ব্যাংকারদের বাধ্যতামূলক অবসর

গণমাধ্যমের কল্যাণে মাঝেমধ্যেই এমন তথ্য আসে যে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় বিপুলসংখ্যক পদ খালি থাকলেও দেওয়া হচ্ছে না নিয়োগ। এর সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর একটা হিসাব আছে। সেটি হচ্ছে, ওই ব্যাংকগুলোয় নাকি পদ খালি রয়েছে কমপক্ষে ১৬ হাজার! এ থেকে অনুমান করা অসঙ্গত হবে না, এ দেশের ব্যাংকিং খাত আজ এবং আগামী দিনের কর্মসংস্থানের এক বিরাট উৎস। তবে এর মধ্যে গতকালের শেয়ার বিজে ছাপা ‘ব্যাংক খাতে বাধ্যতামূলক অবসর বাড়ছে’ শিরোনামের খবর দেখে অনেকে মনোক্ষুন্ন্ হবেন বৈকি। বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমাদের প্রতিবেদক আরও জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় মধ্যম সারির এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক পদত্যাগের ঘটনা বেড়েছে ইদানীং। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫ হাজার ৪৭০ জন ব্যাংকার বাধ্যতামূলকভাবে পদত্যাগ করেছেন ২০১৭ সালে। আলোচ্য ঘটনা নিয়ে সচেতন পাঠকদের উদ্বেগের কারণ মূলত দুটি: এক. নিছক কর্মসংস্থান আমাদের কাম্য নয়। আমরা চাইছি মানসম্মত কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি, যেটি জোগানোর ক্ষমতা পুরোপুরিই রয়েছে ব্যাংক খাতের। এখন বাধ্যতামূলক অবসর যে ওই সম্ভাবনাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, ক্রমাগতভাবে ব্যাংকের মধ্যম পর্যায়ে ও উচ্চ স্তরে বাধ্যতামূলক অবসর ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলভাবে দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখার পরিপন্থী। কেননা এ ধরনের ঘটনা কর্মী মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং তাতে সুশাসন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণের প্রক্রিয়াটিও হয় ক্ষতিগ্রস্ত।
প্রশ্ন হলো, ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা কি বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন? ব্যাংক থেকে বাধ্যতামূলক অবসর কি সর্বদাই খারাপ? এর জবাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যে মন্তব্য করেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘অনেক ব্যাংকে দক্ষতার ভিত্তিতে ছাঁটাই করা হয়। তবে সম্প্রতি বেশকিছু ব্যাংকে মালিকানা পরিবর্তনের ফলে বাধ্যতামূলক অপসারণ বেড়ে যেতে পারে। এটা সুশাসনের জন্য কখনোই কাম্য নয়।’ তার এই বক্তব্যের বিরোধিতা করা কঠিন। বরং এর সঙ্গে কিছু উপাদান যোগ করা যেতে পারে। সেটি হচ্ছে, এক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রফিট মোটিভেশন থাকা অসঙ্গত কিংবা অস্বাভাবিক নয়। হতে পারে ব্যাংকগুলো স্রেফ নিজেদের পরিচালন মুনাফা বাড়িয়ে তুলতে অপেক্ষাকৃত বেশি উপার্জনকারী তথা মধ্যম ও উচ্চ স্তরে বাধ্যতামূলক অবসরের ঘটনা বাড়িয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। তার বদলে অন্যান্য স্তর থেকে কর্মী এনে, প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং আর্থিক সুবিধাদি বাড়িয়ে তাদের কাছ থেকে অধিক কাজ আদায় করতেই পারে তারা। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের আপত্তি না থাকলে শ্রম আইনের প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন। দেখা গেছে, ব্যাংকে অধিক কাজের চাপ নিয়ে কর্মীদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণে অনিচ্ছুক তারা। কেউ কেউ মনে করেন, শুধু আইনগত জটিলতা নয় আর্থিক বিবেচনাও এক্ষেত্রে বড় ইস্যু। তবে বাধ্যতামূলক অবসর বৃদ্ধির অন্যতম কারণ যদি এটিও হয় কারও কারও মনে জিজ্ঞাসা না জেগে পারে না, তবে কি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার ক্ষতিপূরণেও চাকরি যাচ্ছে মধ্যম ও উচ্চ স্তরের কোনো কোনো ব্যাংকারের? আরেকটি বিষয় হলো, ব্যাংক খাতে গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থেও বাধ্যতামূলক অবসরের ঘটনা বাড়তে পারে। একটি ব্যাংকের কথা তো শোনা যায়, নিয়মিতভাবেই নাকি কর্মী ছাঁটাই করছে সেটি। সেক্ষেত্রেও আপত্তি উঠবে যদি উক্ত গতিশীলতা বৃদ্ধি কার্যত নৈরাজ্যের ছদ্মবেশ হয়। এখানে ঠিক কোন উপাদানটি ক্রিয়াশীল, সেটি নির্ণয় করা প্রয়োজন আগে। কেননা জানা প্রয়োজন উদ্ভূত পরিস্থিতিটি ব্যাংকগুলোর সচেতন পদক্ষেপ নাকি কোনো গুরুতর রোগের প্রাথমিক লক্ষণ।