ব্রেক্সিট ও ভবিষ্যতে ইউরোপীয় শৃঙ্খলা

জোশকা ফিশার: ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। এখন পর্যন্ত ব্রেক্সিটের বিষয়টি একটি অর্থনৈতিক শর্তের জালে আবদ্ধ রয়েছে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষ এ বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছার ব্যাপারে নিজেদের আশাবাদের কথা জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য যদি কোনো ধরনের পারস্পরিক চুক্তি ছাড়াই ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়, তবে এতে তাদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। বিশেষ বাণিজ্যের মতো অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এমন একটি বিষয় যখন সামনে, তখন পর্যন্ত চুক্তির বিষয়ে এখনও উভয় পক্ষই বেশ দূরত্বে অবস্থান করছে।
একটি কঠোর ব্রেক্সিটের মানে হলো আগামী বছরের ২৯ মার্চ গ্রিনিচ মান সময় রাত ১১টা থেকে ইইউ’র সব ধরনের চুক্তি ও সমঝোতা থেকে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাওয়া। যার মধ্যে কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় রয়েছে। এছাড়া ইইউ’র সঙ্গে আন্তর্জাতিক যেসব বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, সেগুলো থেকেও দেশটির আনুষ্ঠানিক প্রস্থান হবে। ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য মূলত একটি তৃতীয় পক্ষে পরিণত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্যক্রমের সঙ্গে দেশটির কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা থাকবে না।
অথচ যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল। ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ অর্থনীতির দেশও যুক্তরাজ্য।
ব্রেক্সিটের ফলে একটি সংকটপূর্ণ রাজনৈতিক ফলও থাকবে। পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইইউ একটি অভিন্ন বাজার ও কাস্টমস ইউনিয়নের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু এর মূলে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট আইডিয়া বা লক্ষ্যের আলোকে ইউরোপের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পরিচালিত হওয়া। এই আইডিয়ার ক্ষেত্রে ব্রেক্সিট আসলে এমন একটি বিষয়, যেখানে অর্থনীতি তেমন কোনো ব্যাপারই নয়! এ কারণেই ইইউ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া ইউরোপীয় শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে। ব্রেক্সিট চুক্তি হোক বা না হোক, এমনটি হবেই। অর্থাৎ ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যাপারও জড়িত রয়েছে।
২০১৬ সালের গণভোটে যারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, তারা আসলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে খুব বেশি সচেতন ছিলেন না; কিন্তু সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের পক্ষে ছিলেন। তারা এই সার্বভৌমত্বকে যুক্তরাজ্যের বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যকে ভিত্তি করে চিহ্নিত করেননি, বরং উনবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে দেশটির অবস্থানকে বিবেচনা করেছেন। যুক্তরাজ্য এখন মধ্যম মানের ইউরোপীয় শক্তি এমনটি বললেও তা নিয়ে তাদের মনে করার কিছু নেই। কারণ তাদের আবারও বৈশ্বিক খেলোয়াড় হিসেবে পরিণত হওয়ার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। সেটা ইউরোপের ভেতরে হোক কিংবা অন্য কোনো অঞ্চলে।
যদি এ অঞ্চলের বাকি দেশগুলো যুক্তরাজ্যের এ উদাহরণকে গ্রহণ করে এবং এই একবিংশ শতাব্দীর চেয়ে উনবিংশ শতাব্দীকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে ইইউ ভেঙে যেতে পারে। এতে প্রতিটি সার্বভৌম দেশ তাদের কষ্টকর ব্যবস্থাগুলোর বিষয়ে ব্যাপক সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে। তারা একে অন্যের উচ্চাকাক্সক্ষার বিষগুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
করবে, খতিয়ে দেখবে।
এমন একটি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় দেশগুলো অনেক ধরনের প্রকৃত ক্ষমতার সংকটের মুখোমুখি হবে এবং তাদের ভালোর জন্য বিশ্বমঞ্চ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেবে। ট্রান্স-আটলান্টিসিজম ও ইউরো-এশিয়ানিজমের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা একবিংশ শতাব্দীতে অ-ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর সবচেয়ে সহজ চাওয়ায় পরিণত হয়েছে। এমনকি এর সবচেয়ে খারাপ ফল যেটা হতে পারে, তা হলো অন্য পরাশক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের জন্য ইউরোপ অঞ্চল রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। আর তেমনটি হলে নিজেদের ভবিষ্যৎ হয়তো ইউরোপিয়ানদের হাতে থাকবে না, তা নিয়ন্ত্রিত হবে অন্য কোথাও থেকে।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উনবিংশ শতাব্দীতে সংঘটিত ৩০ বর্ষব্যাপী যুদ্ধের (১৬১৮-১৬৪৮) মাধ্যমে মূলত ভাঙন শুরু হয়। এককেন্দ্রিক চার্চ ও রাজ্যব্যবস্থার মতো পুরোনো বিষয়গুলোর মাধ্যমে এগুলো চালিত হতে থাকে। বেশ কয়েকটি ধর্মযুদ্ধ ও শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির উত্থানের মাধ্যমে একপর্যায়ে এর অবসান হয়। এর স্থলাভিষিক্ত হয় সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো দ্বারা পরিচালিত ওয়েস্টফেলিয়া ব্যবস্থা।
পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে বিশ্বকে শাসন করেছে ইউরোপ। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। তবুও ওয়েস্টফেলিয়া ব্যবস্থা বিংশ শতাব্দীর মারাত্মক দুই বিশ্বযুদ্ধের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। দুটি যুদ্ধই ছিল ইউরোপকেন্দ্রিক, যা বিশ্বকে শাসন করার জন্যই মূলত সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে যখন অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হলো, তখন ইউরোপিয়ানরা ব্যাপকভাবে তাদের সার্বভৌমত্ব হারাল; এমনকি বিজয়ী ইউরোপিয়ান মিত্রপক্ষও এক ধরনের পরাজিত হলো। ওয়েস্টফেলিয়া ব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে তার স্থলাভিষিক্ত হয় দু’পক্ষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা দ্বারা পরিচালিত কোল্ড ওয়ার বা ঠাণ্ডা যুদ্ধ। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব দুই অ-ইউরোপীয় পারমাণবিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত হতে শুরু করে। এ দু’পক্ষ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন।
ইইউ ইউরোপের সার্বভৌমত্ব শান্তিপূর্ণ উপায়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ইউরোপের দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করার মাধ্যমে এটি করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। ক্ষমতার জন্য পুরোনো দ্বন্দ্ব, পারস্পরিক মিত্রতাসহ বেশ কিছু বিষয় এ লক্ষ্য পূরণে বারবার বাধার সৃষ্টি করেছে। এক্ষেত্রে সাফল্য পাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনগত ক্ষেত্রে সমতা বিধান বা একত্রীকরণ করা।
তবে ব্রেক্সিট সে প্রক্রিয়াকে একটি অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এ ইস্যুতে ইইউ’র সঙ্গে যুক্তরাজ্যের আলোচনার সময় পুরোনো একটি সমস্যা আবার সামনে চলে এসেছে। তা হলো ‘দি আইরিশ কোশ্চেন’। একসময় যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড উভয়ই ইইউ’র সঙ্গে একমত পোষণ করত। কিন্তু আইরিশ পুনরায় একত্রীকরণের জন্য উদ্দীপনা নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও দশক ধরে চলে আসা উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ অদৃশ্য হয়ে গেছে। ইইউ’র উদ্যোগের ফলে একটি বাস্তবতার এটাই মানে দাঁড়ায়: কোনো দেশ উত্তর আয়ারল্যান্ডকে সমর্থন করল সেটি কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু ব্রেক্সিট এটিকে ইতিহাসের উল্টোদিকে ঠেলে দিয়েছে। অতীতের সে বিষয়গুলো আবার
ফিরে আসার হুমকি দিচ্ছে।
ইউরোপিয়ানদের আইরিশ ইস্যু আরও গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। কারণ এ অঞ্চলে এ ধরনের দ্বন্দ্ব ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বে একটি নতুন উদীয়মান অঞ্চল এগিয়ে আসছে। আর এ অঞ্চলটির প্রাণকেন্দ্র প্রশান্ত মহাসাগরে, অবশ্যই আটলান্টিক অঞ্চলে নয়। ইউরোপ হলো একমাত্র শক্তি, যাদের এ ঐতিহাসিক পরিবর্তনটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পুরোনো ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রশক্তির বিষয়টি এই নতুন প্রতিযোগিতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে না। এজন্য আজকের ইউরোপকে একজোট হতে হবে। কেবল তখনই ইউরোপিয়ান সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দক্ষতার জন্য বিশাল এবং একাগ্র প্রচেষ্টার প্রয়োজন হবে।
গৌরবোজ্জ্বল অতীত ধারণ করা একটি শেষ বিষয়। ইউরোপিয়ানরা যে চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে এটি তা মোকাবিলা করতে সহায়তা করবে। এতদিন এ অঞ্চলের প্রকৃতির সঙ্গে যে অতীত যুক্ত ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যকে সঙ্গে নিয়ে বা বাদ দিয়েই হোক, ইউরোপকে তার ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

জোশকা ফিশার: জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ও ভাইস চ্যান্সেলর

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাবানুবাদ: তৌহিদুর রহমান