বড় আর্থিক অনিয়মগুলোও বিচারের আওতায় আসুক

দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে ব্যাংক খাতে টালমাটাল অবস্থা দীর্ঘদিনের। ঋণখেলাপি, অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে যাচ্ছে ব্যাংক খাত। অবশ্য এ ধরনের অভিযোগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিরুদ্ধেই বেশি। বেসরকারি ব্যাংকও একেবারে পিছিয়ে নেই। বেসরকারি ব্যাংকে অধিকাংশ অনিয়মই অবশ্য তুলনামূলক ছোট অঙ্কের। তবে ছোট বা বড়Ñসবই গুরুতর অপরাধ। অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এর। আশার কথা, এমন কিছু ঘটনার বিচার শুরু হয়েছে। মূলত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎপরতায় এটা সম্ভব হচ্ছে। এক্ষেত্রে হতাশার দিকও রয়েছে। গত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া বড় আর্থিক অনিয়মের অধিকাংশের বিচার এখনও হয়নি। এখন ছোট অনিয়মগুলোর বিচারের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বড় অনিয়মেরও নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত হবে বলে আমরা আশা করব।
গতকালের শেয়ার বিজে ‘সাউথইস্ট ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ: দুদকের মামলায় কারাগারে রাইজিং গ্রুপের পরিচালক’ শিরোনামে এমন একটি বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এতে বলা হয়, দুদকের দায়ের করা অর্থ আত্মসাৎ মামলায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর স্ত্রী ও রাইজিং গ্রুপের পরিচালক জমিলা নাজনীন মাওলাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আসলাম চৌধুরী, তার স্ত্রীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে সাউথইস্ট ব্যাংকের হালিশহর শাখা থেকে ঋণ নিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছিল দুদক। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের ভিড়ে ১৩৫ কোটি টাকার এ অনিয়মটিকে অবশ্য ছোটই বলা যায়। তবে অপরাধ অপরাধই। এর আইনগত প্রতিবিধান বা শাস্তি নিশ্চিত হওয়াটাই সমাধান বলে আমরা মনে করি।
ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মূলত জনগণের অর্থ প্রবাহিত হয়। সেখানে জনগণের যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে, ব্যাংকগুলোরও মুনাফা হয় এর মাধ্যমে। তবে ওইসব অনিয়ম-দুর্নীতি এ অর্থপ্রবাহে বাধা তৈরি করছে। এতে জনগণ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটতে থাকায় জনগণের এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। অত্যন্ত ক্ষতিকর বলেই এর অবসান হওয়া জরুরি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আস্থা ফেরাতে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতিতে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সে সঙ্গে জনগণের গচ্ছিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাইজিং গ্রুপের আর্থিক অনিয়মের ঘটনাটি কয়েক বছরের ঘটনাবলির তুলনায় ছোটÑএটা বলাই যায়। কারণ এ সময়ে বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক, ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার কারসাজি এবং যুবক, আইসিএল, ডেসটিনি, ইউনিপেটু ইউ’র মতো জালিয়াতি করে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটে। তবে রাইজিং গ্রুপের মতো দু’একটি অনিয়মের ঘটনার বিচার ত্বরান্বিত হলেও বড় অনিয়মগুলোর ক্ষেত্রে উদ্যোগ একপ্রকার থমকে আছে। আমাদের দেশে যেটা দেখা যায়, বড় বড় আর্থিক অনিয়মে রাঘববোয়াল, রাজনৈতিক নেতা ও কিছু বড় কোম্পানি জড়িত থাকে। এখন অপরাধ যে বা যারাই করুন না কেন, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।
বড় আর্থিক অনিয়ম নিষ্পত্তিতে দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় হতে হবে। এক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতায় যদি ঘাটতি থাকে, তা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এছাড়া দুদকের তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ার মতো বিষয়কে যাতে কেউ কোনোভাবে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আর্থিক অনিয়ম বন্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোর আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা জরুরি। কারণ তাদের ওপর জনগণ আস্থা হারালে সেটা অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না। আর্থিক অনিয়মের মতো অপরাধ যাতে সংঘটিত হতে না পারে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই এসব ঘটনা নিষ্পত্তির চাপও কম নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। এক্ষেত্রে বিদ্যমান কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, দুদক ও সরকার আরও উদ্যোগী হবে বলে আমরা আশা করব।