ভারত কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করবে?

প্রসঙ্গ মালদ্বীপ

সোহেল রানা: দৃষ্টিনন্দন রিসোর্ট আর স্বচ্ছ নীল পানির জন্য ব্যাপক পরিচিত দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপকে বর্তমানে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বলা যায়। ভারত মহাসাগর দিয়ে ভারত, চীন ও জাপানসহ আরও কিছু এশীয় রাষ্ট্রে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ যে নৌ-রুটটি রয়েছে, এটি মালদ্বীপের খুব কাছ দিয়েই গেছে। তাই অবস্থানগত কারণে ক্ষুদ্র এই রাষ্ট্রের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে ভারত, চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের। ভারত মহাসাগরেও ক্রমেই বাড়ছে এসব দেশের নৌ-তৎপরতা। তাই মালদ্বীপ বিশেষ করে দুই আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারতের যুদ্ধক্ষেত্র হয় কি না, এ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সহায়তা নিয়ে ভারত মহাসাগরে চীনকে টেক্কা দিচ্ছে ভারত। অন্যদিকে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, জিবুতি ও মিয়ানমারে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে চীন। এক দশক ধরে জলদস্যু ও চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে ভারত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজ টহল দিচ্ছে। ২০১৩ সালে নামমাত্র নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সমালোচনার মুখে পড়েন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন। সাবেক একনায়ক ও সৎভাই মামুন আবদুল গাইয়ুম এবং দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ ভারতপন্থী হওয়ায় দেশ থেকে পশ্চিমা শক্তি ও ভারতের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছেন ইয়ামিন। এ সুযোগে মালদ্বীপে বেড়েছে চীনের বিনিয়োগ, বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়েছেন সৌদি আরব এমনকি পাকিস্তানকেও। মালদ্বীপই দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ যেখানে ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এখনও পা পড়েনি।

ভারত মালদ্বীপে গণতন্ত্রপন্থিদের সমর্থন করলেও দেশটিকে একেবারে চীন ও সৌদি আরবের কব্জায় ছেড়ে দিতে চায় না। তাই সংকট উত্তরণে নাশিদ ভারতীয় হস্তক্ষেপ কামনা করলেও ভারতের পক্ষে সেনা মোতায়েন অতটা সহজসাধ্য হবে না। গণমাধ্যমে ভারতের সেনা কন্টিনজেন্ট প্রস্তুত রাখার খবর প্রচারিত হলেও আপাতত বিবৃতি দিয়েই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চাচ্ছে মোদি সরকার। চীনও এরই মধ্যে মালদ্বীপে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। এই চীন সম্প্রতি মালদ্বীপের কাছ থেকে একটি দ্বীপ ৫০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে। রিসোর্ট উন্নয়নের জন্য চীনকে দ্বীপটি ছেড়ে দেওয়া হলেও এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের শঙ্কা ভবিষ্যতে এটি চীনা নৌঘাঁটিতে রূপান্তরিত হতে পারে! বর্তমানে মালদ্বীপের ৭০ শতাংশেরও বেশি বিদেশি সাহায্য আসে চীন থেকে। দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নেও চীনের ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে।

ইয়ামিনের সৎভাই মামুন আবদুল গাইয়ুমের ভারত ঘনিষ্ঠতা একেবারেই খোলামেলা। ১৯৮৮ সালে তামিল বিদ্রোহীদের একটি অংশ মালদ্বীপে হামলা করলে গাইয়ুমের অনুরোধে মাত্র ১৫ ঘণ্টার মধ্যে রাজীব গান্ধীর নির্দেশে ভারতের সেনারা মালদ্বীপে পৌঁছে যায়। কিন্তু আবদুল্লাহ ইয়ামিন ভারতের পরিবর্তে বন্ধু হিসেবে চীনকে বেছে নেওয়ায় মালদ্বীপের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের। এরপরও মালদ্বীপে ভারতীয় হস্তক্ষেপের সমীকরণ খুবই জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ারই কথা।

টানা ৩০ বছর মালদ্বীপ শাসন করেছেন মামুন আবদুল গাইয়ুম। এই দীর্ঘ সময়ে মালদ্বীপে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। এ সময়ে বিরোধীরা মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারেনি, ছিল না মত প্রকাশের কোনো স্বাধীনতা। নিয়তি আজ গাইয়ুমকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, এটা ভাবনার বিষয়। নিজ দল ক্ষমতাসীন প্রগ্রেসিভ পার্টি অব মালদ্বীপ (পিপিএম) থেকে তিনি এখন বিতাড়িত। বিরোধীদের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে গত বছরের মার্চে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর পর থেকে ভারতেই বেশিরভাগ সময় কেটেছে গাইয়ুমের।

