ব্যাংক হিসাবে আরোপিত কর নিয়েও এখন পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

জাহিরুল ইসলাম: ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী ব্যাংক হিসাবে বর্ধিত হারে আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করলে সেটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে বাজেট পাসের আগে অর্থমন্ত্রী তার প্রস্তাব সংশোধন করেন। সে হারেই ব্যাংক হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক কেটে রাখার বিধান এখন বলবৎ রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত নিয়ে নানা কথাবার্তা হলেও এ ইস্যুতে আলোচনা তেমন একটা শোনা যায়নি। তবে বাস্তবতা হলো, এখনও বিশেষত মেয়াদি আমানতের হিসাব খোলার সময় এ ইস্যুতে প্রশ্ন করতে শুনি মানুষকে। তারা আশপাশের মানুষের কাছে শোনা নানা কথাও শেয়ার করেন এ সময়। তথ্যগত দিক থেকে এগুলোর কোনোটি সঠিক, আবার কোনোটি ভুল। মানুষের প্রশ্ন ও এ ধরনের কথাবার্তা থেকে মনে হয়, ওই সময়ে জনসাধারণের মনে যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি এখনও বলবৎ রয়েছে।
অনেকের মনে থাকার কথা, দেশের অনেক বিশেষজ্ঞই ওই সময় অর্থমন্ত্রীর এমন প্রস্তাবের সমালোচনা করেছিলেন। ব্যাংক হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন কেউ কেউ। এর পেছনে যুক্তি ছিল, কোনো কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করার জন্য আরোপ করা হয় আবগারি শুল্ক। এ প্রশ্নও কেউ কেউ তুলেছিলেনÑসরকার কি মানুষের ব্যাংকে সঞ্চয় প্রবণতা নিরুৎসাহিত করতে চায়? অর্থনীতিবিদরা ওই সময় এমন পরামর্শ দিয়েছিলেন এ কারণে যে, ব্যাংক হিসাব থেকে এ শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে জনসাধারণের সঞ্চয় প্রবণতা আরও বাড়বে। তাতে জাতীয় সঞ্চয়ে ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা যাবে এবং সার্বিকভাবে অর্থনীতির জন্য এটি বয়ে আনবে বড় উপকার। সরকারের ওপর যেহেতু রাজস্ব আয় বাড়ানোর চাপ রয়েছে, সেহেতু অর্থনীতিবিদদের এ সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি। কিন্তু এখন এ ইস্যুতে পুনর্বার ভাবার সময় এসেছে বলেই মনে হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে আমানত ও ঋণের নতুন মুনাফার হার। এ কারণে তিন মাসের মেয়াদি আমানতের মুনাফার হার বর্তমানে নেমে এসেছে ছয় শতাংশে। একইভাবে কমেছে অন্যান্য মেয়াদি আমানতের মুনাফার হার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির গড় হার বর্তমানে ছয় শতাংশের কাছাকাছি। বেসরকারি হিসাবে এটি আরও বেশি। অর্থাৎ ব্যাংকে যারা আমানত করবেন, তাদের উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য এখন থেকে বিদ্যমান মুনাফার হারে বাড়তি কোনো প্রণোদনা থাকবে না। ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের অনেকের মত হলো, এ অবস্থায় ব্যাংক খাতে সঞ্চয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে মানুষ।
উল্লেখ্য, ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক আরোপের যে বিধান কার্যকর রয়েছে, সে কারণেও এ খাতে সঞ্চয়ের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন অনেকে। বিষয়টি একটু খোলাসা করা যাক। যেমন কেউ যদি ১০ লাখ টাকার তিন মাস মেয়াদি আমানত হিসাব খুলতে ব্যাংকে আসেন, কর্তৃপক্ষ তাকে অনুরোধ করবে টাকাটা সঞ্চয়ী হিসাবে জমা করার জন্য। এ ধরনের হিসাব যদি না থাকে, তাহলে সেটিও জরুরি ভিত্তিতে খুলে দেওয়া হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। বেসরকারি খাতে এমন কিছু ব্যাংক রয়েছে, যারা সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাব না থাকলে গ্রাহকের মেয়াদি আমানত বা মাসিক পেনশন স্কিমের (ডিপিএস) কোনো হিসাব খোলে না। তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? ওই গ্রাহক প্রথমে তার টাকা জমা করবেন সঞ্চয়ী হিসাবে। সেখান থেকে ট্রান্সফার করে টাকা নেওয়া হবে মেয়াদি আমানতের হিসাবে। তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী উভয় হিসাব থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে তার হিসাব থেকে মোট আবগারি শুল্ক কাটা হবে পাঁচ হাজার টাকা।
