হোম মতামত-বিশ্লেষণ ব্যাংকের নিয়োগ পদ্ধতিতে চাই আরও কিছু সংস্কার

ব্যাংকের নিয়োগ পদ্ধতিতে চাই আরও কিছু সংস্কার


Warning: date() expects parameter 2 to be long, string given in /home/sharebiz/public_html/wp-content/themes/Newsmag/includes/wp_booster/td_module_single_base.php on line 290

ফরহাদ জাকারিয়া: সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনায় গভর্নর মহোদয় বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তার একটি হলো বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়োগ-সংক্রান্ত। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছেÑতিনি বলেছেন, এখন থেকে কোনো ব্যাংকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর বিষয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নির্দিষ্ট করে দেওয়া যাবে না। বস্তুত বিভিন্ন ব্যাংক এটি চর্চা করায় ব্যাংকের চাকরি যে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে পড়েছিল, তা কে না জানে! তাতে ওইসব বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজেদের কিছুটা আলাদা মনে করতেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তাদের এ প্রবণতা যেমন দেখা যেত আবেদন করার সময়, তেমনই কর্মক্ষেত্রেও।

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, ব্যাংক একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মক্ষেত্র। বাস্তব কারণেই এখানে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীর সমাহার প্রয়োজন। তাতে ব্যবসার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা গ্রাহকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করতে পারেন। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানও উপকৃত হয়। সরকারি ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধারা অবশ্য এখনও বিদ্যমান। সুনির্দিষ্ট কিছু পদ ছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনকারীর বিষয় উল্লেখ করতে দেখা যায় না। এও ঠিক, একই মানের ডিগ্রির ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তিতে কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম নির্দিষ্ট করে দিলে অন্য প্রতিষ্ঠানকে খাটো করা হয়। গভর্নর মহোদয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকে নিয়োগ ঘিরে বিদ্যমান এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা যায়। নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো এটি যথাযথভাবে পরিপালন করলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সত্যিকারভাবেই গড়ে উঠবে বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ কর্মক্ষেত্র হিসেবে। এর ইতিবাচক প্রভাব গ্রাহকসেবায়ও পড়বে বলে আশা।

বাস্তবতা হলো, ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন। যেমন অনেক ব্যাংক নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনের প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে প্রার্থীর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা আবশ্যক হিসেবে উল্লেখ করে। এ প্রবণতা দেখা যায় ‘ক্যাশ অফিসার’র মতো পদে আবেদনের ক্ষেত্রেও। বাস্তবে দেখা যায়, এ পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তারা প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো ডেস্কের দায়িত্বে নিয়োজিত হন না। প্রশ্ন হলো, একজন ক্যাশ অফিসার যে সেবা দেন, তাতে তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকার প্রয়োজনীয়তা কী? স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে কী পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয়, তা সবার জানা। এ পর্যায়ের শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রের বিনিয়োগও কম নয়। কিছুদিন আগে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পিয়ন পদে স্নাতকোত্তর বেশ কিছু প্রার্থী আবেদন করায় একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তোলা হয়েছিলÑরাষ্ট্র কী তাদের পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এ সামান্য সেবা প্রাপ্তির জন্য? এক্ষেত্রে অনেকে দেশের চাকরির বাজারের বিদ্যমান বাস্তবতা সামনে আনতে পারেন। কথা হলো, প্রতিষ্ঠান যখন নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয়কে আবেদনের প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করে, তখন সেখানে ব্যক্তিকে দায়ী করার অবকাশ থাকে না। ব্যাংকের আরও কিছু পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

এখন অনেক বেসরকারি ব্যাংক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর চারটি প্রথম শ্রেণি বা সমমানের ফল চায়। সন্দেহ নেই, এটি একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে চারটি প্রথম শ্রেণি বা সমমানের ডিগ্রির প্রয়োজনীয়তা কতটুকুÑসেটিও বিবেচনার দাবি রাখে। সরকারি ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের শর্ত এখনও কোথাও চোখে পড়েনি। তাহলে একই খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এত বেশি যোগ্যতা প্রয়োজন হবে কেন? বাস্তবে দেখেছি, এমন ফল নিয়ে ব্যাংকের চাকরিতে যারা যোগদান করেন, তাদের মনে এক পর্যায়ে সৃষ্টি হয় হতাশা। ব্যাংকে যে ধরনের কাজ, সেটি সম্পন্নের জন্য একজন কর্মীর এত বেশি যোগ্যতা প্রয়োজন বলে মনে হয় না। বস্তুত এমন ফলের জন্য একজন শিক্ষাজীবনে যে পরিমাণ পরিশ্রম করেন, ব্যাংকের মতো কর্মক্ষেত্রে এর প্রয়োগহীনতা দেখে তার মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয় আরও বেশি। এটি অনেক সময় প্রভাব ফেলে তার পারফরম্যান্সে। তাই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির এ ধরনের শর্ত নিয়েও নীতিনির্ধারকদের ভাবা দরকার।

আরেকটি বিষয় হলো, ব্যাংকের সিংহভাগ নিয়োগ পরীক্ষা এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক। এ কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক প্রার্থী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আবেদন করেন না। যেসব নারী প্রার্থীর রাজধানীতে এসে রাতে থাকার মতো ব্যবস্থা নেই, তারা এ ধরনের চাকরিতে আবেদনের ক্ষেত্রে অনীহা বোধ করেন। ঢাকায় নিয়ে আসার মতো কেউ না থাকলেও একইভাবে ভাবেন তারা। একই রকম প্রবণতা লক্ষ করা যায় প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। যেসব প্রার্থীর আর্থিক সংগতি কম, একজনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা আসা-যাওয়ার খরচ জোগানো কি তাদের পক্ষে কষ্টকর নয়? প্রায় সব বিভাগে ব্যাংকগুলোর আঞ্চলিক অফিস রয়েছে। অনেক ব্যাংকে দেখা যায়, নিয়োগ-পরবর্তী প্রফেশনাল পরীক্ষাগুলোর আয়োজন আঞ্চলিক অফিস করে। নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন বিভাগীয় পর্যায়ে করা কি ব্যাংকগুলোর পক্ষে অসম্ভব? তাহলে আর্থিকভাবে সমস্যায় থাকা অনেক চাকরিপ্রার্থীর দুর্ভোগ লাঘব হতো। রাজধানীতে পরিচিতজন না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেসব নারী প্রার্থী যোগ্যতা সত্ত্বেও বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদন করেন না, তখন তারাও সেটি করতে পারবেন নিশ্চিন্তে। একইভাবে এগিয়ে আসার সুযোগ পাবেন প্রতিবন্ধী প্রার্থীরা।

এখনও বেসরকারি অনেক ব্যাংকে দেখা যায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে তারা পদসংখ্যা ও সংশ্লিষ্ট পদের বেতন উল্লেখ করে না। এ ধরনের জরুরি তথ্য কেন গোপন রাখা হয়, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকরাই ভালো জানেন। তবে এটা ঠিক, বিজ্ঞপ্তিতে পদসংখ্যা উল্লেখ না থাকলে প্রার্থীরা অনেক সময় দুশ্চিন্তা ও দ্বিধায় থাকেন। আবেদন করলে বা না করলে কী হবেÑসে ব্যাপারে অনেকবার ভাবতে হয় তাদের। বস্তুত বিজ্ঞপ্তিতে পদসংখ্যা উল্লেখ না থাকলে নিয়োগের ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতারও অবকাশ থাকে। এটি রোধে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পদসংখ্যা উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। বিজ্ঞপ্তিতে বেতন স্কেল উল্লেখ না থাকলে কর্মীর মনে ধোঁয়াশাও তৈরি হয় অনেক সময়। চাকরিতে যোগদানের পর কাক্সিক্ষত বেতন না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়তে দেখা যায় অনেককে। এজন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতন স্কেল উল্লেখ থাকা আবশ্যক।

প্রায় সব বেসরকারি ব্যাংক লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে এন্ট্রি লেভেলের পদে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এখন বিভিন্ন চাকরিতে এ ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয় এক বা দুই পর্বে। বহু নির্বাচনী প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে প্রথমে করা হয় বাছাই; তারপর লিখিত পরীক্ষা। অনেক ব্যাংক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে তাদের পরীক্ষা পদ্ধতি উল্লেখ করে না। এর ফলে প্রস্তুতি নিতে প্রার্থীদের যে কিছুটা হলেও সমস্যায় পড়তে হয়, তা সহজে অনুমেয়। অনেক ব্যাংক এসব নীতিগত বিষয় সুস্পষ্ট করে থাকে তাদের মানবসম্পদবিষয়ক ম্যানুয়ালে। বাস্তবতা হলো, কর্মীরা এটা হাতে পান প্রতিষ্ঠানে চাকরি হওয়ার পর। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যদি এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা না হয়, তাহলে সাধারণ প্রার্থীরা সেটা জানবেন কীভাবে? প্রার্থীরা যাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেন, সেজন্য এসব বিষয় সুস্পষ্ট করা দরকার।

শুধু আমানতকারী বা ঋণগ্রহীতা নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কর্মী ও চাকরিপ্রার্থীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় দেখভাল করাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। গভর্নর মহোদয় ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেটা কার্যকর হলে এ খাতে চাকরির সুযোগ উš§ুক্ত হবে। কর্মসংস্থান জোগানোর ক্ষেত্রে খাতটি যে নানাভাবে এগিয়ে রয়েছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। বেতন ও অন্যান্য সুবিধার আঙ্গিকে অনেকের কাছে এটি আকর্ষণীয়। এ-খাতে নিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া হলে তা এমন প্রতিষ্ঠানে কাজে ইচ্ছুকদের জন্য সহায়ক হবে; উপরন্তু ব্যাংক খাতে সুশাসনও প্রতিষ্ঠা করবে। এসব ব্যাপারেও গভর্নর মহোদয়ের সুদৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রত্যাশিত।

বেসরকারি ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদেরও এটা বুঝতে হবে, ব্যাংক সেবাধর্মী ও মুনাফামুখী প্রতিষ্ঠান। সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শিক্ষাজীবনে চমৎকার ফল থাকলেই যে কেউ এখানে ভালো করবেন, তা কিন্তু নয়। এখানে ভালো করার জন্য বেশি প্রয়োজন গ্রাহককে সেবা দেওয়ার মনোভাব ও দায়িত্বের প্রতি আন্তরিকতা। তাহলে এ চাকরিতে সবার প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করা হবে কেন? এটা তো ঠিক, নানা বিভাগের জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর সম্মিলনে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা শুধু নয়, সৌন্দর্যও বাড়ে। এটা যাতে বরং আরও প্রস্ফুটিত হয়, সে ব্যাপারেই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

 

ব্যাংক কর্মকর্তা

 

fzakariabdÑgmail.com