ব্যাংক খাতের সংকটের জন্য আসলে দায়ী কী ও কারা?

ড. আর এ দেবনাথ: ব্যাংকারদের অপরিণামদর্শিতা আজ আমাদের ব্যাংক খাতকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু ব্যাংকিং সুবিধা ও পণ্যের অতিব্যবহার বা অপব্যবহার। বিষয় দুটি বুঝিয়ে বলা দরকার। ব্যাংকারদের অপরিণামদর্শিতা কোথায়? যেমন পুঁজি বা মূলধন। বর্তমান নিয়মে, একটি ব্যাংকে ১০ শতাংশের ওপরে মূলধন রাখতে হয়। কীসের ১০ শতাংশ? বাজে ঋণের ১০ শতাংশ। এটি হিসাব করা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি ফরমুলা দিয়ে, যাকে বলা হয় ‘রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস’। একটি ব্যাংকের খারাপ ঋণের হিসাব করা হয়। ওই খারাপ ঋণের ওপর ঝুঁকি হিসাব করা হয়। তার ওপর ১০ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়। এ মূলধন অনেক ব্যাংক রাখতে পারছে না। এজন্য মিডিয়ায় কত সমালোচনা! মজার বিষয় কী, অনেক পাঠক জানেন না। মূলধন যে খারাপ ঋণের বিপরীতে রাখতে হয়, এ বিষয়টি ব্যাংকারদের বুঝতে লাগে কমপক্ষে ৩০ বছর। এর আগে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ব্যাংকাররা মূলধন রাখতেন আমানতের (ডিপোজিট) বিপরীতে। ১০০ টাকা আমানত থাকলে ছয় শতাংশ মূলধন রাখতে হতো। এটি ছিল ভুল ধারণা। কারণ আমানত ব্যাংকের ‘দায়’ (লায়াবিলিটি)। অন্যদিকে ‘মূলধন’, তাও দায়। দায়ের সঙ্গে দায়ের তুলনা হয় না। অধিকন্তু ১০০ টাকা আমানত থাকলে তার পুরোটাই হতে হবে নিরাপদ। কারণ পুরো টাকাটাই গ্রাহককে ফেরত দিতে হবে। অথচ ব্যাংকাররা এমন একটা ভুল তুলনা বা হিসাব মোতাবেক চলেন ১৯৬২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত, যখন নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রণীত হয়। তখন থেকে নিয়ম হয়, খারাপ ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট ঝুঁকি হিসাব করে মূলধন রাখতে হবে। কারণ ঋণ খারাপ হলেই আমানতের অর্থ ঝুঁকিতে পড়ে। ঋণের সবটা ফেরত এলে আমানতকারীদের কোনো বিপদ নেই। আর হিসাবটা হচ্ছে, সম্পদের বিপরীতে দায় অথবা দায়ের বিপরীতে ‘সম্পদ’, যা হওয়া উচিত। এমন একটি সাধারণ হিসাববিজ্ঞানের কথা বুঝতে ব্যাংকার বন্ধুদের লাগে প্রায় ৩০ বছর। অথচ এটি না হলে অনেক ব্যাংকের মূলধনের ভিত্তি অনেক শক্ত আগে থেকেই হতে পারত। দ্বিতীয় অপরিণামদর্শিতার উদাহরণটি আরও ক্ষতিকর। আরও মারাত্মক, ধ্বংসাত্মক। ১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন নতুনভাবে যখন লিখিত হয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘পণ্ডিত’ ব্যাংকাররা আজব এক কাণ্ড করলেন যার পরিণতিতে শেয়ারবাজারে ধস নামে। অথচ এ কথা কেউ আলোচনা করে না। খালি বলে, শেয়ারবাজার উজাড় করে টাকা সব নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। নিয়েছে তো ঠিকই। কেন নিতে পারল? নিতে পারল একটা সাধারণ কারণে। শেয়ারবাজারে ভালো শেয়ার কম। শেয়ারই কম। ভালোমন্দ সব ধরেই। অথচ এই সীমিত বাজারে ব্যাংকাররা প্রতিযোগিতা করে নামলেন ব্যবসা করতে। ব্যাংকে ব্যাংকে ‘মার্চেন্ট ব্যাংক’ করা হলো। ঢাকা শহরের আনাচ-কানাচে শেয়ার বিক্রির এজেন্ট নিয়োজিত হলো। গ্রামে-গঞ্জেও একই ব্যবস্থা। হইহই রইরই অবস্থা। ১৯৯৬-৯৭ সালের মতো অবস্থা হয় ২০০৮-০৯ সালের দিকে। শেয়ারবাজারে অর্থের ছড়াছড়ি। অথচ শেয়ার কম। ‘লিকুইডিটি’ প্রচুর, লিকুইডিটি অতিরিক্ত। এটি কীভাবে হলো? হলো একটি বিধির কারণে এবং আরেকটি বাজে সিদ্ধান্তের কারণে। বিধিটি কী, তার কথা প্রথমে বলা দরকার। ১৯৯১ সালের আইনে বলা হয়, একটি ব্যাংক তার আমানতের ১০ শতাংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে। কী মারাত্মক কথা! সাধারণভাবে কোনো ব্যাংককে শেয়ারবাজারে ব্যবসা করতে দেওয়া হয় না। কারণ ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ‘স্পেকুলেটিভ ব্যবসায়’ খাটানো বিপজ্জনক। এ বিপদের মধ্যে কী করা হলো? বলা হলো, আমানতের ১০ শতাংশ শেয়ারে বিনিয়োগ করা যাবে। ভাবা যায় কত টাকা! বর্তমানে ১০ লাখ কোটি টাকা আমানত আছে। ১০ শতাংশে হয় এক লাখ কোটি টাকা। এ টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলো নামলে কী অবস্থা হবে, তা কি অনুমান করা যায়? আসলে নিয়মটি হওয়া উচিত ছিল মূলধনের ১০ শতাংশ। এ পরিমাণ টাকা পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাটাতে পারবে। এই টাকা আমানতকারীর নয়, মালিকদের মূলধনের টাকা। এ বিধান না করে, আমানতের ১০ শতাংশ খাটানো যাবে বলে সর্বনাশটা করা হয়। ব্যাংকগুলো টাকার পর টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে নেমে বিগত সর্বনাশটা করল।
ওপরে মাত্র দুটি আইন-বিধির কথা বললাম, যা আমাদের ব্যাংকগুলোর সর্বনাশ করেছে। বলা বাহুল্য, দুটি আইনি বিধানই পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু এখন রয়েছে নানা বিধি এবং গাইডলাইনের অপব্যবহার বা অতিব্যবহার। যেমন ‘রিশিডিউলিং’ বা পুনঃতফসিল। এটি একটি ভালো ব্যবস্থা। কার জন্য? ভালো ব্যবসায়ীদের জন্য। অনেক সময় ভালো ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়িক মন্দায়, দরপতনের কারণে, চাহিদা পতনের কারণে, ঝড়-ঘূর্ণিঝড়, বন্যা-অগ্নিকাণ্ড-দুর্ঘটনা প্রভৃতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঋণের কিস্তি দিতে অপারগ হয়। এ অবস্থায় কী করে ব্যাংক? তাকে পরিত্যাগ করে? না, ব্যবসায়ীর বিপদের দিনে কোনো ব্যাংক তাকে পরিত্যাগ করে না। তাকে বরং বাঁচিয়ে রাখে। যেমন করে ‘মাড়োয়ারি’ ব্যবসায়ীরা। যেমন করতেন এ দেশের প্রাচীন ব্যবসায়ীরা। এতে হতো কীÑঋণ পুনঃতফসিল করে দিলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ব্যবসা পুনরুদ্ধার করে ব্যাংকের কিস্তি দিয়ে দিত। এমন একটি সুন্দর ব্যবস্থা আমাদের সোনার বাংলার