ব্যাংক খাতে একসঙ্গে এত অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত কেন?

. আর এম দেবনাথ: সময়ের কাজ সময়ে না করলে এর জন্য মূল্য দিতে হয়, ‘কাফফারা’ দিতে হয়। বলা বাহুল্য, এ অসময়ের কাজটিই এখন করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কী করেছে? সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট) এক শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে। সব তফসিলি ব্যাংককে আবশ্যিকভাবে তাদের মোট আমানতের সাড়ে ছয় শতাংশ রাখতে হতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ হিসেবে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, এখন থেকে রাখতে হবে সাড়ে পাঁচ শতাংশ। এতে ব্যাংকগুলো দশ-বারো হাজার কোটি টাকার নগদ ফেরত পাবে এবং তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাও বাড়বে আমানতের এক শতাংশ করে। প্রশ্ন উঠেছে, সিদ্ধান্তটি ঠিক হয়েছে কি না। দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, এখন থেকে ‘রেপো রেইট’ (যে হারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপদে-আপদে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়) হ্রাস পাবে দশমিক ৭৫ শতাংশ। ছিল পৌনে সাত, হবে ছয় শতাংশ। এতে ব্যাংকের ‘কস্ট অব ফান্ড’ কমার কথা। এবং ফল হিসেবে ‘লেন্ডিং রেইট’ও কমার কথা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এটি হবে কি না? তৃতীয় সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, নিয়মের বাইরে গিয়ে যেসব ব্যাংক বেশি বেশি ঋণ দিয়ে ফেলেছে, সেগুলোও ওই অতিরিক্ত ঋণ ‘সমন্বয়ের’ জন্য আরও বেশি সময় পাবে। আগে বলা হয়েছিল, ৩০ জুনের মধ্যে তা সমন্বয় করতে হবে। পরে চাপে পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সময়সীমা বৃদ্ধি করে; হয় ৩০ ডিসেম্বর। এখন আরও চাপে পড়ে করা হয়েছে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত। অর্থাৎ ঋণ-আমানতের অনুপাতের বাইরে গিয়ে যারা অতিরিক্ত ঋণ দিয়েছে, তারা তা সীমার মধ্যে আনতে পারবে আগামী মার্চের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে, এত সময় বৃদ্ধি ঠিক হয়েছে কি না; বিশেষ করে যখন ‘সিআরআর’ হ্রাস করা হয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি সরকারের। গত ৩০-৩৫ বছর ধরে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সরকারি আমানত পেত তাদের ফান্ডের মাত্র ২৫ শতাংশ। এখন বলা হচ্ছে, বেসরকারি ব্যাংক পাবে এর ৫০ শতাংশ। এতে বেসরকারি ব্যাংকের আমানত ব্যয় হ্রাস পাবে এবং এতে সরকারি ব্যাংকের ঋণ প্রদানক্ষমতা হ্রাস পাবে।  প্রশ্ন উঠেছে, ৩০-৩৫ বছর পর বেসরকারি ব্যাংকগুলো যখন মোটামুটি ‘সাবালক’, তখন এ সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা ছিল কি না?

এমন সব প্রশ্নে বাজার এখন উথাল-পাতাল। সমালোচনার ঝড় উঠেছে চারদিকে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি বেসরকারি ব্যাংকমালিকদের চাপে পড়ে এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? এতে কি ব্যবসায়িক কোনো বিবেচনা আছে? সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে। ব্যবসায়ীদের সভা। অর্থ মন্ত্রণালয় সেখানে উপস্থিত। ওই জায়গায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডাকা হয়েছে এবং সেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভূতপূর্ব ঘটনা, নজিরবিহীন ঘটনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মালিকানা শতভাগ সরকারের হাতে। এর গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর ও বোর্ড সদস্যরা সরকারের নিয়োজিত লোক। এ অবস্থায় সরকার চাইলে যে কোনো সিদ্ধান্ত এমনিতেই তাদের দিয়ে নেওয়াতে পারে। অতীতে নতুন ব্যাংক দেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছে। এ অবস্থায় দেশে এমন কী ঘটল যে, গভর্নরকে ডেকে ব্যবসায়ীদের সামনে হাজির করে সিদ্ধান্ত নেওয়াতে হবে? আমি মনে করি, এটি অনুচিত একটা কাণ্ড হয়েছে। অনভিপ্রেত ঘটনা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকই বা কেমন; তারা তো ওখানে না গেলেও পারত। তাহলে অন্তত দৃশ্যত কিছু সম্মান তারা রাখতে পারত। বলা বাহুল্য, সেটি তারা রাখতে পারেনি। নিজের সম্মান নিজে না রাখলে অন্যরা সম্মান দেবে কেন? সে জন্যই বেসরকারি ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে থোড়াই ‘কেয়ার’ করে।

