ভারসাম্য রক্ষায় নবীন-প্রবীণের অনুপাতে গুরুত্ব দিতে হবে

হাসান সাইদুল: বিশ্বে দুটি জিনিস কখনও থেমে থাকে না সময় ও জন্ম। যতই ব্যবস্থা নেওয়া হোক, এ দুটি কেউ ঠেকাতে পারবে না। তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হয়তো ‘জন্ম’ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।

রাষ্ট্রের মূল চার উপাদানের প্রথমটি হচ্ছে জনসমষ্টি। বেশি আর কম মূল কথা নয়। প্রধান উপাদান তথা জনসংখ্যাই এখন বেশিরভাগ রাষ্ট্রের বড় সমস্যা। এটি আমাদেরও সমস্যা বটে।

পঞ্চম আদমশুমারি অনুসারে জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার। এর সঙ্গে সর্বশেষ নমুনা জরিপের তুলনা করলে দেখা যায়, গত ছয় বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে দুই কোটি। ২০০১ সালের আদমশুমারিতে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৫২ লাখ। সেই হিসাবে ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছিল প্রায় দেড় কোটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০১২ সালে দেশে গড় খানার সদস্য ছিল ৪ দশমিক পাঁচজন, যা ২০১৬ সালে নেমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক তিনজনে।

বিবিএসের তথ্য অনুসারে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার। এর আগে ২০১৫ সালের নমুনা জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৮৯ লাখ। এ হিসেবে গত এক বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ২৮ লাখ ৫০ হাজার। সর্বশেষ হিসাবমতে, দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর হার প্রায় ৮ শতাংশ।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জন্মকে নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চলছে আগ থেকেই। একটা সময় প্রতিপাদ্য ছিল, ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট।’ তার তা পরিবর্তন হয়ে মিছিল করা হলো, ‘দুটি সন্তানের বেশি নয় একটি হলে ভালো হয়।’

জনসংখ্যাবিদরা বলছেন, গড় প্রজনন হার ২-এর নিচে নেমে গেলে অদূর ভবিষ্যতে অস্বাভাবিক হারে জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে ৩০ বছরের মধ্যেই দেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে যেতে পারে। তখন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাবে। প্রবীণরা দেশের ও জাতির জন্য বোঝা হয়ে দেখা দেবে। কর্মক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি তাদের চিকিৎসা-পুনর্বাসন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম নুর-উন-নবী বলেন, এখন নিয়ন্ত্রণের চেয়ে জনসংখ্যার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া বেশি জরুরি। অনেক দেশই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষায় অন্য দেশ থেকে মানুষ ধার করার দৃষ্টান্তও রয়েছে। বাংলাদেশে এখন ‘পজিটিভ পপুলেশন গ্রোথ’ একেবারেই ভারসাম্যের শেষ সীমায়। এমনকি খুলনা-রাজশাহীতে প্রজননহার প্রত্যাশিত হারের চেয়েও নিচে নেমে ১ দশমিক ৯-এ ঠেকেছে। ঢাকা বিভাগেও যদি প্রজনন হার নিম্নগতির হয়ে যায়, তবে তা অবশ্যই ‘নেগেটিভ গ্রোথ’ হয়ে উঠবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে গড় প্রজনন হার ২ দশমিক ৩। এ হারে জনসংখ্যা বাড়লে ২০৪৭ সাল নাগাদ দেশে নবীন জনগোষ্ঠীর তুলনায় প্রবীণদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। দেশে এখন মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশের বেশি মানুষই কর্মক্ষম, যাদের মধ্যে বড় অংশই তরুণ। ২০৪৭-২০৫০ সাল নাগাদ সম্ভাব্য জনসংখ্যা হবে ২২ কোটি। তখন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাবে, প্রায় সাড়ে চার কোটি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ সামাল দিতে হবে।

২০১৩ সালের এক গবেষণামতে বর্তমানে দেশে প্রবীণদের মধ্যে ৫৮ শতাংশেরই মৌলিক চাহিদা পূরণের সামর্থ্য নেই। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে প্রবীণদের প্রতি অবজ্ঞামূলক আচরণ দেখা যায়, যা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কষ্টের। যত প্রবীণসংখ্যা বাড়বে, ততই এ সমস্যা বাড়বে।

বর্তমানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে নিরাপদ প্রজনন, প্রজনন স্বাস্থ্য, মা ও শিশুস্বাস্থ্যের প্রতিই বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে যেহেতু এখনও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি, তাই সেদিকে জš§নিয়ন্ত্রণের কাজে গতি আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সীমিত সম্পদের দেশে বিস্ফোরিত জনসংখ্যার চাপ অন্যতম দুশ্চিন্তার কারণ। তবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জš§হার কমেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের তথ্যমতে, ১৯৭৫ সালে দেশে গড় প্রজনন হার ছিল ৬ দশমিক ৩, ২০১১ সালে তা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৩-এ। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে তা ২-এর নিচেও নেমে গেছে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৩ শতাংশ। ২০১১ সালে তা কমে হয়েছে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সের অধ্যাপক আমিনুল বলেন, জনসংখ্যার স্থিতি বর্তমানের চেয়ে আরও কমলে বিপদ হতে পারে। ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়’ জনসংখ্যার এ নীতি ঠিক আছে। যে পরিমাণ জায়গা আছে, তা যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে এ জনসংখ্যাই শক্তিতে পরিণত হবে।

অধ্যাপক নুর-উন-নবী বলেন, গড় প্রজনন হার দুই শতাংশে রাখতে, বিশেষ করে যাতে না বাড়ে কিংবা না কমে এমন পর্যায়ে রাখতে এখন থেকেই পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হবে। এজন্য নারীর শিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও স্বাবলম্বী হওয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. কাজী মোস্তফা সরোয়ারের মতে, এখন যে হার আছে, তাতেই ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বেড়ে যাবে, তরুণের সংখ্যা কমতে থাকবে। প্রজননহার এখন স্থিতিশীল। যদিও এটি দুইয়ে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে। এখন এটি ২ দশমিক ৩। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পর তা যেন না কমে সে বিষয় ভাবতে হবে।

সাধারণ মানষের প্রত্যাশা, ভারসাম্য রক্ষায় নবীন-প্রবীণের অনুপাতকে গুরুত্ব দিয়ে করণীয় ঠিক করবে সরকার।

 

গণমাধ্যমকর্মী

hassansayadulÑgmail.com