কোনো গ্রাহক যদি তিন মাস মেয়াদি হিসাব বছরের নভেম্বরের শুরু থেকে পঞ্জিকাবছরের যে কোনো দিন খোলেন, তার ক্ষেত্রে হিসাবটি হয় আরও জটিল। কারণ তার হিসাবটির মেয়াদ পূর্তি হয় পরের বছর। সেক্ষেত্রে দুই পঞ্জিকাবছরের জন্য তার হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক কাটা হবে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ সম্প্রতি কার্যকর হওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো গ্রাহক যদি ছয় শতাংশ হারে মুনাফায় নভেম্বরের শুরুতে তিন মাসের একটি মেয়াদি হিসাব খোলার জন্য তার সঞ্চয়ী হিসাবে টাকা জমা করেন এবং জানুয়ারিতে মেয়াদ পূর্তির পর সেটি বন্ধ করে টাকা আবার তার সঞ্চয়ী হিসাবে নেন, তাহলে আবগারি শুল্ক ও ১৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের পর তার লাভ থাকবে মাত্র দুই হাজার ৭৫০ টাকা। এ অবস্থায় স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, পরিস্থিতি যদি এ-ই হয়, তাহলে মানুষ ব্যাংকে তার আমানত রাখবে কোন আশায়?
আমানত হলো ব্যাংকিং বিজনেসের ব্লাড। যে ব্যাংকের আমানত যত বেশি, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে মুনাফা বাড়ানো তার জন্য তত সহজ। আমানতের ঘাটতি থাকলে ব্যাংক শুধু তারল্য সংকটেরই মুখোমুখি হয় না, আরও নানা সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। এর স্পষ্ট উদাহরণ আমরা সম্প্রতি লক্ষ করেছি রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া চতুর্থ প্রজšে§র একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে। সাধারণ মানুষের আমানতের প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় না থাকলে যে কোনো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানেই যে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, তা বলা বাহুল্য।
স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য তাহলে কী করা যেতে পারে? এর প্রথম উত্তর হলো, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ আমলে নিয়ে ব্যাংক হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক তুলে দেওয়া যেতে পারে। ব্যাংক প্রদত্ত মুনাফায় উৎসে কর হ্রাস করা যেতে পারে। তাহলে হ্রাসকৃত মুনাফার হারে মানুষ বাড়তি কিছু টাকা পাবে, যাতে তারা উৎসাহী হবে ব্যাংক খাতে সঞ্চয়ে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেদিকে লক্ষ রেখে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, তা বলা মুশকিল। তবে এর একটি বিকল্প রয়েছে। আবগারি শুল্ক হিসাবভিত্তিক কর্তন না করে, সেটি কর্তন করা যেতে পারে গ্রাহকভিত্তিক। যেমন কোনো ব্যাংকে একজন গ্রাহকের একাধিক মেয়াদি বা অন্যান্য স্কিমের হিসাব থাকতে পারে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সার্কুলার অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের শাখায় একজন গ্রাহকের একাধিক হিসাব থাকলে তাকে শনাক্ত করার জন্য একটি ইউনিক কাস্টমার আইডেন্টিফিকেশন কোড (ইউসিআইসি) থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব থেকে গ্রাহকভিত্তিক আবগারি শুল্ক কর্তন করা হলে গ্রাহকের এ বাবদ ব্যয় কমে আসবে। এটা ব্যাংক খাতে আমানতকারীর আকর্ষণ ধরে রাখতে কিছুটা হলেও সহায়ক হবে বলে মনে হয়।
