প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংক খাতে নেওয়া পদক্ষেপ ক্ষতির কারণ হয়েছে

সিপিডির মূল্যায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকার বর্তমান মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংক খাতের জন্য যতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে, তার সবগুলোই এ খাতের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে বলে মনে করছে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অনুসঙ্গ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চিড় ধরেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এসব কারণে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের সীমান্ত রেখায় অবস্থান করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তোরণে বিভিন্ন খাতে ব্যাপকহারে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
রাজধানীর তোপখানা সড়কে সিরডাপ মিলনায়তনে গতকাল ‘জাতীয় অর্থনীতির পর্যালোচনা ও আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এমন মূল্যায়ন তুলে ধরে সিপিডি। অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির কমিউনিকেশন ও ডায়ালগ বিভাগের পরিচালক আনিসাতুল ফাতেমা ইউসুফসহ গতকালকের মূল প্রবন্ধ প্রস্তুতের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর প্রশ্নোত্তর পর্বে ব্যাংক খাত বিষয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ খাত নিয়ে যত কম বলা যায়, ততই ভালো। কারণ এ খাত নিয়ে বলে শেষ হবে না। গত তিন-চার বছর ধরে আমরা বিষয়টি নিয়ে এত বেশি বলেছি যে, ব্যাংক খাতের দুরবস্থা বর্তমানে একটি জাতীয় উপলব্ধিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ উপলদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় আমরা সে প্রতিফলন লক্ষ্য করি না।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর যে কয়টা পদক্ষেপ নিয়েছে, এর প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যাংক খাতের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা শুনেছিলাম, একটি টাকাও আর খেলাপি ঋণ বাড়বে না। কিন্তু বছরের প্রথম তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, সুদের হার কমিয়ে বা বাড়িয়ে যে খেলাপি ঋণ কমানো যায় না, এটা তারই প্রমাণ। ব্যবসা করতে গিয়ে বিপদে পড়া ব্যক্তিদের সুদ সুবিধা দিলে যে তারা অর্থ পরিশোধ করবেন এটা একটি ভুল তত্ত্ব। যতদিন না এ খাতে সুশাসন নিশ্চিত হবে এবং প্রকৃত তছরুপকারীদের শাস্তির আওতায় আনা না যাবে, ততদিন এ সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি আরও বলেন, সরকারি হুকুম জারির মাধ্যমে সুদের হার কমিয়ে দিয়ে যে তেমন কোনো ফল হয় না, তা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে। সুদের হার কমানোর ফলে ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এখন ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংক খাতের সামগ্রিক সমস্যার সমাধান না করে এ ধরনের সাময়িক সিদ্ধান্ত তেমন কোনো ফেল দেবে না। এক্ষেত্রে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করে এ খাতের আমূল সংস্কারের পরামর্শ পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
দেশের অর্থনীতির দুশ্চিন্তার বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী দিক হিসেবে এতদিন বিবেচিত হয়ে আসছিল। কিন্তু বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনীতি গত ১০ বছরের যে কোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে চাপের মুখে রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা অর্থনীতির একটি শক্তি ছিল। সেই শক্তিতে চিড় ধরছে। কারণ কর আহরণে অপারগতা এখন একটি অমোচনীয় প্রতিবন্ধকতায় রূপ নিয়েছে। এটা যদি অতিক্রম করা না যায়, তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে অভিলাষ তা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাবে।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক খোলাবাজারে ডলার বিক্রি করে টাকার মূল্যমান স্থিতিশীল রাখার যে নীতি নিয়েছে, তা যৌক্তিক নয় বলে মনে করছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মুদ্রার মান অবনমন হওয়ায় তারা রফতানি বাণিজ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কাজেই ডলার বাজারে ছেড়ে টাকার মান স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখার যৌক্তিকতা কমছে। টাকার মান কমানো হলে রফতানিকারকদের নগদ প্রণোদনা দেওয়ার চাপও কমবে বলে মনে করে সিপিডি। তবে একবারে বড় ধরনের অবনমন না করে ধাপে ধাপে তা কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সিপিডি জানায়, রফতানিকারকদের দাবি অনুযায়ী যদি পাঁচ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাহলে ১৪ হাজার কোটি টাকার দরকার হবে। টাকার মূল্যমান কমিয়ে তাদের এ সুবিধা দেওয়া সম্ভব বলে মনে করে সিপিডি। তবে টাকার অবমূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির ওপর যাতে চাপ না পড়ে সে বিষয়ে খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এছাড়া বিগত বোরো মৌসুমে কৃষক ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। এক্ষেত্রে কৃষককে স্বস্তি দিতে যে এক কোটি ৮০ লাখ কৃষকের তালিকা সরকারের কাছে আছে এবং তাদের নামে ব্যাংক হিসাব রয়েছে, তাদের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার টাকা করে নগদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।
মূল প্রবন্ধে পুঁজিবাজার নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে একটা দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে এবং এখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। বাজারে পুঁজির ক্ষেত্রে দেখা যায়, চারটি খাত পুঁজিবাজারে আধিপত্য বিস্তার করছে। এগুলো হলো ব্যাংক, টেলিকম, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। কিন্তু যখন আমরা লেনদেন চিত্র দেখি, তখন দেখা যায় যেসব খাতের বাজারে মূলধন কম তারা আধিপত্য দেখাচ্ছে। এক্ষেত্রে জেড ক্যাটেগরির শেয়ারদর দ্রুত বাড়তে দেখা যায় এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক যে গতি-প্রকৃতি, তার সঙ্গে পুঁজিবাজারের গতি-প্রকৃতির তেমন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা মৌলিক একটি চিন্তার জায়গা। হঠাৎ করে পিই রেশিও বেড়ে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুঁজিবাজারে ব্যাপকহারে সূচক বাড়ছিল। পরে আবার বড় ধরনের দরপতনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বাজার। তিনি বলেন, সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারের গত পাঁচ বছরের চিত্র যদি আমরা লক্ষ্য করি, তাহলে দেখা যাবে বাজেটের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। তালিকভুক্ত কোম্পানি, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, ব্রোকারেজ হাউজ সবাইকেই প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের প্রণোদনার মাধ্যমে বড় কোনো সুফল আসেনি। এর বড় কারণ হলো, পুঁজিবাজারের প্রধান সমস্যা হলো সুশাসনের সমস্যা। সেই সমস্যা সমাধান না করে বাজেটের মাধ্যমে যত ধরনের প্রণোদনাই দেওয়া হোক না কেন, তা সুফল বয়ে আনবে না।
মূল প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে বাজেট বাস্তবায়ন হার কমছে। এর কারণ হিসেবে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কম হওয়াকে দায়ী করেছে সিপিডি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সরকার যে ব্যয় করে মাথাপিছু হিসাবে তা বিশ্বের সবচেয়ে কম। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকার যে ব্যয় করে তার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন ধরনের অবসরোত্তর সুবিধা প্রদানে। এক্ষেত্রে কর্মচারীদের সুবিধা ও সাধারণ জনগণের জন্য যে সুবিধা দেওয়া হয় তা পৃথকভাবে দেখানো এবং এ অর্থ বিতরণে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছে সিপিডি। সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির সব খাতে বড় ধরনের সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

সর্বশেষ..