ব্যর্থতা আর অস্থিরতায় ডুবছে সানম্যান গ্রুপ

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: আলোচিত ব্যবসায়ী মেজর (অব.) এমএ মান্নানের মালিকানাধীন সানম্যান গ্রুপের বেশ কয়েকটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এখন যেন ডুবন্ত তরী। প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন অদক্ষতা, চলতি মূলধনের সংকট, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, গ্রাহক সংকটের পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়মিত পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছে গ্রুপটি। এরই মধ্যে আইএফআইসি ব্যাংক, লংকাবাংলা, প্রিমিয়ার লিজিংসহ আরও কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপির তালিকায় উঠে এসেছে গ্রুপটির একাধিক প্রতিষ্ঠান। এতে গ্রুপটির সঙ্গে জড়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সব পক্ষ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় আছে।
ব্যাংক ও গ্রুপ সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করে আজিম মান্নান গার্মেন্টস নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শুরু করেন এমএ মান্নান। ক্রমে তা বড় হয়ে সানম্যান গ্রুপ নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো হলোÑসানম্যান সোয়েটার, ড্রেসকো লিমিটেড, পাইওনিয়ার ড্রেসেস, সেরিনা গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড, কাশেম সি হোয়েন কোম্পানি, ইয়াকুব গার্মেন্টস, হংকং ডেনিমস, সানম্যান স্পিনিং, সান গ্লোরি, সানকিট টেক্সটাইল, পেনিনসুলা গার্মেন্টস, বাংলালায়ন, সানম্যান পেপার ক্যাপিটাল, সানপ্যাক ইন্ডাস্ট্রিজ, গ্লোরি ইন্ডাস্ট্রিজ, সানম্যান টেক্সটাইল, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, গোল্ডেন হরাইজন, ডেল্টা ফ্যাশন ও আলফা টেক্সটাইলসহ প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান।
ব্যবসা পরিচালনায় অদক্ষতা ও ব্যর্থতার কারণে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী এবং লক্ষ্মীপুরে অবস্থিত পোশাক কারখানাসহ গ্রুপটির আরও কিছু প্রতিষ্ঠান একের পর এক বন্ধ করে দেয় সানম্যান গ্রুপ। আবার গোপনে মালিকানা বদল করা হয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। গ্রুপটির সহযোগী বাংলালায়ন কমিউনিকেশন আইএফআইসিতে, পেনিনসুলা গার্মেন্টস লংকাবাংলা ফাইন্যান্সে ও গোল্ডেন হাইটস লিমিটেড প্রিমিয়ার লিজিংয়ে খেলাপি তালিকায় উঠে আসে। এর মধ্যে বাংলালায়ন কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের কাছে আইএফআইসি ব্যাংকের চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সুদাসলে পাওনা হয়েছে ২৪৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এ পাওনা আদায়ে ব্যাংকটি নিলামসহ মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়া পেনিনসুলা গার্মেন্টসের কাছে লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের পাওনা ছয় কোটি ৯ লাখ টাকা এবং গোল্ডেন হাইটস লিমিটেডের কাছে প্রিমিয়ার লিজিংয়ের পাওনা ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহজামান শেয়ার বিজকে বলেন, সানম্যান গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন হাইটস লিমিটেডের কাছে প্রিমিয়ার লিজিংয়ের পাওনা ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। দেড় বছরে তারা একটি কিস্তিও পরিশোধ করেনি। এর আগে ১৫ নভেম্বর ২০১৫ সালে পাওনা আদায়ে ঢাকা সিএমএম কোর্টে মামলা করা হয়। এ মামলায় গ্রেফতার করার ওয়ারেন্টও জারি হয়।
ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সানম্যান গ্রুপের এক সময় ব্যাংক খাতে ভালো গ্রাহক পরিচিতি থাকলেও এখন নেই। এর মধ্যে এবি, ওয়ান, এক্সিম, ঢাকা, সোনালী, অগ্রণী, জনতা, পূবালী, বাংলাদেশ কমার্স, মার্কেন্টাইল, ইউসিবিএল, ট্রাস্ট, শাহজালাল ইসলামী, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, উত্তরা ফাইন্যান্স, মাইডাস ফাইন্যান্স, বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, হাজ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল হাউজিং, সিটি ব্যাংক, ফার্স্ট লিজিং, ইসলামি ফাইন্যান্স, ইডকল, সাবিনকো প্রভৃতিতে ঋণ আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে গ্রুপটির বর্তমানে ঋণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার মতো। কিন্তু প্রায়ই কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রুপটির কয়েকজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, সানম্যান গ্রুপের বর্তমান অবস্থা ভালো নয়। কয়েক মাস ধরে স্টাফদের নিয়মিত বেতন দিতে পারছে না। পুরো গ্রুপে ১৩ হাজার কর্মী ছিলেন; এখন আছেন চার হাজারেরও কম। আগে আমাদের পোশাক খাতে যারা সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করত, এখন আমরা তাদের সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করছি। এর মধ্যে একটি কোম্পানির মালিকানা বদল করা হয়। আরও কয়েকটির মালিকানা বদলে কথা চলছে। তারা আরও বলেন, ব্যবসা ভালো না হওয়ায় ঋণখেলাপি হয়ে পড়ছে কয়েকটি কোম্পানি। এসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। আমরা উদ্বেগের মধ্যে আছি।
এ প্রসঙ্গে সানম্যান গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে যোগাযোগ করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মেজর (অব.) এমএ মান্নান ১৯৯০ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচিত হন। টানা তিনবার তিনি ওই আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে বর্তমানে বিকল্প ধারার মহাসচিব পদে রয়েছেন তিনি।