বড় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বরং অনেক বেশি

বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভারকে কারও কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। এ প্রতিষ্ঠানের সাপ্লাই চেইন বহু দেশের মতো এখানেও বিস্তৃত। খানা জরিপ চালালে আমাদের প্রত্যেকের গৃহস্থালি থেকে টয়লেট পর্যন্ত পরিসরে তাদের তৈরি কোনো না কোনো সামগ্রী পাওয়া যাবেই। হালে ওই কোম্পানির আরেকটি পণ্য কিনে থাকুন বা না থাকুন, সেটির নাম শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। পণ্যটির নাম পিউরইট। ২০১০ সাল থেকে পানি বিশুদ্ধকরণ এ যন্ত্রটি এরই মধ্যে স্থানীয় বাজারে গ্রাহক সৃষ্টি করেছে ১০ লাখেরও বেশি। জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত ১০ শতাংশ ছাড়ে ক্রেতার বাসায় এটি পৌঁছে দেওয়ার অফার দিয়েছে ইউনিলিভার। গ্রামাঞ্চলেও তারা পিউরইট বিক্রি করবেন এমনকি কিস্তিতে! যন্ত্রটির এত জনপ্রিয়তার কারণ কী, তা অনুসন্ধানের বিষয় নয়। পিউরইট আসার আগে আমাদের বাজারে নানা কোম্পানির পানি বিশোধন যন্ত্র প্রচলিত ছিল। তবে হাতেগোনা এক-দুটি কোম্পানি বাদে সেগুলো ভরসা করার মতো ছিল না। ব্যবহার প্রণালির দিক থেকেও ছিল জটিল। বলা চলে, পিউরইট বিপ্লব আনে এ ক্ষেত্রে। তার পেছনে ইউনিলিভার ব্র্যান্ডটির ওপর ভোক্তার আস্থা তো ছিলই; পণ্যটি নিজেও কিছু ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরিতে সক্ষম হয়। কিন্তু কিছুদিন ধরে যন্ত্রটি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ মিলছিল গ্রাহকের কাছ থেকে। গতকালের শেয়ার বিজে ছাপা ‘ইউনিলিভারের পিউরইটে তেলাপোকা!’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি কার্যত ওইসব অভিযোগেরই সাধারণ প্রতিফলন। সুতরাং তা আমলে না নিয়ে উপায় নেই।

অনস্বীকার্য যে, পিউরইটের সেবা নিয়ে সচেতন মানুষের সংশয় আগে থেকেই ছিল। বিশেষত পণ্যটির জার্ম কিল কিটের (জিকেকে) মান নিয়ে অভিযোগ ছিল বিস্তর। আমাদের প্রতিবেদক সরেজমিনে ভোগান্তির শিকার গ্রাহকদের অভিযোগ নিয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, তা ওই বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষও বিষয়টি হেসে উড়িয়ে দেয়নি, সেটা লক্ষণীয়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কিছু অভিযোগকে যে পণ্যটির আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে না বা একশ্রেণির ষড়যন্ত্রতত্ত্বী যে তিলকে তাল বানিয়ে পণ্যটি তথা কোম্পানির ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের প্রয়াস চালাচ্ছে না, সেটা হলফ করে বলা যায় না। ব্যবসায়িক জগতে সর্বাধিক পারফরম্যান্স দেখানো কোম্পানি বা পণ্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের বিস্তার দেখা যায় হামেশাই। তবে ষড়যন্ত্র থাকুক বা না-থাকুক, ভোক্তার কাঠগড়া থেকে আবোলতাবোল বুঝ দিয়ে পার পেতে পারে না ইউনিলিভার। বিশেষজ্ঞ শুধু নন ভোক্তারাও এ ধরনের কেসে মধ্যম বা নিম্ন শ্রেণির কোম্পানির ব্যাপারে যতটা সহনশীলতা দেখান; প্রথম শ্রেণির সাড়াজাগানো কোম্পানি বা বিশ্বাস্যযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে তাদের তেমন সহনশীলতা নেই বললেই চলে। তার কারণটাও অনুমানের অসাধ্য নয়। বড় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে স্বভাবতই অনেক বেশি দায়িত্বশীলতা আশা করেন ভোক্তারা। তাদের ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে ওঠার নেপথ্যে প্রধান উপাদানই যে এটি! ফলে ভোক্তারা যখন দেখেন বড় বা নামকরা কোম্পানিও ‘দায়িত্বহীনতা’র পরিচয় দিচ্ছে বা আর দশটির মতো আচরণ করছে; তারা তখন গভীরভাবে প্রতারিত বোধ করেন। এ অবস্থায় কোম্পানির দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর বা প্রমাণ ছাড়া পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব। ফলে আমরা আশা করব, নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার তরফ থেকে সম্ভাব্য চাপের অপেক্ষায় থেকে নয় ইউনিলিভার নিজ ব্র্যান্ড ইমেজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই পিউরইট জটিলতার নিরসন ঘটাবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন স্বউদ্যোগী হয়েও এমন ক্ষেত্রগুলোয় বাজারে নজরদারি বাড়ান।