ব্যাংকের মুনাফা কমার প্রভাব পুঁজিবাজারে

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: দীর্ঘদিন থেকে নাজুক অবস্থায় রয়েছে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে শক্তিশালী খাত ব্যাংক। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি, ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম এবং ইসলামী ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকে অস্থিরতার খবরে এই খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকের শেয়ারের পালে হাওয়া লাগছে না। এরই মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে ব্যাংকগুলোর চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) মুনাফা কমে যাওয়ার খবর। যে কারণে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ে দোলাচলে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমেছে, যার পরিমাণ ১৫ শতাংশ। এ সময়ে ২৯টি ব্যাংক ৯৮৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা গত বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় ১৭০ কোটি টাকা কম। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকগুলো এক হাজার ১৫৮ কোটি টাকা মুনাফা করে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ প্রান্তিকে ১১ ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে, কমেছে ১৮টির। তবে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বিবেচনায় ১০ ব্যাংকের ইপিএস বেড়েছে, কমেছে ১৮টির।
এদিকে মুনাফা কমে যাওয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। প্রতিনিয়ত কমেছে এসব শেয়ারের দর। যদিও গত সপ্তাহের শেষ দিনে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে এই খাতের শেয়ারের দর কিছুটা বেড়েছে। তবে এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না তা নিয়ে সন্দিহান সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাদের অভিমত, এই খাত নিয়ে একটি চক্র খেলা করছে। তারাই ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের শেয়ারের দর হ্রাস-বৃদ্ধি করছে।
সাময়িক পরিস্থিতি কিছুটা মন্দা হলেও এই খাত ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিমত, ব্যাংক খাত হচ্ছে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী খাত। বর্তমানে এই খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বিনিয়োগযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। অনুকূলে রয়েছে এসব শেয়ারের মূল্য আয় অনুপাত। ফলে এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে অনেকটা নিরাপদ।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এই খাতের বেশিরভাগ ব্যাংকের সর্বশেষ লভ্যাংশ প্রদান শেয়ারহোল্ডারদের মনঃপূত হয়নি। সে কারণে এই খাতের শেয়ারের চাহিদায় কিছুটা ভাটা পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও। তবে খাতটি এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম প্রান্তিকে সর্বাধিক ইপিএস কমেছে ওয়ান ব্যাংকের। গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটির ইপিএস ছিল এক টাকা ২৩ পয়সা। এ বছর তা মাত্র ৩৩ পয়সায় নেমেছে। গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে এ ব্যাংকটি নিট ৮১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা মুনাফা করে, যা এ বছর ২৪ কোটি ৯ লাখে নেমেছে। ইপিএস পতনে এর পরের অবস্থানে থাকা স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ইপিএস ১৯ পয়সা থেকে নেমেছে ৯ পয়সায়। প্রাইম ব্যাংকের ইপিএস ৭৮ পয়সা থেকে ৩৪ পয়সায় নেমেছে। একইভাবে এবি ব্যাংকের ইপিএস ৩১ পয়সা থেকে কমে ১৬ পয়সায় এবং উত্তরা ব্যাংকের ইপিএস ৭২ পয়সা থেকে কমে ৩৯ পয়সায় নেমেছে।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, ব্যাংক হচ্ছে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে শক্তিশালী খাত। বিভিন্ন অনিয়মসহ এসব প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ প্রদানের হার ও মুনাফা কমেছে। সে কারণে বিনিয়োগকারীদের এই খাতের কোম্পানির প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে। তবে এসব শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ভয়ের কিছু আছে বলে মনে করি না, কারণ এখন অধিকাংশ শেয়ারের দর যে পরিস্থিতিতে রয়েছে এখান থেকে খাতটির ঘুরে দাঁড়ানো উচিত।