকা টিকে থাকতে পারে না। তার মান ও ব্যবস্থাপনা যতই খারাপ হোক।’
যে কোনো কোম্পানির টলটলয়ান রিটার্নকে খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। ২০ শতকের বেশিরভাগ সময় ধরে, সংবাদপত্রই ছিল তথ্যপ্রাপ্তির প্রাথমিক সূত্র আমেরিকার জনগণের কাছে। খেলা, অর্থনীতি বা রাজনীতি যে কোনো বিষয়েই সংবাদপত্র শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। এমনকি জনগণের চাকরি খোঁজা এবং নিত্যপণ্যের দাম জানার জন্য সংবাদপত্রের যেন কোনো বিকল্প ছিল না।
তাই বেশিরভাগ পরিবারই একটি পত্রিকা রাখার প্রয়োজনীয়তা খুব অনুভব করত। তবে কোনো পরিবারই দুটি পত্রিকা রাখার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। যে কোনো বিজ্ঞপ্তি, বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার জন্য সবাই সংবাদপত্রকেই বেছে নিত। আবার পাঠকও বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ও খবরের প্রতি বিশেষ আগ্রহ রাখত। এ প্রচারণা সংবাদপত্রের জন্য একটি বিশ্বাস তৈরি করেছিল, ‘সবচেয়ে স্বাস্থ্যবানই টিকে থাকে’।
তাই একটি প্রধান নগরীতে যখন দুই বা তার বেশি পত্রিকা চলতে থাকে, তার মধ্য থেকে যে কোনো একটি সামনে এগিয়ে থাকে ওই পত্রিকা যেটা সর্বপ্রথম কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই প্রতিষ্ঠাতা পেয়েছিল। এই চিত্রটি এক শতক আগের সারা পৃথিবীর জন্যই সত্য ছিল। আবার কোনো সংবাদপত্র যদি প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তবে সে বিজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তির দর নির্ধারণে লাগামহীন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনদাতা ও পাঠকের সংখ্যাও দিনে দিনে বাড়তে থাকে এবং বার্ষিক হিসেবে মুনাফার চাকা বেশি গতি পেতে থাকে। আর এই পরিস্থিতি হলো মালিকের জন্য একটি অর্থনৈতিক স্বর্গ।
শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি আমার ১৯৯১ সালের চিঠিতে বলেছিলাম, এই ধরাবাঁধা দুনিয়া পরিবর্তন হতে চলেছে। ‘মিডিয়া বাণিজ্য সামনের দিনগুলোতে কম চমৎকার বলে মনে হবে। যেমন করে কয়েক বছর আগে শিল্প-কারখানা ও ঋণদাতারা চিন্তা করেছিল।’ আমার এই মন্তব্যের কারণে অনেক প্রকাশকই সেদিন খুব অপমানবোধ করেছিল। যাহোক সংবাদপত্রের সম্পদ কিছুদিনের মধ্যে বিক্রি হতে শুরু করল, দেখে মনে হচ্ছিল যেন এসব কোনো ধ্বংসযোগ্য কলকব্জায় পরিণত হয়েছে। কার্যত, সংবাদপত্রে বড় বড় নির্বাহীরা হতাশ হয়ে পড়লেন। আগে তারা নিয়মিত সারা পৃথিবীর সংবাদপত্র নিয়ে আলোচনা-গবেষণা চালাতেন, কিন্তু তারা যেন অন্ধ হয়ে পড়লেন। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন খবর বা সংবাদপত্র ব্যবসা নিয়ে তাদের আর কোনো আগ্রহই অবশিষ্ট থাকল না। নাকের ডগার ওপর দিয়ে কোনো কিছু ঘটলেও তারা সাড়া দিতে ভুলে গেল।
এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম।
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ।