ব্যাংকের মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দূর হোক

গতকালের শেয়ার বিজের প্রধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামের ঋণখেলাপি বিভিন্ন শিল্পগ্রুপ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মামলা রয়েছে দুই হাজার ৯৮০টি। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর পাওনা প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, এসব মামলা ঝুলে আছে প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো শুধু সংকটে পড়েনি; খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিধিবদ্ধ সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে কমে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা। ক্ষেত্রবিশেষে আমানতকারীরাও পাচ্ছেন না উৎসাহব্যঞ্জক মুনাফা। বস্তুত দীর্ঘসূত্রতায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে খেলাপি অন্য গ্রাহকরাও একে নেয় সুযোগ হিসেবে। এতে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে আরও ঘনীভূত হয় সংকট। এমন পরিস্থিতির পরিবর্তনে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এমনিতেই দেশের আর্থিক, বিশেষত ব্যাংক খাতকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নানা সমস্যা। খেলাপি পাওনা আদায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া না হলে খাতটির সামনে হাজির হতে পারে আরও নতুন সংকট।
খেলাপি পাওনা আদায়ে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই মামলা করে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বিরুদ্ধে। এর আরেকটি উদ্দেশ্যÑপাওনা পরিশোধে গ্রাহকের ওপর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি। তবে গ্রাহক যদি বুঝতে পারেন, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতায় আইনের সীমারেখায় থেকেও যথেষ্ট সময় পাবেন, তাহলে কি তিনি ব্যাংকের পাওনা পরিশোধে উদ্যোগী হবেন? আইন-আদালতের কাছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি কাক্সিক্ষত সহায়তা না পায়; প্রতিষ্ঠানগুলো তাহলে সাহায্য নেবে কার কাছে? খেলাপি ঋণ আদায়-সংক্রান্ত নি¤œ আদালতের মামলার রায় উচ্চ আদালতে স্থগিত হওয়ার উদাহরণও দেশে কম নেই। এমন ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশের আর্থিক খাতকে সহায়তা জোগাতে হলে ওই চর্চা বন্ধ হওয়া দরকার। ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে বরং দেখাতে হবে কঠোর মনোভাব। যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা অন্তত কমানো যাবে।
এটা ঠিক, সাময়িকভাবে ব্যবসায় পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কারণেও অনেকে পরিণত হন খেলাপিতে। এজন্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত হবে প্রাথমিক পর্যায়েই কারও বিরুদ্ধে মামলা না করা। এক্ষেত্রে বরং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা জোরদারের পরামর্শ দেব আমরা। বস্তুত এ থেকে সুফল প্রাপ্তির উদাহরণও তৈরি হচ্ছে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায়। বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে এ পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। খেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে পাওনা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে আবার রয়েছে সময়ের বাধ্যবাধকতা। এজন্য পরিস্থিতির আলোকে সুবিবেচিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। মামলা না করেই যদি পাওনা আদায় হয়, তাহলে গ্রাহক ও ব্যাংক উভয় পক্ষই কিন্তু রেহাই পায় ভোগান্তি থেকে।
খেলাপি গ্রাহক অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয় কোনো কোনো মামলায়। খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বেরুতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সদিচ্ছা দেখানো না হলে এর পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। তবে সব পর্যায় থেকে আন্তরিকতা দেখানো সত্ত্বেও বিচারালয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক যদি না থাকেন, তাহলে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো মুশকিল হবে বৈকি। দেশের বিভিন্ন আদালতে জনবল সংকট নিয়ে কথা কিন্তু হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। আর্থিক খাতের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতগুলোয় বিচারক ও জনবল সংকট কাটানোর পদক্ষেপও কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে সঙ্গত কারণেই। সর্বোপরি খেলাপি ঋণের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠান শুধু নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তার আমানত গ্রাহক ও শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ গভীরভাবে বিবেচনায় নিলে এর সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া তাদের জন্য সহজ হবে।