১৯৭৮ সালে ইব্রাহিম নাসির সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেলে ক্ষমতায় বসেন মামুন আবদুল গাইয়ুম। প্রতিটি মেয়াদ শেষে নামকাওয়াস্তে একটি নির্বাচন দিতেন, যে নির্বাচনে তিনিই থাকতেন একমাত্র প্রার্থী। গাইয়ুমের নেতিবাচক কাজের কট্টর সমালোচকদের একজন ছিলেন সাংবাদিক মোহাম্মদ নাশিদ। অবশ্য সময় ও পরিস্থিতি পাল্টেছে, সমালোচক নাশিদের দলের সঙ্গে গাইয়ুমের এখন সম্পর্ক অনেক ভালো। উল্টো শত্রু হয়েছেন সৎভাই ইয়ামিনের। কারণ গাইয়ুমকে সরিয়ে দেওয়ার পর ইয়ামিনই এখন পিপিএম দলের নীতিনির্ধারক। ইয়ামিনকে এখন লড়াই করতে হচ্ছে ভারত-ঘনিষ্ঠ গাইয়ুম ও নাশিদের সঙ্গে। ২০০৮ সালে প্রথম গণতন্ত্রের মুখ দেখে মালদ্বীপের জনগণ। ওই বছর মালদ্বীপে প্রথমবারের মতো বহুদলীয় নির্বাচন হয়, যাতে অবসান হয় গাইয়ুমের ৩০ বছরের শাসন। ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হন মোহাম্মদ নাশিদ।

ছোট দ্বীপদেশ মালদ্বীপের পার্লামেন্ট এখন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ১৫ দিনের জরুরি অবস্থা জারির পর গ্রেফতার করা হয়েছে প্রধান বিচারপতি আবদুল্লাহ সাইদসহ কয়েকজনকে। এছাড়া গৃহবন্দি করা হয়েছে সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমকেও। সরকারের আশঙ্কা ছিল পার্লামেন্টকে ব্যবহার করে সুপ্রিমকোর্ট প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনকে অভিশংসন করবে, এরপর গ্রেফতার করবে। এমন ভাবনা থেকেই সরকারের সমর্থনে সেনা-পুলিশ ইয়ামিনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পার্লামেন্ট সিল করে দিয়েছে। ইয়ামিনের নির্দেশেই এমনটা হয়েছে। মালদ্বীপ যে সংকটে পড়েছে, এমন আরও উদাহরণ চোখের সামনেই রয়েছে। এশিয়া-আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে এমন সংকট বিরাজমান। তবে দেশটির বিচারকরা যে সাহস দেখালেন, তা তারা বাইরের কোনো শক্তির ইন্ধনে করেননি তো?

সংকট উত্তরণে সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদ সরাসরি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। এমনকি ভারতকে সেনা পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মালদ্বীপের চলমান সংকটের পেছনে ভারতের হাত রয়েছে, এমন অস্পষ্ট আভাস আগেই মিলেছে। নাশিদের খোলামেলা আহ্বান সে ধারণাকে একরকম স্পষ্টই করে দিল। ৬ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে নাশিদ বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন অবৈধভাবে সামরিক শাসন জারি করেছেন এবং দেশকে ছারখার করে দিচ্ছেন। তাকে অবশ্যই ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে।’ নাশিদ তার টুইট পোস্টে লিখেছেন, মালদ্বীপের লোকজনের পক্ষ থেকে আমরা দেশটির সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের ও রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করতে ভারতকে সেনাসমর্থিত বাহিনী পাঠানোর জন্য আন্তরিক অনুরোধ করছি।’

সংকটের শুরু সুপ্রিমকোর্টের একটি রায়কে ঘিরে। কয়েকদিন আগে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে ১২ সংসদ সদস্যকে মুক্তির আদেশ দেন মালদ্বীপের সুপ্রিমকোর্ট, যারা ক্ষমতাসীন দল থেকেই এমপি হয়েছেন, কিন্তু যোগ দিয়েছেন বিরোধী শিবিরে। ফলে ৮৫ সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা চলে যায় বিরোধীদের হাতে। এর পরই অভিশংসন ও গ্রেফতারের আশঙ্কায় ভুগতে থাকেন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন। সংসদের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনিল ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান এবং পুলিশপ্রধানকে নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। হুঁশিয়ার করেন, ইয়ামিনকে অভিশংসন বা গ্রেফতারে সুপ্রিমকোর্টের  যে কোনো পদক্ষেপ রুখে দেওয়া হবে।

২০১২ সালে নাশিদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে মালদ্বীপে রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়। পরের বছর নির্বাচনে নাশিদকে হারিয়ে ক্ষমতায় বসেন আবদুল্লাহ ইয়ামিন, যে নির্বাচনকে পাতানো বলছেন অনেকেই। বিরোধী মালদিভিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা নাশিদ বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় স্বেচ্ছায় নির্বাসনে রয়েছেন। সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে ২০১৫ সালে তাকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

 

গণমাধ্যমকর্মী