ব্যবস্থাপত্র দেন না বেশিরভাগ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার নানা দিক নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ শেষ পর্ব

জাকারিয়া পলাশ ও হামিদুর রহমান :  গুণগত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও লক্ষণনির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি হোমিওপ্যাথি। ১৮ শতকে জার্মানিতে আবিষ্কৃত এ চিকিৎসা পদ্ধতিতে এখন নানা সংযোজন-বিয়োজন ঘটেছে। সে সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে হোমিও চিকিৎসার ব্যয়। মানসম্মত হোমিও ওষুধ নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন সমস্যা।

যশোরের কেশবপুরের এক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের কাছ থেকে নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসা নিচ্ছিলেন রেহানা সুলতানা। কিছু নিয়মিত গাইনি সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। পরে পড়াশোনার কাজে ওই রোগী ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে এলিফ্যান্ট রোডের এক ডাক্তারের শরণাপন্ন হন তিনি। সেখানে তাকে চিকিৎসা শুরু করতে হয় সম্পূর্ণ নতুনভাবে। গ্রামের ডাক্তার আগে কী কী ওষুধ তাকে দিয়েছেন, কী মাত্রায় দিয়েছেন, তার কিছুই ওই রোগীর কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এ ওষুধের সেবনবিধি, নাম ও মাত্রা তুলে ধরে কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থাপত্রও দেওয়া হয়নি। ব্যবস্থাপত্রের প্রচলন না থাকায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় নানাভাবে ভুগতে হচ্ছে রোগীদের।
এদিকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় সঠিকভাবে রোগ ও ওষুধ নির্ণয় করা গেলে একটিমাত্র ওষুধই দেওয়ার কথা। কিন্তু এখন প্রায় সব চিকিৎসকই রোগীকে দিচ্ছেন অনেক ওষুধ। একে ডাক্তারদের ব্যবসায়িক কৌশল বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। তবে দেশে ডাক্তারদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষতার উন্নয়ন না হওয়ায় সঠিকভাবে ওষুধ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মত দিয়েছেন অনেকে।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর বাড্ডার ভিআইপি হোমিও চেম্বারের ডা. মো. আতিকুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা বলে থাকি যে, হোমিওপ্যাথি রোগের চিকিৎসা করে না, বরং রোগীর চিকিৎসা করে। চর্মরোগ, গ্যাস্ট্রিক কিংবা অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে যেসব রোগী আসে, বাহ্যিকভাবে তাদের অনেকেরই একই রকম সমস্যা মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক রোগীর সমস্যা আলাদা। তাই প্রত্যেক রোগীর জন্য ওষুধ ও তার মাত্রা আলাদা। কাজেই রোগীর লক্ষণ বিশ্লেষণ (কেইস টেকিং) এবং ওষুধ নির্ণয় হোমিও চিকিৎসার সবচেয়ে কঠিন কাজ। অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা না থাকলে কেউ দীর্ঘদিন এ পেশায় টিকে থাকতে পারেন না।’
ব্যবস্থাপত্র না দেওয়ার যুক্তি হিসেবে এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘প্রত্যেক রোগীর জন্য ওষুধ আলাদা হওয়ার কারণেই হোমিও চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের নাম লিখতে চান না। অনেক সময় একজন রোগী কোনো ওষুধ সেবন করে সুস্থ হলে তিনি একই ওষুধ অন্যকে খাওয়ান। তখন সেটা সঠিকভাবে কাজ করে না। এভাবে রোগীরাই চিকিৎসক হয়ে যান।’
অবশ্য রাজধানীতে অনেক চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন বলে তিনি দাবি করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সেসব ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের নাম, ব্র্যান্ড ও মাত্রা লেখা থাকে না। শুধু বোতলের নম্বর দিয়ে কত ফোঁটা কত দিন সেবন করতে হবে, তা লেখা থাকে। প্রায় সব চিকিৎসকই রোগীদের ব্যক্তিগত আচরণ, শারীরিক অবস্থা ও সমস্যা এবং বংশগত তথ্যাবলি নিজের ডায়েরিতে লিখে রাখেন, তার পাশে ওষুধের নামও লিখে রাখেন। অর্থাৎ কোনো রোগীকে দেওয়া সব ওষুধের তথ্য চিকিৎসকের কাছে থাকে। কিন্তু তারা সেটা ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ করেন না।
এ প্রসঙ্গে ডিএইচএমএস ডিগ্রিধারী ডা. সাইফুজ্জামান সুমন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ওষুধের মাত্রা নিয়ে অনেক কৌশল রয়েছে। অনেক সময় আমদানিকারকরা আমদানিকৃত মূল সিল করা ওষুধ খুচরা ডাক্তারদের দেন না, ৩০ মিলি লিটারের সিল করা ওষুধের বোতল সরবরাহ না করে বিভিন্ন বোতলে আলাদা আলাদা পরিমাণ দেন। এছাড়া ওষুধের বোতলের গায়ে মূল্য লেখা থাকে না। ফলে ডাক্তাররা নিজেদের ইচ্ছামতো মূল্য ও মাত্রা তৈরি করেন। অনেকে নিজেরাই ওষুধ শক্তিকরণ (পটেন্সি) করেন। এসব জটিলতার কারণে ওষুধের বিস্তারিত তথ্য ব্যবস্থাপত্রে লেখা হয় না।’
প্রসঙ্গত, চিকিৎসাসেবায় বিস্তারিত ও স্পষ্টভাবে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং পেশাদারিত্বের অংশ বলেই মনে করেন অনেকে। এমনকি অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার সমালোচনা করে গতবছর হাইকোর্ট থেকে এক রুল জারি করা হয়েছিল। এতে বড় অক্ষরে ওষুধের জেনেরিক নাম (ওষুধের মূল কেমিক্যাল কমপোজিশনের নাম) লেখা বাধ্যতামূলক করে এক নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত কোনো স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিষয়ে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড নামে একটি সরকারি সংস্থা রয়েছে। তাদের উচিত এসব বিষয়ে মান ও করণীয় নির্ধারণ করা। সেটা না হলে ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।’
দুই দশক ধরে রোগীদের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করছেন রামপুরার আদর্শ হোমিও হলের চিকিৎসক নূর-আলম। তিনি বলেন, ‘অতীতে বিভিন্ন সময়ের তুলনায় মানুষ এখন হোমিও চিকিৎসায় অনেক অগ্রসর। অনেক চিকিৎসক রোগী দেখার পর তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য ব্যবস্থাপত্র দেন না। পাশাপাশি একটি ওষুধের পরিবর্তে অনেক ওষুধও নিতে বলা হয়, যা ডাক্তারদের ব্যবসায়িক কৌশল।’
এদিকে একটি ওষুধ না দেওয়ার বিষয়ে কমলাপুরের হোমিও চিকিৎসক ডা. আজিজুর রহমান বলেন, ‘হ্যানিম্যানের যুগের হোমিও চিকিৎসা এখন আর নেই। সেই নিয়ম মেনে রোগীকে একটা ওষুধ দিয়ে যদি এক মাস পরে আসতে বলা হয়, তাহলে রোগীরাও আর আসবেন না। অনেক রোগীই বেশি ওষুধ না পেলে খুশি হন না।’
এসব বিষয়ে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন বলে অভিমত দিয়েছেন অনেকে। এ জন্য চিকিৎসকদের মধ্যে বিভিন্ন সম্মেলন ও আলোচনা বৃদ্ধির কথাই বলেন সংশ্লিষ্টরা।