প্রচ্ছদ প্রথম পাতা সাক্ষাৎকার

ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে

ড. জাহিদ হোসেন, দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে কাজ করছেন বিশ্বব্যাংকে। বর্তমানে তিনি সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্টের দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করায় এখানকার উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছেন তীক্ষ্ভাবে। কাজেই, এদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো তার ভালোভাবে জানা। সম্প্রতি এসব বিষয়ে কথা বলেছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ আবু তালেব

শেয়ার বিজ: বিশ্বব্যাংক আধুনিকায়ন ও সংস্কারের কথা বলে সব সময়। এক্ষেত্রে একটি পদক্ষেপ হলো নতুন ভ্যাট আইন। এটি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক সহায়তাও করছে। কিন্তু আইনটি বাস্তবায়নে কয়েকবার হোঁচট খেতে হয়েছে। এবার তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করেন?

ড. জাহিদ হোসেন: প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো একটি আইন আছে। নতুন আইনটি তো করা হয়েছে আগের চেয়ে ভালো করার জন্য। বাস্তবতা হলো, এ আইন বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের চাপ আছে। সে জন্য দুবছর আগে বাজেটে ঘোষণা দিয়েও শেষ মূহূর্তে এর বাস্তবায়ন স্থগিত করা হলো। প্রশ্ন হলো, এ চাপ কীভাবে হ্যান্ডেল (সামলানো) করা যায়।
আমরা বলছি, নতুন আইন তো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীদের তো দাবি থাকবেই প্যাকেজ ভ্যাটের জন্য। এজন্য আইনের বাস্তবায়ন কয়েক ধাপে করা যায়। যাদের ব্যবসায়িক লেনদেনের হিসাব, নথিপত্র থাকে না, তাদের ক্ষেত্রে কেবল টার্নওভার দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। তাদের এ আইনের কিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। বাস্তবতাও তা-ই। কিন্তু যাদের লোকবল আছে, সফটওয়্যার, হিসাবরক্ষণ করা সম্ভব, যাদের সক্ষমতা আছে তাদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক করা দরকার।

শেয়ার বিজ: ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে কীভাবে লাভবান হবে রাষ্ট্র?

ড. জাহিদ হোসেন: দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়ছে গত কয়েক বছরে। কিন্তু জিডিপির অনুপাতে কর আহরণ বাড়ছে না। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে, রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো। আমরা যদি এটি বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাব কেন রাজস্ব সংগ্রহের হার বাড়ছে না। সরকারের কোষাগারে যে ভ্যাট জমা হয়, তা দেখে আমরা বলতে পারি রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির অনুপাতে সেভাবে বাড়ছে না। কিন্তু ভ্যাটদাতাদের আঙ্গিক থেকে যদি দেখি, তাহলে জনগণ বা ভোক্তারা তো ভ্যাট দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা ভ্যাট আদায় করছেন। সে দৃষ্টিতে দেখলে ভ্যাট আদায়ের হার জিডিপির অনুপাতে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। তাহলে জনগণ যে ভ্যাট দিচ্ছে, তার পুরোটা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না হয়তো। এখানে লিকেজ হচ্ছে। নতুন আইনে এ লিকেজ কমবে।
ভ্যাট আদায়ের আইনটি যত জটিল ও যত ছাড় দেওয়া হবে, রাজস্ব আদায়ে লিকেজের পরিমাণও তত বৃদ্ধি পাবে। করদাতা কর না দেওয়ার সংস্কৃতি বাড়বে, সুযোগও তৈরি হবে; আবার লিকেজ বাড়বে, রাজস্বও লস হবে। বিদ্যমান আইনের জটিলতায় সে সুযোগ রয়েছে। যদি রাজস্ব না বাড়ে, আবার যদি ব্যবসায়ীদের সক্ষমতাও না বাড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি হবে না। চ্যালেঞ্জটি এখানেই।

শেয়ার বিজ: এক্ষেত্রে কি করা উচিত বলে মনে করেন?

ড. জাহিদ হোসেন: একদিকে নতুন আইন বাস্তবায়নে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হবে বাস্তবতার জন্য। এটি শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর সব দেশই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমাদের অবকাঠামো খারাপ, বন্দরে সময় বেশি লাগে, পর্যাপ্ত ক্রেন নেই, পণ্য খালাসে অতিরিক্ত সময় লাগে; এ জন্য আমরা প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছি না।
একদিকে তারা ভালো অবকাঠামো চাচ্ছেন, গ্যাস চাচ্ছেন। অন্যদিকে তারাই আবার নতুন ভ্যাট আইনের বিরোধিতা করছেন। সরকার এগুলো দেবে কীভাবে। এজন্য তো অর্থের প্রয়োজন। সেবা পেতে হলে তো ব্যবসায়ীদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

শেয়ার বিজ: বিশ্বব্যাংক বলছে, সামষ্টিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে ব্যাংক খাতে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে কেন নতুন করে কথা বলছেন?

