বড় সিমেন্ট প্রস্তুতকারকদের পুঁজিবাজারে আনুন

হালে নির্মাণ উপকরণ উৎপাদনকারী স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো করছে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই উন্নতির কারণও সহজে বোধগম্য। আবাসন খাত ধীরগতিতে অগ্রসর হলেও মোটের ওপর উদ্যম বেড়েছে অবকাঠামো উন্নয়নে। এক্ষেত্রে সরকার গৃহীত মেগা প্রজেক্টগুলোর অবদান সর্বাধিক। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে বাড়িঘর নির্মাণও বেড়েছে দেশজুড়ে। আর এ নির্মাণ কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ইট, বালু, রড, সিমেন্টের মতো উপকরণের চাহিদা। অবশ্য রড ও সিমেন্ট খাতের জন্য বাড়তি প্রণোদনার কারণÑদেশের পাকা রাস্তাগুলো বিটুমিনের পরিবর্তে আরসিসি করার উদ্যোগ। এটি কার্যকর হলে সিমেন্টের চাহিদা আরও বাড়বে নিশ্চয়ই। সিমেন্ট উৎপাদন ভারী শিল্পের পর্যায়ে পড়ে। আমাদের সৌভাগ্য, উদ্যোক্তাদের কৃতিত্ব ও নীতিনির্ধারকদের বিচক্ষণতায় এ খাতের বিপুল বিনিয়োগ বৃথা যায়নি। স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন সিমেন্টে এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা তো মিটছেই, উপরন্তু এটি রফতানির ওপর মনোযোগ বাড়াচ্ছে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। হেতুটা স্পষ্ট। কোম্পানিগুলোর ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার হয়েছে এখন পর্যন্ত। রফতানিতে না গেলে পুরো উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার সম্ভব নয়। এটি একই সঙ্গে আমাদের জন্য গর্ব ও দুঃখের বিষয়। আরও লক্ষণীয়, মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে দেখলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দখলে যখন এর ৩০ শতাংশ, সেখানে স্থানীয় কোম্পানিগুলোই জুড়ে আছে বাকি ৭০ শতাংশ বাজার। এ অবস্থায় ক্ষোভের বিষয় হলো, এ খাতের শীর্ষ দশ কোম্পানির অর্ধেকই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এ নিয়ে গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘পুঁজিবাজারে অনুপস্থিত সিমেন্ট খাতের শীর্ষ চার কোম্পানি’ শিরোনামের খবরটি অনেক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে।

লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টের সর্বশেষ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আমাদের প্রতিবেদক জানিয়েছেন, সিমেন্ট বাজারে ১৪ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে শাহ সিমেন্ট। এরপর মোট বাজারের ১০ শতাংশ রয়েছে বসুন্ধরা সিমেন্টের দখলে। তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে সেভেন রিংস ও ফ্রেশ সিমেন্ট। জানা মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই অলাভজনক নয়। বরং এগুলোর কোনো কোনোটির বার্ষিক মুনাফায় ভালো প্রবৃদ্ধিও দৃশ্যমান। এ অবস্থায় প্রশ্ন হলো, ভালো পারফর্ম করা কোম্পানিগুলো তাহলে পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না কেন? একাধিক কোম্পানির পক্ষ থেকে এ দৈনিকের কাছে বলা হয়েছে, ‘ষোলোআনা ইচ্ছা’ থাকার পরও নানা জটিলতায় পুঁজিবাজারে আসতে দেরি হচ্ছে তাদের। তারা এও জানিয়েছেন, শেয়ারবাজারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তারা ‘পজিটিভ’। তাদের কথা বিশ্বাসই করতে চাইবেন সবাই। তবে কেউ কেউ মনে করেন, তালিকাভুক্তিতে তাদের আন্তরিকতায় ঘাটতি রয়েছে কোথায় যেন! কী এক অদৃশ্য বাধা রয়েছে পুঁজিবাজারে আসার ব্যাপারে! খেয়াল করা দরকার, প্রথাগত ব্যাংকের বাইরে শেয়ারবাজার বড় বিনিয়োগ সংগ্রহের স্থান বটে এবং সেখানে অন্তত সামনের কাতারে থাকা সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর অন্তর্ভুক্তিই ছিল স্বাভাবিক। বোধকরি অন্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ অধিক সুবিধাজনক মনে হওয়ায় তারা এর প্রতি আকৃষ্ট নন বা হচ্ছেন না। এটা সত্য যে, এ কোম্পানিগুলো বাজারে এলে শিগগিরই বিরাট কোনো পরিবর্তন না আসুকÑসাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাতে উৎসাহী ও নৈতিকভাবে বলীয়ান হতেন। এখন প্রকৃতপক্ষে কী কারণে সিমেন্ট প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে আসতে দেরি হচ্ছে, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের নিরুৎসাহের কারণ কীÑনীতিনির্ধারকদের অবহেলা, নাকি তালিকাভুক্তিতে কিছু প্রণোদনা প্রত্যাশা করছে তারা? এক্ষেত্রে যদি নিছক প্রক্রিয়াগত জটিলতায় তাদের অন্তর্ভুক্তি বিলম্বিত হয়, তাহলে আমরা তাগাদা দেব সেগুলো যেন দ্রুত দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সিমেন্ট খাতের এ কোম্পানিগুলো যত শিগগির পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত হবে, ততই উৎসাহী ও আশাবাদী হয়ে উঠবে বিনিয়োগকারীরা।