ব্যাংক সেক্টরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়  আমরা কতটা প্রস্তুত?

এম খালেক: রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক ব্যাংকিং সম্মেলনে ব্যাংকিং সেক্টরের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ব্যাংকিং সেক্টর আগামীতে জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ শুধু বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের ব্যাংকিং সেক্টরের জন্যই প্রযোজ্য। তাই এখন থেকেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। ব্যাংকারদের আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন নতুন মডেল উদ্ভাবন করতে হবে, যাতে সর্বোচ্চ গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ নেপালেই সবচেয়ে কম। নেপালে মোট প্রদত্ত ঋণের মাত্র এক দশমিক আট শতাংশ খেলাপি ঋণ। নেপালের একজন প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে জানান, নেপালে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং প্রকৃত ঋণখেলাপিদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়। তারপর তাদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা প্রদর্শন করা হয়। যারা প্রকৃত ঋণখেলাপি তাদের নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা এবং নানা ধরনের ছাড় দিয়ে ঋণ পরিশোধে সামর্থ্যবান করে তোলা হয়। অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসে। নেপালে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একযোগে কাজ করে। ফলে সেখানে ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ বা জালিয়াতি করে পার পাওয়া সহজ নয়। এ ছাড়া সেখানে ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়। ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, যাতে দক্ষ এবং ব্যাংকসংক্রান্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই পরিচালনা বোর্ডে সদস্য হয়ে আসতে পারেন।

বিআইবিএমে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক ব্যাংক সম্মেলনে নেপালের প্রতিনিধি তার দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের যে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তা আমাদের দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে প্রয়োগ করা যেতে পারে। নেপালের অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। কাজেই তারা যদি ব্যাংকিং সেক্টর ভালোভাবে চালাতে পারে তাহলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে কেন? বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেক্টরের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। কিন্তু ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার কারণে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে দুর্বলতা হচ্ছে, এখানে যেসব আইন প্রণীত হয় মহলবিশেষ চাপ দিলেই তা পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে ব্যাংক মালিকরা বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর মূলত অব্যবস্থাপনার জন্যই সংকটে পতিত হচ্ছে। যারা নানা ধরনের অনিয়ম-অনাচারে লিপ্ত তাদের বিচার হয় না। বিচার হয় নিরীহ কর্মকর্তাদের যাদের কোনো রাজনৈতিক বা আর্থিক ক্ষমতা নেই। মাঝে মাঝেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়Ñদেশের অর্থনীতি রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হবে, নাকি রাজনীতি অর্থনীতি দ্বারা প্রভাবিত হবে। আমি মনে করি, রাজনীতি এবং অর্থনীতি পরস্পর সহযোগিতা করে চলবে, কিন্তু কেউ কাউকে প্রভাবিত করবে না। রাজনীতিবিদরা দেশের অর্থনীতির জন্য বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন এবং নির্ধারণ করে দেবেন। কিন্তু সেই নীতি বাস্তবায়নে তারা কোনো হস্তক্ষেপ করবেন না। নীতি বাস্তবায়ন করবে ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট।

দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য একটি বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে পরিচালনা বোর্ড। পরিচালনা বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে সঠিক কোনো নীতিমালা নেই। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে অর্থ থাকলেই একজন ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে পরিচালক হওয়ার জন্য সরকার সমর্থক ব্যক্তি হওয়াটাই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক উভয় ক্ষেত্রেই পরিচালক হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার কোনো প্রয়োজেন হয় না। ফলে এমন সব ব্যক্তি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা বোর্ডের সদস্য অথবা চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন যাদের ব্যাংক এবং ব্যাংকিং সেক্টর সম্পর্কে সামান্যতম কোনো ধারণা থাকে না। নিকট অতীতেও আমার দেখেছি, সাধারণত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং অন্যান্য অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালক নিযুক্ত হতেন। কিন্তু ১৯৯১ সালে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো শুরু হয়। তখন রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। যতই দিন যাচ্ছে, এ অবস্থা ততই খারাপের দিকে যাচ্ছে। অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজ দলীয় সমর্থক বা দলবাজ লোকজন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে দায়িত্ব পাওয়ার কারণে দুর্নীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এসব পরিচালক ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে দায়িত্ব লাভের পর প্রথমেই তারা ব্যাংকে এসে দলীয় সমর্থক এবং নিজ এলাকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করেন। তাদের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে ঋণ দানের নামে অর্থ হাতিয়ে নিতে থাকেন।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং পরিচালকদের দুর্নীতির সামান্য কয়েকটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যাংকের প্রভাবশালী পরিচালক। থাকেন ঢাকার বাইরে একটি বিভাগীয় শহরে। তিনি পরিচালনা বোর্ডের পাশাপাশি ব্যাংকের অডিট কমিটিরও সদস্য। তিনি বিভাগীয় শহর থেকে মিটিংয়ের দিন সকালে প্লেনে করে ঢাকায় এসে মিটিংয়ের হাজিরা দেন। বিকালে আবার নিজ এলাকায় চলে যান। পরদিন অডিট কমিটের মিটিংয়ে যোগদানের জন্য আবার তিনি প্লেনে ঢাকায় আসেন এবং বিকালে নিজ শহরে ফিরে যান। এভাবেই তিনি যাতায়াত বিল নিয়েছেন। কিন্তু তিনি কয়েক দিন আগে থেকেই ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। ঢাকায় অবস্থান করলেও তিনি বিভাগীয় শহর থেকে প্লেনে ঢাকা যাওয়া-আসার বিল নিয়েছেন। আরেক ব্যক্তি যিনি জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন, তাকে একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি ঢাকায় অবস্থান করতেন। জাতীয় সংসদ এলাকায় অবস্থান করলেও তিনি ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে অংশগ্রহণের জন্য কুমিল্লা থেকে ঢাকা আসা এবং যাওয়ার বিল নিতেন। একপর্যায়ে বিষয়টি অডিটে ধরা পড়লে তিনি গৃহীত বিলের অর্থ ব্যাংকে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিছু দিন আগে রাজনৈতিক সমর্থক এক ব্যক্তি একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে সদস্য হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি নিয়োগপ্রাপ্তির পর ব্যাংকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তিনি এহেন দুর্নীতি নেই যা করেননি। একবার টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি যে ইস্যুতে কথা বলবেন সেই ব্যাপারে তার সামান্যতম ধারণা ছিল না। তাই তিনি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চান সিএসআর (করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) কী? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন। এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের একজন প্রভাবশালী পরিচালক, যিনি সিএসআর বলতে কী বোঝায় জানেন না, তিনি কোন যোগ্যতায় ব্যাংকের পরিচালক হয়েছিলেন?

বর্ণিত আঞ্চলিক সম্মেলনে ব্যাংক পরিচালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। বিষয়টি মাঝে মাঝে এমনিতেও আলোচিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন পরিচালক বা চেয়ারম্যানের জন্য প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে কেন? এমন ব্যক্তির কি অভাব পড়েছে যিনি ব্যাংকিং সম্পর্কে ভালো জানেন? একটি রাজনৈতিক সরকার তার দলের লোকজনকে বিভিন্ন দায়িত্বে বসাবেন এতে ক্ষতি নেই, কিন্তু যাকে বসানো হবে তার কি কোনো যোগ্যতা থাকতে নেই? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে দলীয় বিবেচনায় এমন সব ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যাদের ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই। ফলে তারা ব্যাংকের পরিচালক বা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব লাভের পর আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিয়োজিত হন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালক বা চেয়ারম্যান হচ্ছেন সরকার নিয়োজিত প্রতিনিধি মাত্র। তারা ব্যাংকের মালিক বা ম্যানেজমেন্টের অংশ নন। কিন্তু কার্যত তাদের আচরণ দেখলে মনে হয় তারাই ব্যাংকের মালিক। ঋণদান থেকে শুরু করে নিয়োগ-বদলি সব ক্ষেত্রেই তাদের হস্তক্ষেপ লক্ষ করা যায়। তাদের মাধ্যমে অনেকেই যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। যারা এভাবে অর্থের বিনিময়ে চাকরি লাভ করছেন, তাদের হাতে ব্যাংকিং সেক্টরের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। প্রসঙ্গত, দুর্নীতি বলি আর সুনীতি যাই বলি না কেন তা ওপর থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয়। তাই ব্যাংকিং সেক্টরকে যদি ভালো করতে হয় তাহলে পরিচালনা বোর্ড থেকেই প্রথম সংস্কার শুরু করতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরের মতো সংবেদনশীল একটি খাতকে কোনোভাবেই দুর্নীতিবাজ লোকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন শুধু সিনিয়ারিটির ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার যে আইন রয়েছে তা পরিবর্তন করা আবশ্যক। পদোন্নতির প্রধান যোগ্যতা হওয়া উচিত প্রার্থীর সততা। কারণ আর সবকিছুই টাকা দিয়ে কেনা যায়, কিন্তু সততা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে চুক্তি ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিধান স্থগিত করা যেতে পারে। কারণ ব্যাংকের নিজস্ব কর্মকর্তাদের ব্যাংকের প্রতি যে মমত্ববোধ থাকে, একজন চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের তা থাকার কথা নয়। তারা সাধারণত ব্যক্তিগত ফায়দা লুটে নিতেই ব্যস্ত থাকেন। কোনো কোনো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে নতুন করে ঋণ দিয়ে খেলাপি ঋণের হার কম দেখানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়, এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কারণ এতে ভবিষ্যতে ব্যাংকের অবস্থা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

 

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক