দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংক খাত দিয়েই দুর্নীতি প্রতিরোধ শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক: অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে। তা হলো, ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন। এটা কতটুকু সত্য বা মিথ্যা, তা জানি না। তবে কি ধরনের সমস্যা আছে তা উদ্ঘাটনের পাশাপাশি এ খাতে দুর্নীতি রোধে সর্বাগ্রে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গতকাল অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
এদিকে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম ব্যাংটির সব ইতিবাচক দিক তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমানে কোনো মূলধন ঘাটতি ও নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি নেই বলে জানালেও তা খণ্ডন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। উপস্থিত ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত, এমডি মোহাম্মদ শাম্স-উল ইসলামসহ পরিচালনা পর্যদ সদস্যরা।
প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার সরকার গঠনের সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন। দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আরও বেশি সফলতা অর্জন সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মোতাবেক আমার নিজ মন্ত্রণালয় সবচেয়ে আগে দুর্নীতিমুক্ত করার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছি। এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) বলেছি, দুর্নীতির সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করতে। দুদক সেটা করেছে। এখন আমরা দুর্নীতি প্রতিরোধের দিকে যাব।
ব্যাংক খাতেই সর্বপ্রথম দুর্নীতি রোধের প্রক্রিয়া শুরু হবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে; তা হলোÑব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন। এটি কতটুকু সত্য বা মিথ্যা জানি না। তবে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি রোধে সর্বাগ্রে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক খাতে যেসব আধুনিক টুলস প্রচলিত, বাংলাদেশে সে হারে করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়। এটি সঠিক পদ্ধতি নয়। এ খাতে ভারসাম্য আনতে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা হবে। বেসরকারি খাতে সর্বপ্রথম প্রাণ গ্রুপের বন্ড অনুমোদন দেওয়া হতে পারে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
২০৩০ সাল নাগাদ দেশে কোনো গরিব মানুষ থাকবে না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে অসচ্ছল ও পিছিয়েপড়া মানুষকে সহায়তা করা হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যবস্থা টেকসই নয়। তাই আমরা এমন কিছু করার কথা ভাবছি, যার মাধ্যমে প্রত্যেক পরিবারে কমপক্ষে একজনের জন্য শোভন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। সেটি সরকারি চাকরি হোক বা বেসরকারি খাতে হোক। প্রত্যেক পরিবার থেকে এভাবে যদি কমপক্ষে একজনকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনা যায়, তাহলে দেশে আর কোনো গরিব থাকবে না বলে জানান মন্ত্রী।
এছাড়া যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন বা যেসব ঋণ অবলোপন হয়ে গেছে, ওইসব গ্রাহককে দীর্ঘ মেয়াদে নানা সুবিধা দিয়ে অর্থ আদায়ে ‘ইনসলভেন্সি অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা উচিত বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম ব্যাংকের বর্তমান অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে সব ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। এ সময় তিনি জানান, বর্তমানে ব্যাংক খাতে আমানতে খরা চললেও অগ্রণী ব্যাংক এক্ষেত্রে ভালো করেছে। ২০১৮ সালে ১৮ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এছাড়া ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২৪ শতাংশ বেশি। আর ৯৫৮ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা ও ২০ শতাংশ রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কথা জানান তিনি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে ভালো দাবি করে এমডি জানান, বর্তমানে ব্যাংকটিতে কোনো মূলধন ঘাটতি নেই। তাই তারা আগামী বাজেটে কোনো সহায়তা চান না। এছাড়া তাদের প্রভিশন ঘাটতি নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকটির ৮৮২ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি ও গত ডিসেম্বর শেষে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৫৯৩ কোটি টাকা। মূলধন ঘাটতির বিষয়টি বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর।
ফজলে কবির তার বক্তব্যে বলেন, অগ্রণী ব্যাংক ভালো করছে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনেক ভালো ভালো সূচক তুলে ধরে অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। তবে ব্যাংকটির ৮৮২ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতির কথা বলা হয়নি। তাছাড়া যে হারে ব্যাংকটির ইতিবাচক অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে, তাতে করে ১৭ শতাংশ খেলাপি ঋণ থাকার কথা নয়। এই ১৭ শতাংশের ৯৫ শতাংশই মন্দ ঋণ। সুতরাং ব্যাংকটির উচিত খেলাপি ঋণ কি করে কমিয়ে আনা যায়, তার জন্য কাজ করা।
খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য সরাসরি মামলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন গভর্নর। তিনি বলেন, মামলা নয়, আদায়ের উদ্যোগ নিন। আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রাহকের সঙ্গে বৈঠক করতে হবে। কারণ, মামলা করলে দীর্ঘসূত্রতার একটি বিষয় আছে। তবে শেষ পর্যন্ত আদায় না হলে তো মামলা করতেই হবে।
করপোরেট গভর্ন্যান্স ও ২০ শতাংশ এসএমই ঋণ বিতরণের বিষয়েও গুরুত্ব প্রদান করার কথা বলেন গভর্নর। ২০২৪ সালের মধ্যে এসএমইতে ঋণ বিতরণ ২৫ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে অগ্রণী ব্যাংকের ভালো গ্রাহক হিসেবে মোট ১৬ জনকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বসুন্ধরা গ্রুপের কর্ণধার আহমেদ আকবর সোবহান, এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান মনজুর এলাহী, সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান,? নিটল-নিলয় গ্রুপের মাতলুব আহমাদ, নর্থইস্ট পাওয়ারের খুরশিদ আলম, প্রাণ গ্রুপের প?রিচালক উজমা চৌধুরী, নোমান গ্রুপের নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের আইয়ুব হোসেন, বিএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আলী হোসেন আকবর আলী, পিএইচপি গ্রুপের সুফি মিজানুর রহমান, ইস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, এসএমই উদ্যোক্তা নুরুন্নাহার বেগম, প্রাইম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল ও মো. শাহজাহান।

সর্বশেষ..