ড. জাহিদ হোসেন: আইনে তো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে বলা আছে; কিন্তু নতুন করে বলার কারণ হচ্ছে, আইন ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে তফাৎ থাকা। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডে যে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা, তা সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের পেশাদার ও দক্ষ জনবলের নেতৃত্বে হওয়ার কথা। সেখানে তা না হয়ে এগুলো হলো একটি হোটেলে। সিআরআর কমবে কি বাড়বেÑসে বিষয়ে তো অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা রাখার কথা নয়, এটি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ার। রেপো রেট ছয় হবে, না ছয় দশমিক ৭৫ শতাংশ হবে তা মনিটরি পলিসি ঠিক করবে। ব্যাংক মালিকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দিতে পারে মাত্র। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড তা অনুমোদন দেবে; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে রেগুলেটরি অনেক বিষয়ে ব্যাংক মালিকরা সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন।
আমরা দেখলাম, বাংলাদেশ ব্যাংক আইনগতভাবে যে স্বায়ত্তশাসন চর্চা করার কথা, তা সম্ভব হচ্ছে না। স্বায়ত্তশাসন চর্চা করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তা পারছে না বা করতে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু আইন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আছে। প্রভাবশালীদেরও তো একটি দায়িত্ব আছে, স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রতিষ্ঠানকে তার মতো করে চলতে দিতে হবে।

শেয়ার বিজ: কিন্তু আইনে তো দ্বৈত ব্যবস্থাও রয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে…

ড. জাহিদ হোসেন: ঠিক তা-ই। আইনে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে অনেক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নিতে পারে না। আমরা বলছি, মালিক হিসেবে জনগণের পক্ষে সরকারি ব্যাংকের ওপর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি থাকবে না, তা নয়। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ দিতে পারে। পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংক তদারকি করবে। ব্যাংক চালাবেন দক্ষ ব্যাংকাররা। কিন্তু সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত, ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ বিতরণ, আমানত সংগ্রহ, সিআরআর কত হবে তা দেখার দায়িত্ব তো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নয়। এটি দেখার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা তাদের ব্যাংকের ক্ষেত্রে যেমন ভূমিকা রাখেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মালিক হিসেবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও একই ধরনের ভূমিকা রাখবে। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।
এভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা একজনই থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকই সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করবে। এক খেলায় যেমন দুই আম্পায়ার থাকে না, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও দুটি হতে পারে না। তাহলে সিদ্ধান্ত ভিন্ন হবে।
জনগণের পক্ষে সরকারি ব্যাংকের মালিক হলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তারা মালিকের ভূমিকা পালন করবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনেই এর সমাধান ছিল। কিন্তু তা সংশোধন করা হয়েছে। এটিকে আবার ফিরিয়ে আনা দরকার। শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের তো চর্চা থাকতে হবে।

শেয়ার বিজ: গভর্নর নিয়োগ তো সরকারই দেয়। তাহলে তিনি কীভাবে সরকারের বিপক্ষে যাবেন?