ব্যাংকাররা অতিব্যবহার, অপব্যবহার করে তার সর্বনাশ করেছেন। দেখা গেল, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা পুনঃতফসিলের সুযোগ পায় না। সুযোগ পান রাজনৈতিক ব্যবসায়ীরা। এমন ব্যবসায়ী যে কি না ব্যাংকের ডকুমেন্ট চুরি করে সেই ডকুমেন্ট দিয়ে বন্দর থেকে মালপত্র চুটিয়ে ব্যবসা করে এবং তা উদ্বোধন করায় প্রভাবশালী মন্ত্রীদের দিয়ে। এমনও হতে শুরু করে যে, একটা ঋণ ১০-১৫ বার পুনঃতফসিল হয়। এসব বাড়াবাড়ির কারণে পুনঃতফসিলের ক্ষমতা যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। দেখা গেল, সেখানে আরও দ্রুতগতিতে পুনঃতফসিল হয়। চূড়ান্ত অপব্যবহারের প্রেক্ষাপটে নিয়ম করা হয়, এখন থেকে তিনবারের বেশি পুনঃতফসিল হবে না কোনো ঋণ। তখন কাণ্ড ঘটে আরেকটা। বড় গ্রাহকদের বাঁচানোর জন্য ‘ডিকশনারি’ থেকে কর্জ করে একটি শব্দ আনা হয়। নাম তার ‘রিস্ট্রাকচার’। এতে সুবিধা দেওয়া হয় ‘ওভার বরোড কোম্পানিগুলোকে’, যাদের ক্যাশ জেনারেশন নেই। অথচ ঋণের কিস্তি বিরাট। আমার ধারণা, এ ‘রিস্ট্রাকচারড’ লোনগুলো সুনামির মতো ধেয়ে আসছে। ভেঙে দেবে সব ব্যাংকিং ডিসিপ্লিন। এই যে রিশিডিউলিং ও রিস্ট্রাকচার প্রভৃতি ঘটনাÑএসব ব্যাংকারদেরই সৃষ্টি। এরা এসব সৃষ্টি করে। এর অপব্যবহার করে, অতিব্যবহার করে। পরিণামে ভোগে ব্যাংক। অথচ এদের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। সবচেয়ে বেশি দায়িত্বমুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নিয়মনীতি তারা করে। ভুল-শুদ্ধ তারা করে। বিভিন্ন ব্যাংক তা মেনে চলে। অথবা মানে না। এক খবরের কাগজে দেখলাম, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বছরে ২৬৩টি রিপোর্ট দিতে হয়। ১৬টি দৈনিক, সাপ্তাহিক দুটি, মাসিক ১২৮টি, ত্রৈমাসিক ১০০টি, ষাণ¥াসিক দুটি এবং বার্ষিক দুটি। এগুলো করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম মোতাবেক বাণিজ্যিক ব্যাংক চলছে কি না, তা দেখার জন্য। এসব রিপোর্টের অনেকগুলো আজকাল যায় ব্যাংকিং মন্ত্রণালয়ে। এরা নতুন নিয়ন্ত্রক। প্রশ্ন তাহলেÑএত সব অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম, কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি ব্যাংকগুলোয় কীভাবে ঘটছে? এর উত্তর কে দেবে? মাঝে মধ্যে খবরের কাগজে দেখি, বাণিজ্যিক ব্যাংকের লোকদের ডাকা হয় বিচারের জন্য। কই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাফিলতির জন্য তো কাউকে ডাকা হয় না! মন্ত্রণালয়ের কাউকে তো ডাকা হয় না! এই যে এত বিধিবিধান করা হয়েছে, যার মান্যতা চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেসব তো বাণিজ্যিক ব্যাংক যেমন ভাঙছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ভাঙছে। তাহলে কার কার বিচার হওয়া দরকার?

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক