ব্যাংক খাতের দুরবস্থা নিয়ে বিলম্বিত বোধোদয়!

শনিবার রাজধানীর এক হোটেলে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার্স অব ব্যাংকস ইন বাংলাদেশের (এএসিওবিবি) সার্বিক সহযোগিতায় ‘মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সেখানে স্বভাবতই মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের নানা দিক পর্যালোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের একটি মন্তব্য আলোচিত হয় তুলনামূলক বেশি; যার ভিত্তিতে গতকালের শেয়ার বিজে ছাপা একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ব্যাংকের কার্যক্রমে মানুষের সন্দেহ অশনিসংকেত’। গভর্নর বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের কার্যক্রমে মানুষের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে; যা ব্যাংকগুলোর জন্য অশনি সংকেত। এসব সমস্যা কাটিয়ে অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
খেয়াল করার মতো বিষয়, ব্যাংক খাতের অবস্থা ভালো নয় বলে অনেকদিন ধরেই সতর্কতামূলক বক্তব্য দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। তবু সেগুলোর প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথভাবে কর্ণপাত করা হয়নি বলে অভিযোগ। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীরবতা ও উদাসীনতা নিয়েও অনুযোগ করেছেন অনেকে। এখন গভর্নরের ওই মন্তব্যে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে, তাদেরও নজর এড়ায়নি বিষয়টি। একে হয়তো ‘বিলম্বিত বোধোদয়’ বলতে চাইবেন অনেকে। সৌভাগ্যের বিষয় বলতে হয়, অবস্থাদৃষ্টে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের সময় ফুরিয়ে যায়নি এখনও। এ অবস্থায় আমরা প্রত্যাশা করি, গভর্নরের বক্তব্য ধরে ব্যাংক খাতে সুশাসন আনতে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠুক কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের কার্যক্রমে মানুষের মনে কিছুটা সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে বলে যে পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন গভর্নর, তা অত্যন্ত বাস্তব। প্রশ্ন হলো, এমন অবিশ্বাস ও সন্দেহ সৃষ্টি হলো কেন? আমরা এখানে প্রশ্নটা তুলতে চাই এজন্যও যে, ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার ভিত্তিই হলো ব্যাংকের ওপর গ্রাহকের আস্থা। ফলে এতে চিড় ধরলে আতঙ্ক সামাল দেওয়া তথা অর্থনীতিতে তার ক্ষতিকর প্রভাব রোধ করা কঠিন। সেক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতিই এর প্রধান কারণ। অভ্যন্তরীণ সুশাসনে দুর্বলতাও ওই দুই ঘাটতিজনিত রোগ বলে কারও কারও মত।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়, একশ্রেণির ব্যাংকের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের এমন ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে, ব্যাংক খাতে আদৌ কোনো সংকট নেই। এদিকে সচেতন গ্রাহকরা গণমাধ্যম মারফত জানতে পারছেন, তারল্য সংকট দূরীকরণে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। মাঝেমধ্যে অর্থনীতিতে বলপূর্বক বাড়ানো হচ্ছে বিনিয়োগ। অথচ তেমন কোনো সুফল পাচ্ছেন না ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। খেলাপি ও মন্দ ঋণ বাড়ছে হুহু করে; অন্যদিকে চলছে পুনঃতফসিলীকরণ। এসবের বিপরীতে যারা নিজেদের ঋণের প্রকৃত দাবিদার মনে করেন, তারা থাকছেন বঞ্চিত। এই ঢাক-ঢাক গুড়গুড় তাই গ্রাহকের মনে সন্দেহের উদ্রেক না করে পারে কি?
এটা অবশ্য হলফ করে বলা যায় না, উপরোক্ত অস্বচ্ছতা দিয়ে একটি ধ্বংসোš§ুখ ব্যাংক খাতের কঙ্কাল ঢেকে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সম্ভবত পরিস্থিতি ততটা খারাপ নয়। বর্তমান পরিস্থিতি থেকেও ব্যাংক খাতের উত্তরণ সম্ভব। সেজন্য নীতিনির্ধারকদের বাড়তি মনোযোগ দরকার। সমস্যাগুলো গোপন রেখেই তারা যদি সমাধান করতে পারেন, তবে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে এরই মধ্যে পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি হয়, তার দায়ভার কিন্তু তাদেরই নিতে হবে।