ড. জাহিদ হোসেন: এখানে পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়া-না যাওয়ার বিষয় নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তো একটি ম্যান্ডেট আছে। তা হলো দেশের স্বার্থে মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন। পাশাপাশি আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ (রেগুলেশন)। এগুলো হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল ম্যান্ডেট। দুটোই তারা পালন করবে দেশের স্বার্থ সামনে রেখে, কারও পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। তারা দেশের পক্ষে তথা আর্থিক খাতের পক্ষে কাজ করবে। বিভিন্ন খাতে অর্থায়ন ও পেমেন্ট সিস্টেমের বিভিন্ন সেবা দেবে জনগণকে। কীভাবে নতুন পণ্য যেমন: ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আরও উন্নত সেবা দেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের সেবা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়ে ভাববে। নতুন মানুষকে কীভাবে ব্যাংক সেবার আওতায় আনা যায়, পেমেন্ট সিস্টেমের কীভাবে আরও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নয়ন করা যায়, তা করবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই পুরো সিস্টেমের অভিভাবক হিসেবে কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আমরা বলতে চাই, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার কাজ ঠিকমতো করতে পারছে কি না, এভাবেই মূল্যায়ন করতে চাই। কিন্তু ইদানীং সেক্ষেত্রে আমরা একটি ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাসেল-২ থেকে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে। এ জন্য তাদের তো একটি কৌশলগত পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী তারা এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন ঋণের শ্রেণিকরণসহ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সময়ের আলোকে তো পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু খাতের সমস্যার সঙ্গে সেই পরিবর্তন সংগতিপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে ভেবে দেখা প্রয়োজন। এখন যদি ঋণখেলাপিদের আরও দুই বছর সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে কি এই নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে যে, তারা ঋণ ফেরত দেবে? অতীত অভিজ্ঞতা কি তাই বলে? খেলাপি ঋণের ৯৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৮০ হাজার টাকাই তো কু-ঋণ। এগুলোর গ্রহীতারা তা পরিশোধে যথেষ্ট সময় পাননি, এমনটি বলার সুযোগ নেই।
এগুলো তো পুনঃতফসিল হওয়া ঋণ, পুনঃতফসিল হওয়া ঋণ আবার পুনঃতফসিল হয়েছে। এগুলো এখন মন্দ ঋণ। আর যদি পুনঃতফসিলের কথা বলি, সাধারণ ঋণের সুদহার ও পুনঃতফসিল হওয়া ঋণের সুদ ও শর্ত আরও কঠিন হতে হয়। পুনঃতফসিল হওয়া ঋণের সুবিধা বেশি হলে সবাই তো ইচ্ছাকৃতভাবে অনিচ্ছাকৃত খেলাপি হবে। এটিকে অর্থনীতির ভাষায় মর‌্যাল হেজার্ড বলে। সরকারের নীতির কারণে ঋণগ্রহীতার আচরণেও পরিবর্তন আসবে। সাধারণত যেই খেলাপি ঋণকে আপনি নিরুৎসাহিত করতে চান, এমন সিদ্ধান্তে সে বিষয়গুলোই আরও বেশি উৎসাহ পাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তো একটি পরিকল্পনা আছে; কিন্তু সেই পরিকল্পনায় যদি পরিবর্তন আনা হয়, তা খাতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না। পরিবর্তন আনা যেতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে খাতের রোগ অনুযায়ী, সেভাবে সমাধান হতে হবে। ক্যানসার চিকিৎসা তো প্যারাসিটামল দিয়ে হবে না।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শীর্ষ পাঁচ দেশের কাতারে। এটাকে টেকসই করতে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ড. জাহিদ হোসেন: এ বছরের আগ পর্যন্ত জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা গ্রোথের মূল চালিকা ছিল ভোক্তার চাহিদা। ভোক্তাব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরটি ছিল সরকারি বিনিয়োগ। কিন্তু যে দুর্বলতা রয়ে গেছে তা হলো, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির তুলনায় খুব একটা বাড়েনি। তার মানে এই নয়Ñব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু জিডিপির প্রবৃদ্ধি যেভাবে বাড়ছে, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ একই হারে বাড়ছে না। সরকারি, বেসরকারি ও বিভিন্ন মহল এ বিষয়ে তো একমত, জিডিপির অনুপাতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ অন্তত আরও চার-পাঁচ শতাংশ বাড়তে হবে। যেটা ২২-২৩ এ আছে, তা ২৮-২৯ শতাংশ হতে হবে। সেটা হচ্ছে না।
নতুন কলকারখানা, খামার, দোকান যদি না হয়, তাহলে উৎপাদন বৃদ্ধি হবে কীভাবে? যারা আছে তাদের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কাজেই উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধিতে উৎপাদন ক্ষমতা যদি সে হারে না বাড়ে, তাহলে তা একপর্যায়ে চাহিদা মেটাতে পারবে না। ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ পড়বে। এ বছর আমরা যা দেখেছি তা হলো ভোক্তা ব্যয়ের অবদান আগের মতো নয়; কিন্তু বিনিয়োগে সে পরিবর্তনটা আসেনি।
কাজেই দুর্বল জায়গাটা হচ্ছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। সরকারি খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে, সাত শতাংশের ওপরে এখন। কিন্তু প্রশ্নটা হলো এটা সত্ত্বেও ব্যক্তি খাতে আনুপাতিক হারে বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না?
এর দুটো সহজ উত্তর আছে, তা হলো ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কাঠামোগত যে সমস্যা ছিল, তার মধ্যে একটা প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল বিদ্যুৎ। সক্ষমতা ব্যবহারে বিদ্যুতের একটি দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় নিয়ে কথা হতে পারে, কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিদ্যুৎ তো একমাত্র সমস্যা ছিল না। জমির অভাব, ব্যবসা শুরু করতে রেগুলেশনের জটিলতা, বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক নিয়মে গিয়ে সবকিছু ঝুলে থাকা, দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি ঋণের সহজলভ্যতার অভাব, পুঁজিবাজার ঠিকমতো কাজ না করা, দক্ষ শ্রমিকের অভাব, বন্দরের কার্যক্রমে সময়ক্ষেপণ এগুলো তো বড় বাধা ছিল। এসব সমস্যার সমাধানে অর্থনৈতিক এলাকা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু ঢাকার যানজট বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। এজন্য মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সরকারের এ উদ্যোগ পূর্ণাঙ্গরূপে শেষ না হওয়া পর্যন্ত তো বেসরকারি খাত সেখান থেকে সুফল পাবে না। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

শেয়ার বিজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. জাহিদ হোসেন: শেয়ার বিজকেও ধন্যবাদ।

সর্বশেষ..