প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ব্যাংক শেয়ারে অনাগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু বোনাস শেয়ার

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক খাত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে এই খাতের শেয়ার। শেয়ারের মূল্য আয় অনুপাত ভালো অবস্থানে থাকলেও এর প্রতি আগ্রহ নেই বিনিয়োগকারীদের। বছরের পর বছর বোনাস শেয়ার বৃদ্ধির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজারসংশ্লিষ্ট সবাই। শুধু ব্যাংক নয়, তাদের মতে একই কারণে তালিকাভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুধু ২০১৮ সালেই তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো থেকে বোনাস শেয়ার আসছে ২২০ কোটির বেশি। এরই মধ্যে তালিকাভুক্ত ২৪ ব্যাংকের ২২০ কোটি ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩৯৫টি বোনাস শেয়ার বিনিয়োগকারীদের অ্যাকাউন্টে জমা হতে শুরু করেছে, যেগুলোর বর্তমান বাজারদর রয়েছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে পুঁজিবাজার থেকে মোট ১৪২ কোম্পানি ২৭৭ কোটি ৬৮ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে দুই হাজার ৭৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে।
২০১৮ সালের ব্যবসায় শুধু বোনাস শেয়ার ঘোষণা করেছে ১৬টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। আর আটটি ব্যাংকের পর্ষদ নগদের পাশাপাশি বোনাস শেয়ার ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ ২০১৮ সালের ব্যবসায় ২৪টি ব্যাংকের বোনাস শেয়ার পুঁজিবাজারে ঢুকতে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারী তথা পুঁজিবাজারের স্বার্থের কথা না ভেবে বড় আকারের বোনাস শেয়ার ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই শেয়ারের চাপ নেওয়ার সক্ষমতা বাজারের নেই। এমনিতেই ব্যাংক শেয়ারের চাহিদা কম, তার ওপর নতুন শেয়ার যোগ হলে চাহিদা আরও কমে যাবে। এতে শেয়ারদর আরও কমার শঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বোনাস লভ্যাংশের মাধ্যমে যে পরিমাণ নতুন শেয়ার আসছে, তা বাজারের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ নতুন শেয়ারের জোগান বাড়লে এর বিপরীতে চাহিদা খুব কম থাকবে। এতে শেয়ারের দর কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কারণ যেসব কোম্পানি বোনাস শেয়ার ঘোষণা করেছে, তাদের বেশিরভাগ কোম্পানিরই শেয়ার চাহিদা এমনিতেই কম। এর মধ্যে বোনাস লভ্যাংশ দিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, বেশিরভাগ কোম্পানিই চালাকি করে বোনাস শেয়ার ইস্যু করে। পরবর্তীকালে তারা কোম্পানির উন্নয়নে কোনো কাজ করে না। ফলে শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এ প্রসঙ্গে পুঁজিবাজারবিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস শেয়ার দেওয়া হলে অনেক সময় তা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, এ বছর যে পরিমাণ বোনাস শেয়ার যোগ হবে, তা বাজারের জন্য ভালো নাও হতে পারে। কারণ দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কেউ কিনতে চান না, যে কারণে এসব শেয়ারের দর কমতে থাকে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন শেয়ারহোল্ডাররা। বিনিয়োগকারীদের অনুরোধ করব, যারা বেশি বোনাস লভ্যাংশ দেয়, সেসব কোম্পানি থেকে দূরে থাকতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর এক পরিচালক এ প্রসঙ্গে বলেন, বোনাস শেয়ার বাজারে আসায় যে পরিমাণ শেয়ারের জোগান বাড়বে, সে পরিমাণ চাহিদা থাকবে না। কারণ কোনো কোম্পানির শেয়ার যখন বেড়ে যায়, সে কোম্পানির শেয়ারদর তখন কমে। বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার জন্য নীতিমালা থাকা উচিত। এটা না থাকায় কোম্পানিগুলোকে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, বেশিরভাগ কোম্পানি দায় সারার জন্য শেয়ারহোল্ডারদের বোনাস শেয়ার ধরিয়ে দেয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব কোম্পানির বোনাস শেয়ার দেওয়ার প্রবণতা বেশি, সেসব কোম্পানির অধিকাংশের আর্থিক অবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। তাই বিনিয়োগকারীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। তাদের মতে, বোনাস শেয়ার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর, যখন সার্বিক পুঁজিবাজার পরিস্থিতি খুব নাজুক থাকে। দেশের পুঁজিবাজারে এখন সে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বাজার পরিস্থিতি খুবই বৈরী। এ সময়ের মধ্যে পুঁজিবাজারের সূচক কমার পাশাপাশি কমছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর। তাই দর হারিয়ে নাগালে থাকলেও তা কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এর মূল কারণ শেয়ারের চাহিদা সৃষ্টি না হওয়া।
তারা বলছেন, এ অবস্থায় কোম্পানিগুলোর বোনাস শেয়ার প্রদান বিমাতাসুলভ আচরণ। নিজেদের স্বার্থ বাঁচাতে কোম্পানিগুলো বোনাস শেয়ার ইস্যু করে বিপদে ফেলছে বিনিয়োগকারীদের। এতে শুধু বিনিয়োগকারীই ঝুঁকিতে পড়ছেন না, ঝুঁকিতে পড়ছে সার্বিক বাজারও।
এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিএসইসি। আগামীতে কোম্পানির সম্প্রসারণ, সুষমকরণ, আধুনিকীকরণ, পুনর্গঠন ও বিস্তার (বিএমআরই) এবং গুণগত মান উন্নয়ন ছাড়া বোনাস শেয়ার ঘোষণা করা যাবে না। সম্প্রতি এমন ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে কোম্পানিগুলোর অহেতুক বোনাস লভ্যাংশ প্রদান বন্ধ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

ট্যাগ »

সর্বশেষ..



/* ]]> */