বলে রাখা ভালো, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এবং এর বাইরেও সরকারি পর্যায়ে নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকগুলো যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই উদ্যোক্তাদের জন্য। গ্রাহকের জন্য বাড়তি কোনো সুবিধা দেওয়া হয়নি বললেই চলে। তাদের বরং লোকসান হয়েছে বেসরকারি খাতের সব ব্যাংক মেয়াদি আমানতের মুনাফার হার সম্মিলিতভাবে নির্ধারণ করায়। এ নিয়ে জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় এবং বাইরে নানা ফোরামে কঠোর সমালোচনা দেখা গেছে। বস্তুত সাধারণ গ্রাহককে সন্তুষ্ট করার মতো সরকারি কোনো উদ্যোগ যদি না থাকে, তাহলে সিআরআর হ্রাস, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি কিংবা ব্যাংকের উদ্বৃত্ত আমানত বেসরকারি ব্যাংকে রেখে এ খাতের বিদ্যমান তারল্য সংকট সমাধান করা যাবে না। সরকারের নির্দেশ মেনে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো যেহেতু ঋণের মুনাফার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বেশ কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর করেছে, সেহেতু নীতিনির্ধারকদেরও উচিত হবে খাতটিতে তারল্য সংকট যেন আরও তীব্র না হয়, সে লক্ষ্যে গ্রাহকের আকর্ষণ ধরে রাখতে ব্যাংক হিসাবে আরোপিত কর (আবগারি শুল্ক ও উৎসে কর) নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা।
ঋণের মুনাফার হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার যে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা থেকে বোঝা যায়, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়াতে চাচ্ছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যাংকগুলোর সামনে রয়েছে ঋণ-আমানত অনুপাত-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালনের বাধ্যবাধকতা। কোনো ব্যাংক চাইলেই তো তার আমানতের সব টাকা ঋণ দিতে পারবে না। বেসরকারি ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি যদি না থাকে, তাহলে ঋণের প্রবৃদ্ধি হবে কীভাবে? আমরা দেখেছি, গত বছর বেসরকারি ব্যাংক খাতে ঋণের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল তার অর্ধেক। এখন সরকারি ব্যাংকের উদ্বৃত্ত টাকা যদি বেসরকারি ব্যাংকে রাখার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে ওই ব্যাংকগুলোও তাদের স্বার্থেই আমানতকারীকে ছয় শতাংশের বেশি মুনাফা দিতে চাইবে না। সার্বিকভাবে সাধারণ আমানতকারীরা তখন চিন্তা করবেন অন্য কোনো খাতে সঞ্চয়ের। বর্তমান আমানত তুলেও অন্য খাতে নিয়ে যেতে পারেন কেউ কেউ। এতে বিশেষত বেসরকারি ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট কিন্তু আরও গভীর হবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে। শেষ পর্যন্ত গুড়ে বালি হয়েছে সেই আশা। এর পেছনের যুক্তিও অর্থমন্ত্রী উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন ফোরামে। অস্বীকার করা যাবে না, মূল্যস্ফীতি বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে তাতে আমানতের মুনাফা কমে যাওয়ায় নাভিশ্বাস উঠবে অনেকের জীবনে। আশা করব, এ অবস্থায় ব্যক্তির ওপর করের চাপ লাঘবের পাশাপাশি মানুষকে ব্যাংকে সঞ্চয়ে উৎসাহ জোগাতে উল্লিখিত বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন নীতিনির্ধারকরা। তাহলে ব্যক্তির পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতও এর সুফল পাবে।

ব্যাংক কর্মকর্তা

[email protected]