এবার আসি ‘সিআরআর’ প্রসঙ্গে। যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাড়ে ষোলো শতাংশের মতো ঋণ সম্প্রসারণ হওয়ার কথা বেসরকারি খাতে। এটি হয়ে আছে সাড়ে ১৮ শতাংশ। অথচ শিল্পঋণ বাড়ছে না, প্রকল্পঋণ বাড়ছে না। অধিকন্তু কিছু ব্যাংক মাত্রাতিরিক্ত ঋণ দিয়ে ফেঁসে যাচ্ছে। আমানত সেভাবে বাড়ছে না, যেভাবে ঋণ বাড়ছে। এটা খুবই উদ্বেগজনক ‘মিসম্যাচ’। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী বলে আমি মনে করি। এতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বেড়ে যাবে। মাসের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমছে বলে অবশ্য দাবি করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। কিন্তু ২০১৭ সালের মার্চের তুলনায় ২০১৮ সালের মার্চে মূল্যস্ফীতি বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিকে বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড পরিমাণ। ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’ নেতিবাচক। ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আমদানি পণ্যের দাম আরও বাড়বে। এ অবস্থায় ‘সিআরআর’ হ্রাস আমাদের বিপদের মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

আসা যাক ‘রেপো রেইটে’। এটা মূল ‘রেইট’। সুদের হারের স্তম্ভ। এটা কমানো হয়েছে ‘কস্ট অব ফান্ড’ কমবে বলে। এতে কি ‘লেন্ডিং রেইট’ কমবে? আমার সন্দেহ আছে। বেসরকারি ব্যাংক যে কাজটি বরাবর করে, তা হচ্ছে তারা আমানতের ওপর সুদের হার কমায় বেশি এবং ঋণের ওপর সুদের হার কমায় অনেক কম হারে। তারা ‘স্প্রেড’ রাখে বেশি, যাতে ‘লোন-লস’ পোষাতে পারে। এটাই দেখে আসছি। অতএব আমি নিশ্চিত নই, ঋণের ওপর সুদের হার কমবে। বড় কথা, ঋণ তো ব্যাংকের মালিকরাই নেয়। তারা সবাই বড় ব্যবসায়ী। গার্মেন্টসের মালিক তারা, লিজিং কোম্পানির মালিক, বিমা কোম্পানির মালিক তারা। বড় আমদানিকারকও তারা। তারা কার কাছে দাবি করে যে, ঋণের ওপর সুদের হার কমাতে হবে? তারা তা কমিয়ে দিলেই পারেন। না, তারা তা করেন বলে কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নেই। তৃতীয় সিদ্ধান্তটি হচ্ছে সমন্বয়ের জন্য সময় বর্ধিতকরণ সম্পর্কে। অবাধ্য ব্যাংক, যারা নিয়মের বাইরে গিয়ে অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেশি বেশি ঋণ দিয়েছে, তাদের সমন্বয়ের জন্য এত সময় দেওয়া কেন? ‘সিআরআর’ কমানোর ফলে তাদের বোঝা অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। তাহলে এত সময় কেন? ঠিক আছে, সময় দিলেন। কিন্তু অবাধ্য ব্যাংকগুলোর বোর্ডের বিচার কী হলো? ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বিচারের কী ব্যবস্থা হলো? কারও কোনো শাস্তি হয়েছে? না, এটি আমার জানা নেই। এটি কেমন কথা হলো? কোনো অবাধ্য ব্যাংকের কোনো কর্মকাণ্ডের কোনো বিচার হলো না কেন? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যারা সময়ের কাজ সময়ে করল নাÑ সেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিচার কি হলো? কতগুলো ব্যাংক মাত্রার বাইরে ঋণ দিয়ে যাচ্ছে আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা বসে বসে দেখল! এর ফলে আজ ব্যাংক খাতটিই হয়ে পড়ল ঝুঁকিপূর্ণ। এর জন্য দায়ী কে? জবাবদিহিতা কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই? নির্বাচনের বছরে সরকার এ কারণে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হলো। এটি কি ছেড়ে দেওয়ার মতো ইস্যু?

এবার আসি ৫০ শতাংশের সিদ্ধান্তে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো কাজ করছে ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে। ইতোমধ্যে তারা ব্যাংক খাতের ৮০ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। তারাই এখন প্রধান শরিক এ খাতের। তাদের সক্ষমতা অর্জন করার কথা। তার চেয়ে বড় কথা, ব্যাংক খাতের ৮০-৮৫ শতাংশ আমানতই বেসরকারি ব্যাংকের হাতে। তাহলে সর্বমোট ১৫ শতাংশ আমানত নিয়ে এত কড়াকড়ি কেন? তারা কি তবে সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে? সরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে নানা বদনাম দেওয়া হলেও এখনও সাধারণ মানুষ ওখানেই টাকা রাখে। এ অবস্থায় সরকারের আমানত তাদের ঘরে কেন দেওয়া হচ্ছে? তাও সবাইকে। সব বেসরকারি ব্যাংক তো ক্ষতিগ্রস্ত নয়। যারা ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের একটির শেয়ার সরকারি ব্যাংকগুলো কিনে নিচ্ছে। তাহলে ত্বরিৎ এ সিদ্ধান্ত কেন সবার জন্য? সুনির্দিষ্ট ব্যাংকের জন্য সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হতে পারত। তা না করে আমানতের ক্ষেত্রে ঢালাও সিদ্ধান্ত, সিআরআর নিয়ে ঢালাও সিদ্ধান্ত কেন? বলাই বাহুল্য, এসব সিদ্ধান্ত মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। খুবই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত এগুলো। সরকার কি বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের কাছে ‘জিম্মি’ হয়ে পড়েছে? অর্থমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, সরকারের ভেতরে সরকার আছে। অর্থমন্ত্রী কি সেই তাদের কাছে নতিস্বীকার করলেন?

 

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক