ব্যয়বহুল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প

রাশিয়ার ভিভিইআর প্রযুক্তি

ইসমাইল আলী ও মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ: বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত বছর নভেম্বরে এর মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়, যদিও প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় ভিভিইআর প্রযুক্তিতে নির্মাণ করা হচ্ছে পারমাণবিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এর নির্মাণ ব্যয় একই প্রযুক্তির চলমান ও নির্মিতব্য একই ধরনের প্রকল্প থেকে অনেক বেশি।
সম্প্রতি ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) আয়োজিত ‘নিউক্লিয়ার এনার্জি ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: অপারচুনিটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
তথ্যমতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা বা এক হাজার ৩৭৯ কোটি ডলার (এক ডলার = ৮২ টাকা)। ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এতে কেন্দ্রটিতে কিলোওয়াটপ্রতি নির্মাণ ব্যয় পড়ছে পাঁচ হাজার ৭৪৬ ডলার বা চার লাখ ৭১ হাজার ১৭২ টাকা। এটি রাশিয়ান ভিভিইআর প্রযুক্তিতে চলমান ও নির্মিতব্য যে কোনো প্রকল্পের চেয়ে বেশি।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এ চুক্তি সই করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাল ধরা হয়েছে সাত বছর। অর্থাৎ ২০২৩ সালে এর প্রথম ইউনিট উৎপাদন শুরু করবে। আর দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে যাবে ২০২৪ সালে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মূল প্রকল্পের চুক্তিমূল্য এক হাজার ২৬৫ কোটি ডলার। এর ৯০ শতাংশ সরবরাহ করবে রাশিয়া। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে এজন্য ঋণচুক্তি সই করা হয়। লন্ডন আন্তঃব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) সঙ্গে এক দশমিক ৭৫ শতাংশ যোগ করলে যে হার দাঁড়ায়, সে অনুপাতে সুদ দিতে হবে এ ঋণের জন্য। ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ৩০ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ ২০২৭ থেকে ২০৪৭ সাল পর্যন্ত এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
যদিও পার্শ্ববর্তী ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় অনেক কম। গত বছর শুরু করা হয় দেশটির কুনদানকুলা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩ ও ৪নং ইউনিটের নির্মাণকাজ। ভিভিইআর-১০০০ প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা দুই হাজার মেগাওয়াট। এটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭৮ কোটি ডলার। এতে কিলোটওয়াটপ্রতি ব্যয় পড়ছে দুই হাজার ৮৯০ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্ধেক ব্যয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে ভারত।
জানতে চাইলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক শৌকত আকবর শেয়ার বিজকে বলেন, প্রতিটি দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একেকটি ইউনিক প্রকল্প। আবহাওয়া, বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকার মাটির ভূমিকম্প সহনশীলতা, অর্থায়নের ধরন, বিদ্যমান অবকাঠামো, নির্মাণকাজের প্রকৃতি, দক্ষ জনবলের প্রাপ্যতা, কাঁচামালের প্রাপ্যতা, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয়ের ওপর প্রকল্প ব্যয় নির্ভর করে। ভারত নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি করে নিজেরাই কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে। আর বাংলাদেশকে পুরো প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আবার ৩০ বছর মেয়াদি ঋণও দিয়েছে দেশটি।
তিনি আরও বলেন, ভারতের কুনদানকুলার মাটির ভূমিকম্প সহনশীলতা রূপপুরের তুলনায় তিনগুণ বেশি। এছাড়া ভারতে ২২টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। তাই তাদের এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞতা ও দক্ষ জনবল রয়েছে। বিদ্যমান অবকাঠামোও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশকে সব ধরনের সামগ্রী আমদানি করতে হচ্ছে। এছাড়া ভারত নতুন এ প্রকল্পে মাত্র ১০৯ জনকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। অথচ বাংলাদেশ থেকে এক হাজার ৬০০ জনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এছাড়া নির্মাণ শেষের প্রথম তিন বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। এসব কারণে বাংলাদেশের ব্যয় বেশি হওয়াই স্বাভাবিক।
যদিও রাশিয়ার ঋণে নির্মিতব্য অন্যান্য দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম। সূত্রমতে, ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে গত বছর ডিসেম্বরে চুক্তি সই করে মিসর। এর আওতায় ২০২০ সালের শেষ দিকে চার হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে কিলোটওয়াটপ্রতি ব্যয় পড়বে পাঁচ হাজার ২০৮ ডলার। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ৮৫ শতাংশ তথা দুই হাজার ১০০ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে প্রদান করবে রাশিয়া। বাকি ১৫ শতাংশ সরবরাহ করবে মিসর সরকার।
এদিকে চলতি বছর ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করেছে তুরস্ক। দেশটির আকুইউয়ে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে কিলোটওয়াটপ্রতি ব্যয় পড়ছে চার হাজার ১৬৭ ডলার।
একই সমান ব্যয় হচ্ছে ভিয়েতনামের অস্ট্রোভেটস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে। দেশটি ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ শুরু করা হয় ২০১৪ সালে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার কোটি ডলার।
এর বাইরে বেলারুশের নিন তুয়ানে ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ শুরু করা হয় ২০১৩ সালে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫৫ কোটি ডলার। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে কিলোটওয়াটপ্রতি ব্যয় পড়ছে চার হাজার ৬২৫ ডলার।
এ প্রসঙ্গে শৌকত আকবর বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় বেশি না কম, তা এখন আর বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম কেমন সেটি বিবেচনা করা দরকার। এক্ষেত্রে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে। এদিক থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনেক সাশ্রয়ী। এ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম পড়বে অনেক কম।
যদিও আইইবির সেমিনারে জানানো হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়বে গ্যাসের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। বর্তমানে গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ছে তিন টাকা ২১ পয়সা। আর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়বে ৯ টাকা ৩৮ পয়সা।