ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করুন বুঝেশুনে

খেলাপি ঋণের শীর্ষ তালিকায় থাকা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি ব্যাংকের শেয়ারদর অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির যে প্রতিবেদন গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশ হয়েছে, তা একাধিক কারণে চিন্তা উদ্রেককারী। সহজেই অনুমেয়, এসব ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা কাজটি বুঝেশুনে করছেন না। তারা বিশেষ কোনো মহল দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন অথবা কান দিচ্ছেন গুজবে। পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত ব্যাংক সম্পর্কে এটি সাধারণ জ্ঞান যে, পরিচালন মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ বাবদ প্রভিশন সংরক্ষণের পর শেয়ারহোল্ডারকে দেওয়া হয় ডিভিডেন্ড। এটি কত হারে দেওয়া হবে, তা আবার নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর। প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের ক্ষেত্রে হিসাবটি আরও জটিল। কারণ ডিসেম্বর সমাপনী শেষে পরিচালন মুনাফা থেকে বিদ্যমান ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বছরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে কর্তৃপক্ষকে। এ অবস্থায় কোনো ব্যাংক নির্দিষ্ট কোনো মাসে বেশি পরিচালন মুনাফা অর্জনের অর্থ এই নয়, তার শেয়ারহোল্ডাররা বেশি হারে ডিভিডেন্ড পাবেনÑবছর শেষে হিসাব চূড়ান্ত করার পর প্রতিষ্ঠানের শেয়ারপ্রতি আয়ও হবে অপেক্ষাকৃত বেশি। আমাদের ধারণা, জুন সমাপনীকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা অর্জনের যেসব তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সেগুলোই আমলে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির মতো বিষয় বোধকরি রয়ে গেছে তাদের বিবেচনার বাইরে। কোনো বিনিয়োগকারী এসব বিবেচনায় না রাখলে বছর শেষে তার বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত রিটার্ন নাও আসতে পারে। পরিস্থিতির কারণে কোনো শেয়ারদর পড়ে গেলে কেউ কেউ হতে পারেন ক্ষতিগ্রস্ত। এজন্য আমরা চাইব, আগ্রহীরা ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন বুঝেশুনে।

আমাদের পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাত ‘শক্তিশালী’ বলে বিবেচিত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। শেয়ার লেনদেন সংখ্যা ও টাকার পরিমাণে খাতটি কখনও টানা কয়েক দিন থাকতে দেখা যায় নেতৃত্বে। এ ধারায় থাকা খাতের শেয়ারে বিনিয়োগ আমাদের পুঁজিবাজারের একটি সাধারণ প্রবণতা। এজন্য লেনদেন একখাত-নির্ভরও হয়ে পড়ে অনেক সময়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা বাজারের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। সূচকের অস্বাভাবিক ওঠানামা যে প্রায়ই দেখা যায়, এটা তার অন্যতম কারণ। বিষয়টি এমন নয় যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অন্য কোনো কোম্পানি ভালো অঙ্কের পরিচালন মুনাফা করে না এবং সেসবে বিনিয়োগে ভালো হারে ডিভিডেন্ড পাওয়া যায় না। বিভিন্ন খাতে এমন বেশ কিছু কোম্পানি রয়েছে, যেগুলোয় বিনিয়োগে ক্ষতির শঙ্কা তেমন নেই। খেলাপি ঋণ কিংবা প্রভিশন সংরক্ষণের মতো জটিল হিসাবনিকাশও নেই সেখানে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সেসব ব্যাপারও ভেবে দেখতে পারেন বিনিয়োগকারীরা। দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ যে হারে বাড়ছে, সে বিবেচনায়ও এ খাতের কোম্পানিতে বিনিয়োগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের হওয়া দরকার সতর্ক।

যে কোনো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একখাত-নির্ভরতাকে সুবিবেচনাপ্রসূত বলে অভিহিত করেন না বিশেষজ্ঞরা। এতে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ে। পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও কথাটি একই রকম সত্য। ব্যাংক খাতের বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগে যারা উৎসাহী, আমরা চাইব তারা এটি বিবেচনায় রাখবেন। তারা যদি বিভিন্ন খাতের মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি মিলিয়ে পোর্টফোলিও গঠন করেন, তাহলে বরং ঝুঁকি কমার পাশাপাশি কাক্সিক্ষত হারে রিটার্ন পাওয়া সম্ভব হবে। পুঁজিবাজারে বিভিন্ন খাতের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্যও এ প্রবণতায় উৎসাহ জোগানো দরকার। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রাথমিক জ্ঞানদানের উদ্যোগ বাড়ছে বটে, তবে তা এখনও যথেষ্ট নয়। এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ প্রত্যাশিত। এটা করা গেলে বাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানিতে অনুমান ও গুজবনির্ভর বিনিয়োগ কমানো সম্ভব হবে বলেই আমরা মনে করি।